বাইজি মানেই যেমন গণিকা নয়, তেমনি গণিকা মানেই বাইজি নয়। আবার বাইজিও গণিকা হতে পারে, গণিকাও বাইজি হতে পারে। তাই আমাদের সমাজে বাইজি আর গণিকা সমার্থক হয়ে আছে। ভবানীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাইজি আর গণিকাকে একই মনে করতেন। তিনি তাঁর ‘নববাবুবিলাস’ গ্রন্থে লিখেছেন–“গাওনা বাজনা কিছু শিক্ষা করো যাহাতে সদা জিউ খুসি থকিবেক এবং যত প্রধানা নবীনা গলিতা যবনী বারাঙ্গনা আছে ইহাদিকের বাটীতে মধ্যে মধ্যে যাতায়াত করিয়া ঐ বারাঙ্গনাদিকের সর্বদা ধনাদি দ্বারা তুষ্ট রাখিবা, কিন্তু যবনী বারাঙ্গনাদিগের বাই বলিয়া থাকে, তাহা সম্ভোগ করিবা, কারণ পলাণ্ড অর্থাৎ পেঁয়াজ ও রশুন যাহারা আহার করিয়া থাকে তাহারদিগের সহিত সম্ভোগে যত মজা পাইবা এমন কো রাঁড়েই পাইবা না।”
বাইজি যেমন নাচ ও গান করত, তেমনই দেহসম্ভোগও করত। তা ছাড়া সেসময়ে নাচা-গানা একমাত্র বাইজি নারীরাই করত। দেবদাসী, গণিকারাও নাচত। সাধারণ নারীদের তা নিষিদ্ধ ছিল। সেই কারণেই নৃত্যশিল্পী বা নাচনেওয়ালি বা নর্তকীদের ঘৃণার চোখে দেখা হয়। সেসময় নাচ করা মেয়েদের বিয়ে দেওয়া মুশকিল ছিল। যেসব মেয়েরা শখ করে নাচ করত তাঁদের ‘বাইজি’ বা ‘নর্তকী’ বলে ঘৃণা করত সমাজ। আজও রক্ষণশীল পরিবারের বাবা-মায়েরা কখনোই নাচ করা মেয়ের সঙ্গে তাঁদের ছেলের বিয়ে দেন না।
বাইজির পেশার বাইরে মেয়েদের নাচ করার অভ্যেস শুরু হয়েছে, এই তো সেদিন। যাই হোক, গণিকাদের যেমন প্রকারভেদ ছিল, বাইজিদেরও প্রকারভেদ ছিল। বাইজিদেরকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হত। যেমন—(১) যাঁর নামের সঙ্গে ‘বাই’ শব্দটি থাকত, তিনি শুধুই গান করতেন। যেমন–মুন্নিবাই। (২) যাঁর নামের সঙ্গে ‘জান’ শব্দটি ব্যবহৃত হত, নাচ ও গান উভয়ই করতেন। যেমন–গহরজান। (৩) যিনি কেবলই অতিথিদের আদর-আপ্যায়ন করতেন, তাঁকে ‘কানিজ’ বলা হত। (৪) যিনি কেবলই গণিকাবৃত্তি করতেন, তাঁকে ‘খানাগি’ বলা হত। বাবুদের অবশ্য সবই চলত।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতায় বাবুগিরির বড়োই টালমটাল অবস্থা হল। বাণিজ্যলক্ষ্মীর কৃপা থেকে বঞ্চিত হতে থাকল বাবুরা। কেউ উঠতির মুখে তো কেউ পড়তির মুখে। বাইজি নাচ ও খেমটা নাচ সেকালে ঢাকার মানুষদেরও জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁর ছেলের বিয়েতে ঢাকা থেকে বাইজি আনতে পেরে গর্ব অনুভব করেছিলেন। ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে বাইজি বা গণিকাঁপাড়া ছিল। সে সময় বাইজিপাড়া হিসাবে গঙ্গাজলি ও সাঁচিবন্দর ছিল। ঢাকার ইসলাম পুর ও পাটুয়াটুলির মোড় থেকে যে পথটি ওয়াইজঘাট নামে বুড়িগঙ্গার দিকে চলে গেছে তার নাম ছিল গঙ্গাজলি। সন্ধ্যা নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে তবলার বোল, সেতারের ঝংকার আর নুপুরের নিক্কণ গঙ্গাজলির পরিবিশ মুখরিত হয়ে উঠত। বাবু আর সাহেবদের আলবোলার গুড়গুড় শব্দ পরিবেশের সঙ্গে ছিল সংগতিপূর্ণ।
নাট্যকার সাঈদ আহমেদ তাঁর একটি লেখায় বলেছেন—কাছেই ছিল মহেশ ভট্টাচার্যর বিশাল হোমিওপ্যাথিক ওষুধের দোকান, গঙ্গাজলির উল্টোদিকে ছিল কালীমন্দির। গঙ্গাজলি ছিল দোতালা প্রশস্ত বাড়ি। নীচতলায় বাইজিদের কাজের লোকেরা থাকত। বাইজিরা থাকতেন দোতালায়। বাঁকওয়ালা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হত। বারান্দায় পাতা থাকত ইজিচেয়ার। বাইজিদের খাসকামরা সাজানো থাকত শান-শওকতে। ফরাশ বিছানো ঘর।
গঙ্গাজলির অধিকাংশ বাঈজিরা প্রতিদিন সকালে গঙ্গাজলি থেকে স্নানের জন্য দল বেঁধে বুড়িগঙ্গায় যেতেন। স্নান সেরে বুকে গামছা জড়িয়ে কোমড়ে পিতলের কলসি নিয়ে সিক্ত ভূষণে বাইজিরা লাইন দিয়ে ফিরে আসতেন। এ দৃশ্য উপভোগ করতে কৈশোরে বন্ধুদের নিয়ে ওয়াইজ ঘাট এলাকায় যেতেন নাট্যকার সাঈদ আহমেদ। শিল্পী পরিতোষ সেনও কিন্তু ভুলে যাননি সিক্ত বসনে বাইজিদের ঘরে ফেরার দৃশ্যর বর্ণনা দিতে। তিনি লিখছেন—“আমাদের পাড়ায় বারবনিতারা প্রতিদিন সকালে স্নান করতে বুড়িগঙ্গা যায়। তাঁদের স্নানে যাওয়ার পথটি আমাদের বাসার সামনে দিয়ে। ফেরার পথে ভেজা কাপড়ে কালী মন্দিরে প্রণাম করে আমাদের গলির মুখে আবার দেখা হয়। সকালবেলার এই মনোরম দৃশ্যটি আমাদের পাড়ার পুরুষদের চোখকে বেশ তৃপ্তি দিত। তাঁদের মন মেজাজ খোশ রাখে। দিনটি ভালো কাটে।” সদ্যস্নাত তরুণীদের প্রথম সারির মাঝখানে ১৬ ১৭ বছরের একটি মেয়ের আকর্ষণীয় বর্ণনাও দিয়েছিলেন পরিতোষ সেন। সেই সরস বর্ণনা শামীম আমিনুর রহমানের একটি লেখায় পাচ্ছি—“মুখটি অবিকল লিচুর মতো গোল। থুতুনিটি ঈষৎ তীক্ষ্ণ, ঠোঁট দুটি যেন রসালো দুটি কমলার কোয়া। তাঁর নাকের ছোট্ট পাটা দুটি প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে সাথে ফুলে ফুলে উঠছিল। গোটা শরীরটি যেন মুর্শিদাবাদী রেশম দিয়ে মোড়ানো। এমনই মসৃণ আর চকচকে তাঁর ত্বক। পাকা পাতিলেবুর গায়ে হাল্কা গোলাপি রঙের পোঁচে যে রঙের মিশ্রণ হয় ঠিক তেমনই তাঁর গায়ের রঙটি। তার নীল কালো চোখ। দুটি যেন স্তম্ভিত মেঘ মুখের অর্ধেকটাই জুড়ে আছে।” পরিতোষ সেন আরও বর্ণনা দিয়েছেন—“ভেজা কাপড়টি মেয়েটির গায়ে লেপটে থাকায় কারণে তাঁর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন একটি ফুলের বিভিন্ন পাপড়ির মতো আলাদা সত্ত্বা নিয়ে সরল বৃন্তটির উপর দাঁড়িয়ে আছে। এক একটি পাপড়ি যেন একেকটি ফুল। বাকি মেয়েকটির মতো তার কাঁধেও পেতলের কলসি ভরা বুড়িগঙ্গায় জল। এই কলসি আর নিতম্ব দুইই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। দুইই টলোমলো। এমনই সুন্দর সাবলীল আর বেপরোয়া।”
