সত্যেন সেন তার রচনায় ঢাকার জানকীবাইয়ের কথা বলেছেন। এলাহাবাদের মেয়ে ছিলেন। থাকতেন ঢাকায়। সে সময় তিনিই ঢাকার সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক প্রাপ্ত বাইজি ছিলেন। একদিনের মুজরোতে তাঁকে ১৫০০ টাকা দিতে হত তৎকালীন সময়ে। জানকী ছিলেন এক নবাবের রক্ষিতা। নবাব তাতে এতই মুগ্ধ ছিলেন যে, কেউ যেন তাঁর কাছ থেকে জানকীকে ছিনিয়ে নিতে না পারে সেই জন্য কিছুটা কুৎসিত করার নিমিত্তে জানকীকে ৫৬ টি ছুরির আঘাত করেছিলেন। সে কারণে জানকী ছাপান্ন ছুড়ি নামে পরিচিত ছিল। ঢাকার বাঈজিদের নিয়ে তথ্য পাওয়া যায় হেকিম হাবিবুর রহমানের লেখায়। এলাহিজান উত্তর ভারত থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। নওয়াব আবদুল গনির কাছ থেকে তিনি নিয়মিত মাসোহারা পেতেন। নবাব সাহেবের কাছ থেকে আরও অনেকে মাসোহারা পেতেন, যাঁদের কথাও হেকিম সাহেব তাঁর লেখায় উল্লেখ্য করেছেন। হেকিম হাবিবুর রহমানের লেখায় পাওয়া যায় আচ্ছিবাইকে। আচ্ছিবাইকে নবাব সাহেবের সব থেকে ‘পেয়ারী বাইজি’ বলে উল্লেখ্য করেন। লক্ষ্ণৌর এই বাইজি ছিলেন নৃত্যে সুনিপুণা। হেকিম সাহেবের মতে ঢাকায় এরপরে এত বড়ো মাপের আর কোনো নর্তকী আসেনি। হীরা বাইজি নাকি নাচে খুব দক্ষ ছিলেন, হীরা বাইজি যখন নাচতেন তখন তাঁর গায়ের কালো রং থেকে নাকি আলো ঠিকরে পড়ত। হীরা বাইজির মেয়ে পান্না কিন্তু গজল গেয়ে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল।
সত্যেন সেনের লেখায় মালকাজান সম্বন্ধে জানা যায়। মালকাজান মুজরো করতে ঢাকা আসতেন। সে সময় তিনজন মালকাজান ছিলেন। আগ্রাওয়ালি মালকাজান, বেনারসের চুলবুলিয়া মালকাজান ও ভাগলপুরী মালকাজান। উপমহাদেশের বিখ্যাত বাইজি গওহরজান ছিলেন বেনারসের চুলবুলিয়া বা বড়ো মালকাজানের কন্যা। অসামান্য রূপসী মালকাজানের পূর্ব নাম ছিল লেডি এডেলাইন। আর্মেনিয়ান ইহুদি। স্বামী রবার্ট ইউয়ার্ডের সঙ্গে বিচ্ছেদ হলে পরে এডেলাইন বাইজিবৃত্তি গ্রহণ করে। এরপর ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে নিজের নাম রাখেন মালকাজান। আর মেয়ে এঞ্জেলিনার নাম রাখেন গওহরজান। গওহরজান ছিলেন ভীষণ শৌখিন আর ফ্যাশন সচেতন। নিজেকে সবসময়ই সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করতেন। বস্তুত গওহরজানের হাত ধরেই কিন্তু শিল্পীদের ফ্যাশন সচেতনতা এ দেশে শুরু হয়। গওহরজানের মা মালকাজানের সৎ বোন ছিল জদ্দনবাই। জদ্দনের মা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং জীবিকার কারণে মেয়েকে বাই হিসাবে তৈরি করে। জদ্দনবাই বেশ কয়েক বার বিয়েও করেন। জদ্দনবাই ঢাকার বিভিন্ন মেহফিল মাতিয়ে রাখতেন। তিনি ঢাকার নবাবের ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেয়েছিলেন বলেও জানা যায়। জদ্দনের শেষ স্বামী উত্তম চাঁদমোহন জদ্দনের প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে মুসলমান হন, আর তাঁকে বিয়ে করেন। মোহন নিজের নাম রাখেন আবদুর রশিদ। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এ বিয়েতে সাক্ষী হন।
১৮৭৩ সালে কলকাতার মেয়েরা যখন রঙ্গমঞ্চে আসার অনুমতি পেলেন, তখন সর্বপ্রথম গণিকাপল্লির সংগীতে পারদর্শীরাই কিন্তু মঞ্চে এসেছিলেন। তখন থেকে বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশক পর্যন্ত কিন্তু সমস্ত অভিনেত্রীরাই সুগায়িকা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে বিনোদিনী, তিনকড়ি, তারাসুন্দরী থেকে বিংশ শতাব্দীর আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা পর্যন্ত অনেকের কাছে নাম করা যায়। কাননদেবী এখনও অনেকেরই প্রিয়। কাননদেবী অভিনয়ও করতেন। ঢাকার প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাক চলচিত্র ছিল ‘দ্য লাস্ট কিস’-এর নায়িকা ছিল ললিতা। তাঁকে বাদামতলির গণিকাপল্লি থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁর আসল নাম ছিল বুড়ি। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। দ্যা লাস্ট কিসের সহ নায়িকা চারুবালাকে আনা হয় কুমারটুলির গণিকালয় থেকে। জিন্দাবাহার লেন থেকে আনা হয়েছিল দেববালাকে।
বাইজি বা গণিকা থেকে যেমন অভিনেত্রী ও গায়িকার ইতিহাস আছে, তেমনি বাইজি থেকে বেগম হওয়ার ইতিহাসও আছে। যেমন–মণি বা মুন্নিবাই। ইতিহাসের এক ধূলি-সময়ের কথা। মুন্নিবাই ছিল নবাব আলিবর্দি খাঁর জলসাঘরের এক বাইজি। অসম্ভব সুন্দর দেহবল্লরীর অধিকারিণী ছিলেন তিনি। তাঁর রূপ-মাধুরী আর নাচের নুপুরের নিক্কণে নবাব অন্দরমহলের অনেক যুবা পুরুষেরই অন্তরে কাঁপন ধরত। মিরজাফরেরও অন্তর কাঁপিয়েছিল এই নর্তকী। আলিবর্দি খাঁর প্রধান সেনাপতি থাকা অবস্থায় মিরজাফর প্রায়ই জলসাঘরে গিয়ে মুন্নিবাইয়ের সঙ্গে ফুর্তি করত। তখন থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল মুন্নিবাইকে বিয়ে করার।কিন্তু রাজকীয় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জলসাঘরের কোনো নর্তকী অভিজাত মুসলমানের পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব ছিল না।মিরজাফর তাঁর লালিত স্বপ্ন পূরণ করেন পলাশি যুদ্ধের পর পুতুল নবাব হয়ে। তাঁর প্রথম স্ত্রী শাহ বেগমের আকস্মিক মৃত্যু হলে তাঁর স্বপ্নপূরণের সুযোগ এসে যায়। সমস্ত লোকলজ্জার মাথা খেয়ে তিনি এই নর্তকী মুন্নিবাইকে বিয়ে করে বেগমের মর্যাদা দেন।এইভাবেই শুরু হয়েছিল মুর্শিদাবাদে জেনানা মহলে বাইজি থেকে বেগম হওয়ার অধঃপতিত কাহিনি।
কথিত আছে, ‘দুশ্চরিত্রা’ এই মুন্নিবাইকে মিরজাফর আর-এক লম্পট লর্ড ক্লাইভের কাছে মনোরঞ্জনের জন্য পাঠাতেন। মুন্নিবাই তাঁর রূপ-মাধুরীতে বিমুগ্ধ করত ক্লাইভকে। সেইসঙ্গে তাঁদের নাবালক পুত্র নাজিমের জন্য বাংলার পরবর্তী নবাবের পদটিও নিশ্চিত করিয়ে নিয়েছিলেন। প্রায় সময়েই মিরজাফর অন্যান্য নারী ও নর্তকীদের সঙ্গে সুরাপানে মত্ত থাকত, আর এইসব নারীদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ করে দিত স্বয়ং মুন্নিবাই। এই সুযোগে মুন্নিবাইও রাজমহলের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন। বাংলার নবাবিও চালাত ইংরেজ লর্ডদের সঙ্গে যোগসাজস ও মনোরঞ্জন করে এই নাচনেওয়ালি। তাহলে দেখা যাচ্ছে মুন্নিবাই বাইজি থেকে বেগম হলেন বটে, কিন্তু বেগম থেকে যে-কোনো স্বার্থে গণিকা হতেও তাঁর আপত্তি ছিল না।
