তৎকালে বিদেশে স্ত্রী-পরিবার সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার প্রথা না-থাকায় প্রায় সকল আমলা-আইনজীবী ও মোক্তারদের এক একটি উপপত্নীর দরকার হত। অতএব এই ‘উপপত্নী’র সাপ্লাই যাতে নিরবচ্ছিন্ন হতে পারে, সেই কারণে তাঁদের বাসস্থানের সন্নিহিত স্থানে স্থানে গণিকালয় প্রতিষ্ঠা পেতে থাকল। সেজন্যই উত্তর কলকাতার প্রাচীন ও সম্ভ্রান্ত শহরবাসীদের বসতি কেন্দ্রের আশেপাশেই শহরের বিখ্যাত গণিকালয় প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। শহর কলকাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এইসব গণিকালয়। বাবুদের মেয়েমানুষ নিয়ে আমোদ করার জন্য যেমন, তেমন সাধারণের জন্যও শহরে গড়ে উঠেছিল নতুন তীর্থক্ষেত্র, গণিকালয়। সুতরাং এমন পাড়া ছিল না যেখানে অন্তত দশঘর গণিকা নেই। শহরে তখন যত্রতত্র এদের বসবাস। গৃহস্থের বাড়ির পাশে, সদর রাস্তার উপর, যেখানে ইচ্ছা গণিকারা বাস করত। এমনকি জোড়াসাঁকোর মূল ব্রাহ্মসমাজটি গণিকালয়ের মাঝখানেই। হুতোম প্যাঁচার নকশার মন্তব্যে কলকাতা শহর তখন ‘বেশ্যাশহর’ হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর গণিকার সংখ্যা বাড়ছে বই কমছে না। এমনকি একজন বড়ো মানুষের বাড়ির পাশে গৃহস্থের বৌ-ঝি নিয়ে বাস করবার জো পর্যন্ত ছিল না। গণিকারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি আর গালিগালাজ করত। সাধারণ পথিকরাও তাদের হাত থেকে নিস্তার পেত না। কখনো দেখা গেল এক গণিকা রসিক বাবুকে দেখে পানের পিক ফেলতে গিয়ে তা অফিস ফেরত এক কেরানির মাথায় পড়ল। কিন্তু কেরানিটি ভয়ে কিছু না-বলে মানসম্মান নিয়ে চলে গেল। দু-একজন কেরানি এসব ইতরামি সহ্য করতে না-পেরে প্রশাসনের ভয় দেখাত। গণিকারা তখন খিলখিল শব্দে হেসে উঠে বলত–“বেশ্যাবৃত্তি করি বটে, কিন্তু তোদের মতন সাতটা কেরানিকে পুষতে পারি। কলম পিষে তোর তিন পুরুষ যা না করতে পারবে আমরা একপুরুষে তাই করেছি।”
কলকাতায় গণিকাদের পসরা এতটাই বাড়বাড়ন্ত হয়ে উঠেছিল যে, কলকাতার এক বর্ণনায় দেখা যায়–“গৃহস্থের বাড়ির পাশে বেশ্যা, ছেলেদের পাঠশালার পাশে বেশ্যা, চিকিৎসক কবিরাজ বাসস্থানের পাশে বেশ্যা, এমনকি ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরের আষ্টেপৃষ্ঠে বেশ্যা।” ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ পত্রিকার খবরে জানা যায়–“গণিকারা প্রত্যহ সন্ধ্যা হতে রাত দশটা পর্যন্ত রাজপথে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেদের মধ্যে যে-সব কুভাষা বা কদৰ্যালাপ করত, তাতে সাধারণ পথিকরা বিব্রত হতেন। স্বভাবতই পথিকদের দেখলে গণিকারা আমন্ত্রণ জানাত, পথিকদের নানাভাবে উৎপাত করত, এমনি পথিকদের উদ্দেশে নানারকম কুকথাও বলত।” কলকাতার পুলিশ ধনীদের আশ্রিত প্রমোদপল্লি এলাকায় হস্তক্ষেপ করতে সাহস পেত না। স্থানীয় বর্ধিষ্ণু সাধারণ মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের নীতিবোধ ও রুচিবোধ গণিকাদের এই প্রকাশ্য ইতরামিতে ক্ষুণ্ণ হত এবং তাঁরা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন করত। কিন্তু তাতে ফল কিছুই পাওয়া যেত না। বিত্তবানদের আশ্রিত গণিকারা শহরের প্রকাশ্য রাজপথে নৃত্য করতেও ভয় পেত না। স্বয়ং দ্বারকানাথ ঠাকুর কলকাতার একটি এলাকাতেই ৪৩টি গণিকালয়ের মালিক ছিলেন। মানে বাড়িগুলোর ভাড়াটেদের পেশা ছিল গণিকাবৃত্তি। কলকাতায় তাঁর আরও এরকম অনেক বাড়ি ছিল। সেকালে গণিকাদের কাছে বাড়ি ভাড়া দিলে ভাড়াটা বেশি পাওয়া যেত।
বাবু কলকাতার সেই কদর্য বেলেল্লাপনার ছবি এখন আমরা কল্পনাতেও আনতে পারি না। শহরের যত্রতত্র গজিয়ে উঠেছে গণিকপল্লি। বিত্তশালী বাবুদের প্রশ্রয়েই এইসব গণিকাপল্লী গজিয়ে উঠেছিল। অতএব প্রশাসনের সাধ্য ছিল না এহেন কালচারের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার। এইসব বাবুদের আদর্শ ছিল মূলত ইংরেজ রাজকর্মচারীরা। শ্রীপান্থ তাঁর কলকাতা’ গ্রন্থে ‘রোটি আউর বেটি অংশে লিখেছেন—-“সতীদাহ কলকাতায় তখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। সারা ব্ল্যাক টাউন চিতার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, অন্ধকার। সেই অন্ধকারে চলছে বাবুবিলাস, গুরু-প্ৰসাদী কৌলীন্য রক্ষা। সতীর আর্তনাদে, বিধবার কান্না আর বারবনিতার কাতর আহ্বানে অষ্টাদশ শতকের কলকাতা প্রেতপুরী। পা যেন লজ্জায় জড়িয়ে আসে সেদিকে বাড়াতে।”
গণিকালয় যে শুধু সাহেব আর বাবুদের জন্য গড়ে উঠেছিল ব্যাপারটা এমন নয়। চোর-ডাকাত, বদমাস এবং ইতরজনরাও এসব গণিকাদের কাছে যৌনক্ষুধা মেটাতে যেত। তাই বলে সব গণিকালয় একরকম ছিল না। মানুষভেদে, শ্রেণিভেদে নানা ধরনের গণিকালয় গড়ে উঠেছিল সেসময়। সন্দেহ নেই এই গণিকালয়গুলো কলকাতা শহরের এক বৈচিত্র্য ছিল এবং বিভিন্ন গণিকালয়ে বিভিন্ন ধরনের রঙ্গ চলত। মধ্য রাতে শহরের রাস্তায় সজ্জিতভাবে বহু গণিকাকে খদ্দেরের হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। ভদ্রলোক বাবুরা তখন নিজেদের ঘরের স্ত্রী-কন্যাদের পর্দানসীন করে ফেলেছিলেন, আর নিজেরা ইয়ার-বন্ধুদের নিয়ে বাগানবাড়িতে বসে সেরা গণিকাদের হাট বসাতেন। ঘরের স্ত্রী-কন্যাদের এসব জেনেও মুখ বন্ধ করে বসে থাকতে হত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। তিনি গোমাংস খেতেন, ইংরেজদের সঙ্গে একত্রে বসে মদ আর নারী নিয়ে হৈ হুল্লোড় করতেন। তাঁর বাগানবাড়িতে বাইজিদের নাচ-গানের আসর বসত প্রায় রাতেই।
