বিশ্বজুড়ে বহু যুগ (বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) ধরে যে বিতর্ক চলছে, তা হল–গণিকাবৃত্তিকে কি আইনি বৈধতা দেওয়া উচিত? সেমিনারের পর সেমিনার হচ্ছে। নারীবাদীদের সঙ্গে সমাজতাত্ত্বিকরাও নেমেছেন আসরে। কিন্তু বিতর্কের কোনো অবসান হচ্ছে না। আইনি বৈধতা নয়, এর সপক্ষে মোটামুটি দশটি যুক্তি পাওয়া যায়। যেমন–(১) গণিকাবৃত্তির আইনি স্বীকৃতি আসলে আড়কাঠি, দালাল, শরীর-ব্যবসায়ী বাড়িওয়ালিদের কাছে এক উপহারস্বরূপ। এই ছাড়পত্রের সুবাদে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠবে গণিকালয়, সেক্স ক্লাব, ম্যাসাজ পার্লার, মধুচক্র, যৌনঠেক ইত্যাদি। (২) গণিকাবৃত্তির বৈধতাদান বা নিরপরাধীকরণের অর্থ নারী পাঁচরকে উৎসাহিত করা। (৩) যৌনপেশার আইনি বৈধতা বা নিরপরাধীকরণ গণিকাবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং তাকে বাড়িয়ে দেয়। (৪) গণিকাবৃত্তি আইনি বৈধতা পেলে গোপনকর্ম আর গোপনে থাকবে না। প্রকাশ্যেই শরীর কেনাবেচার হাট বসে যেতে পারে। (৫) গণিকাবৃত্তির স্বীকৃতিদান ও নিরপরাধীকরণ যৌনপেশায় নাবালিকাদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দেবে। (৬) গণিকাবৃত্তির আইনি স্বীকৃতি সাধারণ নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না। (৭) যৌনব্যাবসা চাহিদা আরও বাড়িয়ে দেবে। আইনি প্রশ্রয় পেয়ে পুরুষকে নারীদেহের প্রতি আরও আকৃষ্ট করবে। (৮) আইনি বৈধতার যৌনপেশায় যুক্ত মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয় না। (৯) বৈধতা বলবৎ হলেও যৌনপেশায় যুক্ত মেয়েদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য বৃদ্ধি পাবে না। (১০) তদুপরি যৌনপল্লির স্থায়ী বাসিন্দারাই চায় না বৈধতা।
গণিকাবৃত্তিকে অবৈধ করলে গণিকারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যা তাদের প্রতি সহিংসতা, দারিদ্রতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে দুর্বল অবস্থানে দাঁড় করায়। একজন সাধারণ নারীর তুলনায় একজন গণিকার ধর্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামুলকভাবে অনেক বেশি। এমনকি গণিকাদের খুন হওয়ার সম্ভাবনাও সাধারণ নারীর তুলনায় বেশি। ২০১৫ সালের ৩০ জুন, বিবিসির একটি লেখায় ব্রেন্ডা মায়েরস পাওয়েল (Brenda Myers-Powell) নামের প্রাক্তন এক গণিকার ২৫ বছর উপস্থাপিত হয়েছে। তার ভাষায়–“I’ve been shot five times, stabbed 13 times–I don’t know why those men attacked me, all I know is that society made it comfortable for them to do so.” (আমাকে পাঁচবার গুলি করা হয়েছে, ছুরির আঘাত করা হয়েছে ১৩ বার। এসব মানুষগুলো আমাকে আক্রমণ করেছিল কেন তা আমি জানি না। আমি শুধু জানি, সমাজ তাঁদেরকে এসব কাজের জন্য একটি তৃপ্তিদায়ক অনুভুতি দেয়।)।
গণিকাবৃত্তি বৈধ হলে গণিকাদের উপর অমানবিক আচরণ এবং সহিংসতার জন্য তাঁদের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দারস্থ হওয়ার পথ খোলা থাকে, যা কিছুটা হলেও এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সহায়ক হবে। ব্রেন্ডা মায়েরস পাওয়েলের একজন প্রাক্তন গণিকা, যে কিশোরী মেয়েদের তাঁর মতো পথ থেকে দুরে রাখতে কাজ করছে। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই তাঁকে একাজে উদ্বুদ্ধ করেছে। অনেক প্রামাণিক লেখা থেকে জানা যায়, যেখানে গণিকারাই দাবি করছে গণিকাবৃত্তি তাঁদেরকে সক্ষমতার দিকে এগিয়ে দিয়েছে। নারীকে আর্থিক সক্ষমতার শক্তিশালী করে তুলেছে। অনেকক্ষেত্রে যৌন স্বাধীনতা না-থাকলেও অন্যান্য স্বাধীনতাগুলি ভোগ করার সুযোগ এনে দিয়েছে। গণিকাদের অনেক লেখা ও সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে, গণিকাবৃত্তিকে নিজেদের মুক্তির কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে ‘Quartz’ নামের অনলাইল সাইট তাঁদের ফেসবুক পেজে যৌনকর্মীদের লেনদেন নিয়ে এই ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে একজন গণিকা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবার কারণ হিসেবে গণিকাবৃত্তিকে সামনে নিয়ে আসে। স্বয়ং গণিকাদের এমন সাবলীল স্বীকারোক্তি গণিকাবৃত্তিকে অবৈধ করার রাখার পিছনে যুক্তি কি, আবার খতিয়ে দেখতে উৎসাহিত বস্তুত অবৈধ গণিকাবৃত্তি জোরপূর্বক শিশু গণিকাবৃত্তি, মানব পাচারের মত অপরাধগুলো বাড়িয়ে তোলে। অবৈধ গণিকালয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নজরদারি না-থাকার কারণে গণিকাবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে এর পারিপার্শ্বিক অপরাধগুলোও সংগঠিত হতে থাকে, যা ধীরে ধীরে শুধুমাত্র ওই দেশ বা সমাজ না, পার্শ্ববর্তী দেশ, এমনকি পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও সম্পৃক্ত অপরাধ বাড়িয়ে তুলতে পারে। গণিকাবৃত্তির বৈধতা গণিকালয় সম্পর্কিত অপরাধের উপর নজরদারি নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
প্রকৃতপক্ষে গণিকাবৃত্তি যৌন-সম্পর্ক পরস্পরের প্রতি অন্তরঙ্গতা প্রকাশের এক অদ্বিতীয় উপায়, গণিকাবৃত্তি একে চুক্তিভিত্তিক লেনদেনের পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসে। এই সেবাগ্রহীতার অনেকের কাছেই যৌন-সম্পর্ক তখন শুধুমাত্র অর্থ প্রদানের মাধ্যমে উদ্দেশ্যসাধনের উপায় হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এরকম মনোভাব মানুষকে গণিকাদের দিয়ে এমন যৌনাচারের হাতিয়ার হিসাবে সামনে আনতে পারে যা সাধারণ নারী যাতে অনিচ্ছুক এবং এই প্রেক্ষাপটও মূল সমস্যার খুবই ক্ষুদ্র অংশকে উপস্থাপন করে। ২০১০ সালের ১৫ জানুয়ারিতে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ৭০০ জন যৌন পরিসেবা গ্রহণকারীদের উপর গবেষণার উপর একটি প্রতিবেদন অ্যালেক্স নামের এক ভদ্রলোক যৌনতা ক্রয় সম্পর্কে তার মনোভাব তুলে ধরেছেন এভাবে–“গণিকারা তাঁকে পছন্দ করুক সে তাই চায়, আবার একই সঙ্গে সে এই বিভ্রমে থাকতে চায় না যে তাঁরা প্রকৃতপক্ষেই একটি সম্পর্কের মধ্যে আছে।” গণিকাদের প্রতি এরকম মানসিকতা একেবারেই সাধারণ ঘটনা।
