সতেরো শতকে তৎকালীন ভারতের পর্তুগিজ উপনিবেশ গোয়া ছিল পর্তুগিজ দাস’ নামক সম্প্রদায় নিয়ে গঠিত পর্তুগিজদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি। এই পর্তুগিজ দাস’ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল অল্পবয়সি জাপানি মহিলারা, যাঁদের পর্তুগিজ বণিকেরা ধরে বেঁধে এনে যৌনদাসী হিসাবে ব্যবহার করত—এদের বলা হত “জাপানি দাস’ এবং এছাড়াও ছিল জাপান থেকে আগত বন্দি দক্ষিণ এশীয় খালাসি। অষ্টাদশ শতকের শেষে এবং ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের আমলে, ব্রিটিশ সৈন্যরা তাঁদের কামনা চরিতার্থ করবার জন্য অল্পবয়সি মেয়েদের সেক্স-টুল হিসাবে ব্যবহার করে কিছু আরামপ্রদ স্থান তৈরি করেছিল। ব্রিটিশ সেনারা এই স্থানগুলি তাঁদের নিজেদের গণিকাবলয় হিসাবে ব্যবহার করত। বিবিসি’-র একটি নিবন্ধ জানাচ্ছে, ব্রিটিশ সৈন্যরা মুম্বাইয়ের মতো ভারতের বিভিন্ন শহর জুড়ে গণিকালয় তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। ভারতীয় খালাসি সমুদ্র নাবিকরা, যাঁদের জোর করে যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ সেনাবিভাগে নিয়োগ করা হত, তাঁরা তাঁদের মালিকদের অনুকরণ করে অহরহ সেখানকার স্থানীয় ব্রিটিশ গণিকালয়ে গমন করত। ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের শুরুতে উপমহাদেশীয় ইউরোপ এবং জাপান থেকে হাজার হাজার মেয়েদের ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষে পাচার করত; সেখানে তাঁরা গণিকা হিসাবে ব্রিটিশ সৈন্য ও ভারতীয় পুরুষদের সেবায় নিয়োজিত থাকত।
ভারতে ব্রিটিশ শাসনকালে গণিকাদের পৃষ্ঠপোষকতা, গণিকা বৃদ্ধি এবং গণিকাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারা যায় পাঁচখানি আকর গ্রন্থ থেকে। যেমন–(১) ‘বেশ্যানুরক্তি বিষমবিপত্তি’–এটি ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। উনিশ শতকে গণিকাদের যাঁরা বাড়বাড়ন্ত মনে করতেন তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা।(২) ‘বেশ্যা গাইড’–এটিও ১৮৬৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। যৌন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য ১৪ আইন জারি করেছিল। সেই আইনে বলা হয়েছিল গণিকারা কীভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পেশা চালিয়ে যেতে পারবে। (৩) “পাঁচালী কমলকলি’–বইটি ১৮৭২ সালে প্রকাশিত হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে গণিকাদের নিপীড়ন করা, অত্যাচার করা ইত্যাদি বিষয়। (৪) ‘বেশ্যাই সৰ্ব্বনাশের মূল’–বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৩ সালে। বিষয় তিন নম্বর বইয়ের পরের অংশ। (৫) এলোকেশী বেশ্যা’–এটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। অনাচার থেকে মুক্তির উপায় আছে খ্রিস্টধর্মে।
উপরোক্ত গ্রন্থগুলি থেকে যেটুকু জ্ঞান আরহণ করতে পেরেছি, তা সংক্ষেপে এখানে উল্লেখ করতে পারি। উনিশ শতক জুড়ে গণিকা, গণিকাবৃত্তি ও গণিকাবাপন এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, তাঁদের নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজেদের স্বার্থেই বিভিন্ন আইন তৈরি করে ফেলেছিল ব্রিটিশরা। কারণ অনিয়ন্ত্রিত যৌনযাপনে সিফিলিস, গনোরিয়ার মতো মারাত্মক মারণ রোগ পড়েছিল সমাজে। পাছে গণিকারসিক ব্রিটিশদেরও আক্রমণ করে সেই ভীতিতেই গণিকাদের রোগমুক্ত রাখতে চেয়েছিল।এমতাবস্থায় সিভিল সোসাইটিও দু-ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একপক্ষ যাঁরা গণিকাদের ‘সোস্যাল এভিলস’ ভাবত, অপরপক্ষ এই আইনের ফলে গণিকাদের মধ্যে যে সংকট এসেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে। ব্রিটিশদের কাছে সৈন্যরা ছিল অমূল্য সম্পদ। কারণ এই সৈন্যদের দিয়েই ভারতীয় নেটিভ’-দের টাইট দেওয়া হত। তাই সৈন্যদের জন্য গণিকা সুলভ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছিল। অনিয়ন্ত্রিত যৌনসঙ্গমে যৌনরোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। সে সময়কার রিপোর্ট বলছে, ১৮২৭ সালে ইংরেজ-সৈন্যদের মধ্যে মারণ যৌনরোগ ২৯ % থেকে বৃদ্ধি পেয়ে মাত্র দুই বছরে অর্থাৎ ১৮২৯ সালে ৩১ % হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৬০ সালে এসে সেটা এসে দাঁড়ায় ৭০ শতাংশে। এর ফলে একে একে সৈন্যদের বরখাস্ত করতে হচ্ছিল। সৈন্যসংখ্যা কমতে থাকায় সরকারের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। উদ্ধার পেতে আইন জারি করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ তাঁরা খুঁজে পেলেন না বিকল্প হিসাবে দুটি পথ তো খোলা ছিলই। (১) গণিকাবৃত্তি আইন করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া। গণিকাবৃত্তিতে যাঁরা জড়িত থাকবেন তাঁদের চরম শাস্তির বিধান তৈরি করা এবং (২) সৈন্যদের গণিকা নিষিদ্ধ করা। কোনো সৈন্য যদি গণিকাগমন করে, তাঁকে কঠোর শাস্তি প্রদান করা। ইংরেজরা বিকল্প হিসাবে এই কঠিন পথদুটি গ্রহণ করলেন না, গ্রহণ করলেন সহজ পথ। এতে বাঁশও ভাঙল না, বাঁশিও বাজল। গণিকারা থাকবে, সেনারা থাকবে এবং সেনাদের যৌন বিনোদনও থাকবে। অতএব সেনাদের পৃথক গণিকালয় তৈরি করা হল সেনাছাউনিগুলোতে। সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ডের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রণয়ন হল ‘ক্যান্টনমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৬৪’ ও ‘চোদ্দো আইন’। এই ক্যান্টনমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৬৪’ আইনের বলে যেসব গণিকারা রেজিস্ট্রিভুক্ত হবে এবং কার্ডহোল্ডার হবে, একমাত্র তাঁরাই গণিকাবৃত্তি চালিয়ে যেতে পারবে। বাকিরা নয়, সেনাদের জন্য তো নয়ই।
এতকিছু করেও সৈন্যদের মধ্যে মারণ যৌনরোগ নিশ্চিহ্ন করা যচ্ছিল না। যেহেতু সেনা তদারকির বাইরেও গণিকারা গণিকাবৃত্তি করত, সেনারা সেখানেও নিয়মিত যাতায়াত করত। এর ফলে সেনা ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষদের মধ্যেও এই যৌনরোগ ছড়িয়ে পড়তে থাকল। ১৮৬৪ সালে কলকাতার হেলথ অফিসার ফেবর টনেয়রও জানিয়েছিলেন, সিফিলিসের মতো রোগ শুধু সেনাদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৮৬৭ সালে ‘Contagious Diseases Act, XIV of 1868’ নামে একটি খসড়া তৈরি করে তাতে fola fracal–“I beg to state that in addition to my ususal duties, I am willing to undertake the organization of the new office, to superintend the registration of the prostitution. As well as to take an active part in the sanitary inspection of the public women.” প্রণয়ন হল ‘Indian Contagious Disaases Act’ বা চোদ্দো আইন।
