নাচ গান ও রূপের নেশায় উচ্চমান অর্জন হলেও কোনো পুরুষ শিল্পী কিন্তু এই সব বাইজির সঙ্গে এক আসরে বসতে চাইতেন না। কলকাতার একটি আসরে মোস্তারিবাই পূরবী রাগে খেয়াল গেয়ে সুরের মদিরায় শ্রোতাদের এমন আচ্ছন্ন করেছিলেন যে, ওই আসরে পরবর্তী শিল্পী বিখ্যাত ফৈয়াজ খা, এনায়েত খা ও হাফেজ খাঁ মঞ্চে উঠতেই অস্বীকৃতি জানলেন। ইন্দোররাজ শিবাজী হোলকারের সভার বিখ্যাত বীনাকার স্বয়ং বন্দে আলি খাঁ। বীণা বাজিয়ে সুরের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ করেন সব শ্রোতাদের, শিবাজীর খাস নর্তকী চুন্নাবাই কিন্তু ছিলেন সেদিন মুগ্ধ শ্রোতাদের আসরে। খুশি হয়ে রাজা ইনাম দিতে চেয়েছিলেন বীণাকারকে। সুরমুগ্ধ রাজাকে চমকে দিয়ে বন্দে আলি খাঁ ইনাম হিসাবে চেয়ে বসলেন বাইজি চুন্নাবাইকে।
“বাড়ি বাড়ি বা বাঈ ভেডুয়া নাচায় বাঈ
মনোগত রাগ সুর ধরে,
মৃদু তান ছেড়ে গান, বিবিজান নেচে যান।
বাবুদের লবেজান কোরে।”
ঈশ্বরগুপ্তের কলমে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের কলকাতায় বাইবিলাসের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন এই কবিতাটিতে। সেকালের বাবুবিলাসের প্রধান উপকরণই ছিল বাইজি ও বাইনাচ। সেই বাবুরা সাহেবদের খুশি করার জন্যেও বাইজির আমদানি করত ভিন রাজ্য থেকে। সুদূর লখনউ থেকে বাইজি আনা হত আসরে। তবে আসর সেকালের কলকাতায় কিছু ব্যাপার নয়। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই কলকাতা শহরে বাইচের নেশা জড়িয়ে গিয়েছিল। কোনো উৎসব লাগলেই হল, অমনি বাইজি এসে গেল নাচঘরে। মুজরোর খরচের বহর দেখিয়ে এবং রূপ-জৌলুসের বাহারে চোখ ধাঁধিয়ে এক বাবু আরেক বাবুকে টক্কর দিয়ে বড়োই আমোদ পেতেন। বাইজি নাচ ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেল। তবে বাইজি নাচ ক্রমশ ভারতে সীমাবদ্ধ না থেকে ইউরোপীয় সমাজেও প্রচলন হয়ে গিয়েছিল। বাইজি নাচ সেসময় স্ট্যাটাস সিম্বল হিসাবে দেখা হত। কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশ লখনউ, বেনারসের বাইজিদের স্বপ্ন দেখিয়েছে। সেরা বাইজি বলতে যা বোঝায়, তাঁর অধিকাংশই ছিল অবাঙালি।
“তখন আমি দস্তুরমতো গানের চর্চা করি। কোথায় কে গাইয়ে-বাজিয়ে এলো সব খবর আসে আমার কাছে। কাশী থেকে এক বাইজি এসেছে, নাম সরস্বতী, চমৎকার গায়। শুনতে হবে। এক রাত্তিরে ছ’শো টাকা নেবে। শ্যামসুন্দরকে পাঠালুম, “যাও দেখো কত কমে রাজি করাতে পারো।’ শ্যামসুন্দর গিয়ে অনেক বলে করে তিনশো টাকায় রাজি করালে।”—‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ নিবন্ধে সরস্বতী বাইজির গান শোনার স্মৃতিচারণ করছেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাইজির গান শুনবেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুররা শুনতেন! মাত্র দুটি গানের জন্য এক রাতে ৩০০ টাকা দিয়ে! সে যুগে ৩০০ টাকার মূল্য নেহাত কম নয়। নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথও। এহেন সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ চেপে রাখেননি–“অবনদা, করেছ কী! তিনশো টাকা জলে দিলে?” এদিকে শ্যামসুন্দর এসে জানালেন, টাকার সঙ্গে দু-বোতল ব্র্যান্ডিও চাই সরস্বতীর। ব্র্যান্ডি না-খেলে তিনি নাকি গাইতেই পারেন না। অবনীন্দ্রনাথ তাতেও রাজি। গান তিনি শুনবেনই। সরস্বতী গাইতে শুরু করলেন রাত ১০টায়। একটা গানেই রাত ১১ টা বাজল। এ প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ লিখছেন–“এক গানেই আসর মাত। গানের রেশে তখনও সবাই মগ্ন। সরস্বতীবাই বললেন, “আওর কুছ ফরমাইয়ে’।” তাঁকে এরপর একটা ভজন গাইতে বললেন অবন ঠাকুর। সরস্বতী গাইলেন ‘আও তো ব্রজচন্দলাল। মুগ্ধতার মীড়ে আরও একবার টান পড়ল। অবনীন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি করে ছবি এঁকে রাখলেন তাঁর। গান শেষ, বাই উঠে পড়লেন। অবনীন্দ্রনাথের মনে হল, দু-খানা গানের জন্য ৩০০ টাকা দেওয়া সার্থক।
নগেন্দ্রনাথ ঘোষ এক জায়গায় বলছেন, কলকাতায় বাইজি নাচের প্রবর্তক রাজা নবকৃষ্ণ দেব। তাঁর ইংরেজ আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। এই নবকৃষ্ণই ছিলেন কবিয়াল হরু ঠাকুর ও নিতাই দাসেরও পৃষ্ঠপোষক। তাঁর সভায় বাইচের আয়োজন হত ‘এলিট’ সাহেব-সুবো আর বাবুদের জন্য। কবিগানের দরজা সেখানে সাধারণের জন্যেও ভোলা। এমন ‘নষ্ট মেয়েমানুষ’ বাইজিদের নাচ-গানের পরে সেই কবিগানকে ঘোর অশ্লীল মনে হয়েছিল রেভারেন্ড ওয়ার্ডের। ১৮০৬ সালে শোভাবাজারের রাজা রাজকৃষ্ণ দেবের বাটিতে তিনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বাই নাচ দেখতে। এই আয়োজন বাছাই করা মানুষদের জন্য। ভোররাতে বাই নাচের পরে শুরু হল হরু ঠাকুর আর নিতাই বৈরাগীর কবিগান। বন্ধ দরজা হাট করে খুলে দেওয়া হল সাধারণের জন্য। পিলপিল করে ঢুকল লোক। শুরু হল ‘অশ্লীল’ কবিগান। রেভারেন্ড ওয়ার্ডের মনে হল, বাই নাচের একদম বিপরীত মেজাজের অনুষ্ঠান এসব।
তবে নিন্দে-মন্দর বিপরীত স্রোতও ছিল সে সময়। সেখানে খেমটা নাচ আর বাইজি নাচের মধ্যে রুচি ও সংস্কৃতির পার্থক্যও খোঁজা চলছিল। দেখা গেল, বাইজি নাচ তুলনামূলক অনেক সভ্য, শালীন। বাইজি নাচকে ভুলবশত মহারাষ্ট্রের নৃত্য হিসাবে উল্লেখ করে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’-এ লিখেছেন–“খেমটা তান্ত্রিক, মহারাষ্ট্র নৃত্য পৌরাণিক। পুরাণের ন্যায় এই নৃত্যের গাম্ভীর্য আছে।” খেমটা এই লেখার লেখকের চোখে ‘ছোটলোকের আমোদ’, ‘কুৎসিত নাচ’। সাধারণী’ পত্রিকাও খেমটাকে ‘নীচ ভাববাদ্দীপক জঘন্য’ নাচ বলে প্রশংসা করছে বাই। নাচের। অর্থাৎ বাই নাচের শ্রেণিচরিত্রগত একটি পার্থক্যও স্বীকৃত হচ্ছিল সমাজে। ভাবটা এমন যেন বাইরা ‘নষ্ট মেয়েমানুষ’ হতে পারে, কিন্তু তাঁদের শিল্পটি উচ্চাঙ্গের। তা উচ্চকোটির আস্বাদনের সামগ্রী।
