বাইজিদের জীবনে যেমন হাসি-আনন্দ আছে, তেমন আছে দুঃখ-বেদনারও ইতিহাস। গণিকা ও বাইজি নামোচ্চারণে ছিল সমাজের বাঁকা চোখের ভ্রুকুটি। সমাজ তাঁদের অপাঙক্তেয় করে রাখলেও সমাজের ব্যক্তিবর্গরা তাঁদের গুণপনাকে কাজে লাগাতে কসুর করেনি। কিন্তু তাঁদের ভিতর কিন্তু সুরেবেসুরে বেজে উঠত–“ছিঃ ছিঃ এত্তা জঞ্জাল”। গণিকাদের মতোই বাইজিদেরও দিনগত বৃত্তিক্রিয়া যেন জীবন-মৃত্যুর সহবাস। গানই ছিল তাঁদের পারাপারের কাণ্ডারী। গানেই তাঁদের মুক্তির আনন্দ, গানেই পরিস্ফুট বেদনার কান্না। বাইজিদের কিছু গান আমি এখানে উল্লেখ করব। যেসব গানে খুঁজে পাবেন বাইজদের সুখ-দুঃখ-যন্ত্রণার কাহিনি।
(১) লুম খাম্বাজ # কাওয়ালি
অনেক দিনের পরে দেখা, কেমন ছিলে বলো না।
দাসী বলে গুণমণি, মনে কি হে ছিল না।
আসি বলে চলে গেলে, সে আসা কি এই আসিলে
ভালোবাসি বলে কি রে, আসিতে ভালোবাসো না।
তোমা সনে প্রেম করে, জ্বালাতন যার পরে,
যত দুঃখ সই অন্তরে, জেনেও কি তা জানো না।
(২) খেমটা
অমন করিয়ে আঁখি আর ঠের নারে।
আর ঠের না আঁখি প্রাণে মেরো নারে।
তুমি যে চাওনি চাও, ও চাউনি কোথা পাও,
উড়ে যায় প্রাণপাখি মন তত বোঝে নারে।
(৩) কাওয়ালি
আগে আমার ছিল না সে জ্ঞান।
তুমি হইবে জাদু, পরেরই পরান।
তোমাতে আমারি আশ, তুমি হলে পরবশ,
অমৃত জানিয়ে বিষ, করিছিরে পান।
(৪) মিশ্র বেহাগ # খেমটা
আছে যার নয়ন।
রূপে যদি না ভোলে তার মন,
জানি নয়ন তার কেমন।
ধীরে ধীরে নয়নে পশে, রূপ হৃদয়ে বসে,
গুমোর যায় ভেসে, রূপে মন বসে,
জোর চলে না, বুঝ মানে না,
সাধে মন পায়ে বাঁধন।
নয় তো পরে কে করে যতন।
(৫) খাম্বাজ # একতাল
আজ তোমাকে দেখতে এলেম, অনেক দিনে পরে।
ভয় নাইকো সুখে থাকো, অধিকক্ষণ থাকব নাকো,
আসিয়াছি দু-দণ্ডেরি তরে।
দেখব শুধু মুখখানি, শুনব দুটি মধুর বাণী,
আড়াল থেকে হাসি দেখে, চলে যাব দেশান্তরে।
কোনো কোনো বাইজি সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। সময়, চাহিদা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন, নবাব-রাজা-মহারাজাদের পতন ইত্যাদি কারণে বাইজিদের অস্তিত্ব এখন লুপ্ত হয়েছে। তাঁদের নৃত্য সঙ্গীতে পারদর্শিতা, রূপলাবণ্য ও গুণের কথা কেবল বিধৃত হয়ে আছে বিভিন্ন লেখায়। আজও বউবাজার এলাকার বহু অট্টালিকা (বাইজিবাড়ি) ভগ্নপ্রায় অবস্থায় নির্জনে পড়ে আছে। আছে কিছু বাইজি পরিবার। কিন্তু সেখানে আর সুরের কলতান শোনা যায় না, বেলোয়ারি ঝাড়ে বাতি জ্বলে না, রসিকজনের যাতায়াতও আর নেই।
১১. ব্রিটিশ-ভারতে গণিকাদের সামাজিক অবস্থা
কলকাতায় প্রথম বিচারালয় স্থাপনের পর অ্যাটর্নি হয়ে এসেছিলেন উইলিয়াম হিকি। ১৭৭৭ সাল থেকে ১৮০৮ সাল পর্যন্ত হিকি সাহেব কলকাতায় ছিলেন। লন্ডনে ফেরার পর তাঁর স্মৃতিকথায় (১৭৪৯-১৮০৯) যা লিখেছিলেন সেটি শৈশবের কলকাতার সামাজিক ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসাবে স্বীকৃত বলা যায়। হিকি মিস ডানডাস নামে মহানগরের এক ‘বহুজন পরিচিতা বারাঙ্গনা’র কথা তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন। আধুনিক যুগে কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলে গণিকাবৃত্তির সূচনা যে ব্রিটিশ আমলেই হয়েছিল, তাতে কোনো সংশয় নেই। আধুনিক শহরের সমস্ত কদর্যতাকে সঙ্গে নিয়ে নগর কলকাতার ক্রমবিকাশ হয়েছে। আর এদেশে নবপর্যায়ে গণিকাবৃত্তির উদ্ভব বৃটিশদের হাত ধরেই। ১৭৯৫ সালে রুশ যুবক হেরাসিম লেবেদফ যখন কলকাতায় অস্থায়ী মঞ্চ বেঁধে প্রথম বাংলা থিয়েটারের সূচনা করলেন, তখন সেই নাটকে নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য গণিকাপল্লির মেয়েদের এনেছিল। কারণ তখনকার সময়ে সাধারণ ভদ্রঘরের মেয়েদের যাত্রা নাটকে অভিনয় করা নিন্দনীয় ছিল। এমনকি যাত্রা-নাটক দেখাটাও ছিল নিন্দনীয়। বলা হত–যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে। সে যুগে ফাত্রা’ শব্দটি চরিত্রহীন মানুষদের বোঝাত।
যাই হোক, হিকি সাহেবের স্মৃতিকথা থেকেই জানা যাচ্ছে, ১৭৯৫ সালের অনেক আগে থেকেই গণিকাপল্লির অস্তিত্ব ছিল। শুধু কলকাতা নয়, বাংলার সমৃদ্ধ শহরগুলি, যেখানে ব্রিটিশরা কোর্ট-কাছারি ইত্যাদি খুলেছিল, সেখানেই সন্নিহিত অঞ্চলে গণিকাপল্লি গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশদের সহায়ক বাবু সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় গণিকাপল্লিগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠতে থাকল গোটা উনিশ শতক জুড়ে। রক্ষিতা পোষণ, গণিকাগমন তখনকার সমাজ শুধু অনুমোদনই করত না, এইসব বেলেল্লাপনা ছিল তাঁদের মর্যাদা সূচক।
ইংরাজের নতুন ভুমিব্যবস্থা গ্রাম্য সমাজকে ভেঙে তছনছ করে দিল। ফলে বংশানুক্রমিক পেশা ও বৃত্তি থেকে উৎখাত হয়ে যেমন চোর ডাকাতের দল সৃষ্টি হয়ে শহরে আশ্রয় নিল, তেমনই দারিদ্রের তাড়নায় শহরের গণিকাপল্লিতে আশ্রয় নিল মেয়েরা। ১৮৭২ সালের সরকারি নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার গণিকারা অধিকাংশই তাঁতি, তেলি, জেলে, কৈবর্ত, ময়রা, চামার, কামার, কুমোর, যুগী, গোয়ালা, নাপিত, মালি, বেদে ইত্যাদি সম্প্রদায়ের। এই সময়ে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গণিকাদের সংখ্যা কীরকম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছিল, তা জানা যায় এই তথ্য থেকে। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের ১৮৬৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরের হিসাবমতো ৩০০০ মেয়ে গণিকাবৃত্তিতে এসেছিল। ১৮৮০ সালের এক হিসাবে শহরে গণিকাদের সংখ্যা ছিল ৭০০০, আর ১৮৯৩ সালে সেই সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছিল ২০,১১৬। শুধু সমাজের নিম্নবর্গের মেয়েরাই নয়, কুলীন ঘরের বহু মেয়েও অবস্থার দুর্বিপাকে আশ্রয় নিত গণিকাপল্লিতে। সরকারি প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছিল যে, গণিকাদের সংখ্যা বৃদ্ধির একটা কারণ হিন্দু বিধবাদের গণিকাপল্লিতে আশ্রয়। বিধবাবিবাহ প্রথা চালু না-হওয়ায় লালসার শিকার বিধবা তরুণীদের শেষ আশ্রয় ছিল এই গণিকাপল্লি। সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল—“হিন্দুর বিবাহ-বিচ্ছেদ নেই, বিধবা হলে হয় পবিত্র হও, নচেৎ বেশ্যা হও।” সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী হিন্দু বিধবারা প্রধানত হুগলি, বর্ধমান, হাওড়া, চব্বিশ পরগনা, মেদিনীপুর ও ওড়িশা থেকে আসত। তরুণী বিধবারা বাবুদের লালসার শিকার হতেন, কেউ কেউ গর্ভবতী হয়ে পড়তেন। শেষপর্যন্ত তাঁদের আশ্রয় হত গণিকালয়ে। দারিদ্র, দুর্ভিক্ষ, ইত্যাদি কারণে মা, মেয়ে উভয়কেই আশ্রয় নিতে হত গণিকাপল্লিতে। মুহূর্তের ভুলে (তখন তো কোনো গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা ছিল না) গর্ভবতী নারী আত্মহত্যা না করে বাঁচার উপায় খুঁজেছেন গণিকালয়ে আশ্রয় নিয়ে। আবার বহুবিবাহের শিকার নারী প্রেমিকের হাত ধরে কুলত্যাগিনী হয়েছেন। অবশেষে এসে ভিড়তে হয়েছে গণিকাপল্লিতে।
