শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষরাও এই পেশায় আসছে। বিকল্প নেই বলেই আসছে। কারণ সকলের জন্য বিকল্প থাকে না। স্কিল্ড বা দক্ষ হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যথেষ্ট পুঁজিও লাগে। দক্ষতা ও পুঁজি সবার থাকে না। অগত্যা যৌনপেশা বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে নারী-পুরুষের মধ্যে। এই পেশাকে অবৈধ করে রেখে নির্মূল করার চিন্তা বাতুলতা মাত্র। বরং আমি মনে করি যৌনপেশাকে কেউ যদি স্বেচ্ছায় বেছে নেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে এই পেশাকে ঘিরে অপরাধ প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে আমি এটাও বলব, এক্ষেত্রে কেউ যদি কোনো নারী বা পুরষকে যৌনপেশা করতে বাধ্য করে সেক্ষেত্রে কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করুক রাষ্ট্র। যেমন পাচার, বিক্রি, জোর করে যৌনপেশায় বাধ্য করানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি থাক। এমনকি যাঁরা নারী বা পুরুষের যৌনপেশার পয়সায় (পরিবার ছাড়া) জীবনধারণ করে বা সেক্স ইন্ডাস্ট্রি পরিচালনা করে বা যৌনকর্মের জন্য বাড়ি ভাড়া দেয় তাঁদের কঠোরতম শাস্তি দিক রাষ্ট্র। যৌনকর্মীদের জন্য ন্যূনতম শাস্তি থাকা উচিত নয়। উল্টে যৌনকর্মীরা যাতে নির্বিবাদে তাঁর পেশা চালিয়ে যেতে পারে, তারজন্য সুরক্ষাকবচ দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে যেহেতু যথেচ্ছ যৌনসঙ্গম ভয়ংকর যৌনরোগের কারণ, সেহেতু যৌনকর্মে কন্ডোমের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো অজুহাতেই যৌনকর্মীরা কন্ডোম ছাড়া যৌনমিলন করতে পারবে না। করলেই মোটা অঙ্কের জরিমানা বা জেল বা উভয়ই ধার্য হোক। তাহলেই মানুষের প্রতি সুবিচার হয়। তার মানে এই যে, যৌনপেশাকে বৈধ করে দিলে সকলেই দলে দলে গণিকাবৃত্তিতে নাম লেখাবে, এটা ভাবা অমূলক—কষ্টকল্পনা। পৃথিবী এমন কোনো পেশা নেই যেখানে মানুষ দলে দলে নাম লিখিয়েছে। এই পেশাকে বৈধতা দিতে তাঁদেরই আপত্তি, যাঁদের কাছে এই পেশা অবৈধ থাকলেই সুবিধা বেশি বলে মনে করে।
‘Sex Worker’ (যৌনকর্মী) শব্দটি নতুন। এই শব্দটি নির্বাচনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দুনিয়া কর্মের বৈধতা দিল। অর্থাৎ যৌনপেশার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁরা নিজেদেরকে কর্মী’ ভাববে। অর্থাৎ গণিকারাও কর্মীর স্বীকৃতি পেল। গণিকারাও এখন নিজেদেরকে ‘যৌনকর্মী’ বলতেই পছন্দ করে। পতিতা বা গণিকা শব্দের ব্যবহার অল্পবেশি ব্যবহার থাকলেও ‘বেশ্যা’ শব্দটিই আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। আমাদের সমাজে ‘বেশ্যা’ শব্দটি যেমন যৌনকর্মীদের বিশেষিত হলেও সাধারণ মহিলাদের মধ্যেও ‘বেশ্যা’ সম্বোধন করে অপমান করা হয়। অর্থাৎ ‘বেশ্যা’ শব্দটি অপমানসূচক হিসাবেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বেশ্যা’ ও ‘বেশ্যাবৃত্তি’ শব্দের সঙ্গে সামাজিক ঘৃণা যুক্ত হয়েছে। অতএব ‘বেশ্যা’ শব্দটি কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না। যদিও অনেকে বলছেন যৌনকর্মীর বিশেষণের মধ্যে সামাজিক মর্যাদা বা পেশাকে সম্মান দেওয়ার অভিব্যক্তি প্রকাশ পাচ্ছে। আমি অবশ্য তা মনে করি না। এটাও যথেষ্ট অসম্মানজনক বিশেষণ। কারণ বেশ্যা ও যৌনকর্মী শব্দটির মধ্যে মর্যাদাগতভাবে কোনো পার্থক্য নেই। দীর্ঘদিন ধরে ‘বেশ্যা’ শব্দটি ব্যবহারে যেমন অশ্লীল হয়ে গেছে, তেমনি ‘যৌনকর্মী’ শব্দটিও অশ্লীল হবে। দুটো শব্দই সমান ঘৃণার। অবশ্য পৃথিবীতে এরকম অনেক পেশা আছে। যেগুলো ঘৃণার চোখেই দেখা হয় এবং সেই পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষদেরও ঘৃণার চোখেই দেখা হয়। এটা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ। নাম পালটে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করা যাবে না। যাহাই লাউ তাহাই কদু।
তসলিমার সুরে সুর মিলিয়ে বলাই যায়–“নিজেদের যতই শ্রমিক বলে দাবি করুক, সমাজ জানে এঁরা বেশ্যার কাজই করছে। তকমা বদলালেই কি জীবন বদলাবে? মেথরের কাজকে জাতিভেদাশ্রিত সমাজ শ্রদ্ধার চোখে না-দেখলেও সেটা শ্রমিকের কাজ। কিন্তু বেশ্যাবৃত্তির কখনও এরকম ব্যাখ্যা হতে পারে না।” আসলে একটা শ্রেণির নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই ‘যৌনকর্মী’ শব্দটির উদ্ভব। সেটি হল কর্মের অধিকারে আইনি স্বীকৃতি। অর্থাৎ পেশার বৈধতা। বিপন্ন’ যৌনকর্মীদের সুরক্ষিত রাখতেই আইনি বৈধতার প্রয়োজন আছে বইকি। আইনি স্বীকৃতি দিলেই যে সব মহিলারা দলে দলে এই পেশায় অংশগ্রহণ করবেন, এটা যেমন ঠিক ভাবনা নয়–ঠিক তেমনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মহিলারা বুক চিতিয়ে ‘গতর খাঁটিয়ে খাই, শ্রমিকের অধিকার চাই’ বলবে এটাও অনেকে মেনে নিতে পারছে না। যৌনপেশাকে যাঁরা শ্রমের মর্যাদা দিতে নারাজ, তাঁদের বক্তব্য–যে পথেই হোক, যৌনপেশাকে নিয়ে কখনোই আহ্লাদিত হওয়ার নয়। কারণ কোনো অপরাধই আইনগ্রাহ্য হতে পারে না। তাঁরা আরও বলছেন–“খাইতে পারিলে কে চুরি করে বললে কারোর চুরি করার অধিকার জন্মায় না। চৌর্যবৃত্তিও বৈধতা পায় না। তাহলে তো কোনো অপরাধীকেই শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। মানুষ তো পেটের জ্বালা মেটাতেই চুরি ডাকাতি রাহাজানি করে। শখ করে তো কেউ চুরি ডাকাতি রাহাজানি করে না।” চুরি ডাকাতি রাহাজানি আর যৌনপেশা কি এক জিনিস? চুরি ডাকাতি রাহাজানি কবে থেকে পেশা হল? চুরি ডাকাতি রাহাজানি অন্যের কষ্টার্জিত সম্পদ হরণ করে। অন্যের সম্পদ হরণ করা নিশ্চয় বৈধ হতে পারে না। সাধারণত অন্যের ক্ষতি করে এমন কোনো কাজই অপরাধ, বেআইনি। যৌনপেশায় যৌনকর্মীরা তো কারোর কোনো সম্পদ হরণ করে না, কারোর কোনো ক্ষতিসাধনও করে না। যাঁদের ইচ্ছে হবে তাঁদের কাছে যাবে, যাঁদের ইচ্ছে হবে না তাঁরা তাঁদের কাছে যাবে না। যৌনকর্মীরা তো কারোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। বরং আমি সমর্থন করি–এই। পেশার সঙ্গে জড়িত আড়কাঠি, দালাল, মেয়ে পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। এঁদের বিরুদ্ধে এমন আইন তৈরি হোক যে আইনে কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি দেওয়া সম্ভব।
