সেসময়ের শনিবারের কলকাতা ছিল শহরজুড়ে সারারাত মদ, গাঁজা আর মেয়েমানুষ নিয়ে বেহদ্দ মজা করার দিন। বিশেষ করে রামবাগান, সোনাগাছি, মেছোবাজার, সিদ্ধেশ্বরীতলা, হাড়কাটা, চাঁপাতলা, ইমামবক্স, চিৎপুর মদের গন্ধে মম করত। একেবারে নরক গুলজার! বাবু কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় যখন খ্রিস্টান হল দ্বারকানাথ মন্তব্য করেছিলেন—এই ধর্মান্তরের কারণ ‘গোরুর মাংস ও মদ্যপান’-এর সুযোগ লাভ। মধুসূদন দত্ত, রাজনারায়ণ বসু, ভুদেবচন্দ্র মুখোপাধ্যায় যখন হিন্দু কলেজে পড়তেন তখন প্রকাশ্য স্থানে বসে নিকটস্থ মুসলিম দোকান থেকে গোরুর মাংসের কাবাব এনে খেতেন এবং মনে করতেন সেটাই পুরোনোকে বর্জন করার একটা বাহাদুরি। সঙ্গে মদ্যপান তো ছিলই। বাবুরা তখন তিন ‘ম’-তে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন—মদ, মাংস ও মেয়েমানুষ। কিন্তু মধুসূদন, রাজনারায়ণ, ভুদেবের মতো ইয়ংবেঙ্গলরা মেয়েমানুষের ব্যাপারটাকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। এই দোষটি তাঁদের ছিল না।
কলেজের ছাত্ররা সুরাদেবীর আরাধনা করতেন বটে, তবে গণিকাসক্ত ছিল না। তাঁদের একপুরুষ পূর্বে যুবকরা আবার গণিকাসক্ত ছিলেন, কিন্তু মদ্যপান করতেন না। গাঁজা, চরস বা আফিম খেতেন। ইংরেজি শিক্ষার ফলে পুরোনো নেশা চণ্ডু, গুলি, আফিম বা কালাচাঁদ, তড়িতানন্দ বা গাঁজা বিদায় নিল নতুন জাতে ওঠা অভিজাতদের কাছ থেকে। আগে নেশাখোর বোঝাতে ‘গুলিখোর’, ‘গাঁজাখোর’, ‘চণ্ডুখোর’, আফিমশোর’, প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হত। ইংরেজি শিক্ষিতদের কল্যাণে জন্ম হল নতুন শব্দ মদখোর’। ক্রমে এঁদের হাত ধরে মদের নেশা শুরু হল বাংলার ঘরে ঘরে। একদিন এমন হল যখন মদই নেশার জগতে একনম্বর স্থান পেল। তবে সবাই তো আর ভদ্রলোক হয়ে উঠতে পারেননি। নিম্নবর্গের যে মানুষ, এঁরাই ছিলেন সংখ্যায় বেশি। শুড়ির দোকানে বা চিকিৎসকের ডিসপেনসারিতে মদ বিক্রি হত এদের জন্য। অনেকেই সেখানে দাঁড়ভোগ’ খেয়ে টলতে বাড়ি ফিরতেন। এ দৃশ্য তখন কলকাতায় গা-সওয়া। মোদ্দা কথা, তখন হয় গণিকাবাড়ি, নয় রাস্তায় গড়াগড়ি। অথবা
পুরো গড়াগড়িটাই গণিকাবাড়িতে। বাঙালি শিক্ষিতদের কল্যাণে জন্ম হল আরও একটি নতুন শব্দ ‘মাগিখোর’ বা মাগিবাজ’।
১০. ভারতের বাইজি-সংস্কৃতি ও গণিকাবৃত্তি
বাবু কালচারের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বাইজি প্রসঙ্গটা এসেছিল। তাই বাইজি নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করতে মন চাইছে। আমাদের সমাজে গণিকাদের মতো বাঈজিরাও ঘৃণ্য, সমাজচ্যুত, প্রান্তিক। বাইজি আর গণিকা যেন সমার্থক। বাইজিদের নাচনেওয়ালি বা নর্তকীও বলা হয়। বাইজি’ হিন্দি শব্দ বাই-এর সঙ্গে ‘জি’ যুক্ত হয়ে বাইজি’ কথাটি প্রচলিত হয়েছে। অতীতে ভারতের উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্যে বাই’ শব্দ দ্বারা ধ্রুপদী নৃত্য-গীতে পারদর্শী সম্ভ্রান্ত মহিলাদের বোঝানো হত। খুব ছোটো থাকতেই তাঁরা ওস্তাদদের কাছে তালিম নিয়ে নৃত্যগীত শিখতেন। শিক্ষা শেষে শাস্ত্রীয় নৃত্যগীতকে পেশা হিসাবে নিলে লোকে তাদের বাই’ শব্দটির সম্মানসূচক ‘জি’ শব্দটি জুড়ে দিত, তখন তাদের নামে শেষে ‘বাইজি’ শব্দটি শোভা পেত। বাইজি অর্থ পেশাদার নর্তকী ও গায়িকা। বাইজিদের নানা নামে পরিচয় আছে, যেমন–খেমটাওয়ালি, জান, তওয়াইফ, নাচনি, নাচওয়ালি, বাইওয়ালি ইত্যাদি। বইজিরা নিজগৃহে আসর বসিয়ে অথবা বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে, মহফিল দরবারে আমন্ত্রিত হয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নৃত্যগীত পরিবেশন করেন। আগেকার দিনে নবাব, নৃপতি, রাজা, মহারাজা, জমিদার, আমলাবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁদের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে, আসরে, রংমহলে, বাগানবাড়িতে, প্রমোদবিহারে বাইজিরা নাচ-গান করতেন।
খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলায়, বিশেষ করে কলকাতায় বাইজিদের আগমন ঘটতে থাকে। অযোধ্যার বিতাড়িত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের (১৮২২-১৮৯৭) কলকাতার মেটিয়াবুরুজ এলাকায় নির্বাসিত জীবনযাপনকালে সেখানে যে সঙ্গীত সভার পত্তন ঘটে, তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক বাঈজির আগমন ঘটে। বেশিরভাগ বাইজিই রাগসঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় নৃত্য বিশেষত কখকে উচ্চশিক্ষা নিতেন। বাইজিদের নাচ-গানের আসরকে ‘মুজরো’ বলা হয়, আবার তাকে মেহফিল বা মাহফেলও বলা হয়ে থাকে। মেহফিলে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অংশগ্রহণ ছাড়াও কোনো কোনো বাইজি রাজা-মহারাজা-নবাবদের দরবার থেকে নিয়মিত মাসিক বেতন পেতেন। বাইজিদের নাচ-গানে মোহগ্রস্ত হওয়ার কারণে কোনো কোনো নবাব-রাজা মহারাজা বা ধনাঢ্য ব্যক্তির পারিবারিক ও আর্থিক জীবনে বিপর্যয়েরও সৃষ্টি হয়েছে। বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাইজিদের জন্য পরিচিত ছিল লখনউ, এলাহাবাদ, বেনারস, কানপুর, পাটনা, আগ্রা, বরোদা, কলকাতা, দিল্লি প্রভৃতি স্থান। প্রাথমিক যুগের নামকরা বাইজিদের মধ্যে ছিলেন নিকি, আসরন, জিন্নাত, বেগমজান, হিলা, মির্জাজান, নান্নিজান, সুপনজান প্রমুখ। এদের মধ্যে নিকি বাইজি ১৮২৩ সালে রাজা রামমোহন রায়ের বাগানবাড়িতে নৃত্যগীত পরিবেশন করে দেশি-বিদেশি রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে খ্যাতিলাভকারী বাঈজিদের মধ্যে শ্রীজান, মুশতারি, মাশকাজান, গহরজান, জদ্দনবাই, জানকী বা ছাপ্পান্ন ছুড়ি, জোরোবাই, আবদনবাই, নাছমিবাই, নীলম, রোশনারা, আসতারি, রসুলুন, কালীবাই, হীরাবাই, কেশরবাই, সরস্বতী, মুন্নি, কানিজান, আমিরজান, গাঙ্গু, বিদ্যাধরী, সিদ্ধেশ্বরী প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। হেকিম হাবিবুর রহমান তার লেখায় অনেক বাইজির নাম বলেছেন, যেমন—আবেদি বাই, আমু, গা, নোয়াবিন, পিয়ারী বেগম, আচ্ছিবাই, ওয়াসু, বাতানি, হীরা, লক্ষ্মী, জামুরাদ, রাজলক্ষ্মী। এ ছাড়া সত্যেন সেনের লেখা থেকে জানকীবাই ও মালেকাজানের নাম জানতে পারি।
