গণিকাবৃত্তি বৈধতা পেলে কিছু মানুষ তা নিয়ে বৈধ উপায়ে উপার্জনের পথ দেখাবে। কিছু মানুষ গণিকাদের নিয়ে ব্যাবসা খুলে বসবে। গণিকালয়গুলো চলে যাবে ক্ষমতাবান এবং বিত্তশালী কিছু মানুষের হাতে, যাঁরা আসলে মূল ব্যাবসাটা করবে যেখানে পুঁজি থাকবে গণিকারাই। পশ্চিমে গণিকালয়ে যারা ইম্প (যাঁরা যৌন সম্পর্কের জন্য গণিকা সরবরাহ করে থাকে) এবং এখানে মাসি বা পিসি নামে পরিচিত, তাঁরাই মূল ব্যাবসার সুযোগ পাবে। গণিকারা তাঁদের হাতের অদৃশ্য সুতোয় বন্দি থাকবে। বর্তমানে রাজমিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী প্রভৃতি শ্রমিকরাও এরকম সিন্ডিকেটতন্ত্রে আবদ্ধ হয়ে গেছে। কোনো শ্রমিক পেতে হলে সেই সিন্ডিকেটের সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলতে হয়। শ্রমিকদের পারিশ্রমিকের একটা অংশ সুপারভাইজাররাই ভোগ করে। এটা কি আমরা আটকাতে পেয়েছি? না আটকানোর কোনো চেষ্টা করেছি? গণিকাদের ক্ষেত্রে এমন হলে আটকাবো কেন?
বৈধতা প্রদানের ভালো কিছু উদাহরণও আমাদের সামনে আছে। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে নেদারল্যান্ড গণিকাবৃত্তিকে বৈধ পেশার স্বীকৃতি দেয়। এমনকি এই পেশায় উপার্জনের উপর করও আরোপিত হয়। গণিকাবৃত্তি দু-ভাবেই চর্চা হয়—ইচ্ছাকৃত এবং জোরপূর্বকভাবে। ১৯৮০ সালের পর এই দুই চর্চার মাঝে সীমারেখা টানা এবং তা নজরদারি সহজ হয়েছে। ১৯৯৬ সালের দিকে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং ১৯৯৯ থেকে উপার্জনের উপর কর আরোপিত হয়, যা ধীরে ধীরে সমাজের চোখে একটি সাধারণ পেশা হিসাবে গণিকাবৃত্তিকে প্রতষ্ঠিত করতে সাহায্য করে। ভারতের যৌনকর্মীদের সংগঠন জাল নোট সনাক্ত করতে গণিকাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে, যা তাঁদেরকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দেয়। অবৈধতা এরকম সুরক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তত করত বলে আমার মনে হয় না।
২০০০ সালে বাংলাদেশে গণিকাবৃত্তি বৈধতা পায় উচ্চ আদালতের রায়ে। যদিও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী- “State shall endeavor to prevent gambling and prostitution”। ২০০০ সালে গণিকালয় থেকে আটককৃত শতাধিক গণিকার আটকাদেশ নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় ছিল এটি। ভারতেও গণিকাবৃত্তি বৈধ, তবে একটু অন্যভাবে। কারণ ভারতে গণিকাবৃত্তি বৈধ, কিন্তু গণিকালয় নয়। বিবাহ, বধু এবং প্রেমিকার মতো গণিকাও এক বাস্তবতা। অবৈধ করে এটিকে থামানো সম্ভব না। ইউএসএ-এর নেভাদার অবৈধ গণিকাবৃত্তির আকার অন্য প্রদেশের বৈধ গণিকাবৃত্তির চার গুণেরও বেশি বড়ো। বৈধতা এবং অবৈধতা দুটি ধারার সমস্যা নিয়ে আমাদের সামনে আসে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বৈধতা দিয়ে যথাযথ নজরদারির মাধ্যমে এই সম্পৰ্কত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের রাখা সম্ভব এবং এটাই যৌক্তিক উপায়।
জুয়াও বেআইনি। জুয়া খেলতে খেলতে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়, আত্মহত্যাও করে থাকে। সে জুয়া যখন সরকারের স্বীকৃতি পায় সেটা তখন আইনি। তেমনই এক জুয়ার নাম লটারি। এই লটারির টিকিট কেনা ও বেচা কোনোটাই অপরাধ নয়। আছে মোটা অঙ্কের প্রাইজ মানি। এই প্রাইজ মানির লোভে কত মানুষ সর্বস্বান্ত হয় তার কোনো খবর কেউ রাখে না। কিন্তু কেউ এর বাইরে অন্য কোনো জুয়া খেললে তা গ্রেফতারযোগ্য ও দণ্ডনীয় অপরাধ। যেমন সাট্টা ইত্যাদি। পাড়ায় বসে তাস খেলছেন? সেই খেলায় টাকা লেনদেন করছেন? তাহলে তা অবশ্যই গ্রেফতারযোগ্য ও দণ্ডনীয় অপরাধ। ক্রিকেট বা কোনো খেলায় বেটিং করছেন? তাহলে সেটাও গ্রেফতারযোগ্য ও দণ্ডনীয় অপরাধ। আপনি চোলাই মদ বানাচ্ছেন বা বিক্রি করছেন? এটাও গ্রেফতারযোগ্য ও দণ্ডনীয় অপরাধ। তার কারণ আপনি এসব করেন সরকারকে রাজস্ব না দিয়ে। সীমান্তে ‘চোরা কারবার’ গ্রেফতারযোগ্য অপরাধ এবং দণ্ডনীয়। কেন? তাঁরা কি চোরাই পণ্য এ-দেশ ও-দেশ করে? মোটেই না। তাঁরা গাঁটের কড়ি খরচা করে পণ্য কিনে অন্য দেশে বিক্রি করে। তাঁদের অপরাধ হল তাঁরা সরকারকে রফতানি শুল্ক দেয় না, ফাঁকি দেয়। অর্থাৎ যে পেশায় রাজস্ব দেওয়া হয় না, সেই পেশাই অবৈধ। যদি যৌনকর্মীরাও সরকারকে রাজস্ব প্রদান করে, তাহলে যৌনপেশাও বৈধ হয়ে যাবে। যৌনকর্মীদের ট্রেড লাইলেন্স ও রোজগারের বার্ষিক রিটার্ন জমা দিলে পেশাটি বৈধতা পাবে। অর্থাৎ এই পেশায় যাঁরা আসবে তাঁদের সরকার দ্বারা রেজিস্টার্ড হতে হবে। এটা আর পাঁচটা পরিসেবা বা পেশার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিসেবা। আপনার প্রাত্যহিক প্রয়োজনে অর্থের বিনিময়ে বাজার থেকে চাল ডাল কিনে খেতে যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে অর্থের বিনিময়ে যৌনতা কেনাবেচার আপত্তি থাকবে কেন? তাহলে কি বিনামূল্যে শরীর ও যৌনসুখ পেলে সব অপরাধ ঘুচে যাবে? পৃথিবী থেকে বাজারের ধারণা যেদিন বিলুপ্ত হবে সেদিন থেকে আর পাঁচটা পেশার মতো যৌনপেশাও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাজার থাকলেই পণ্য থাকবে, পণ্য থাকলে বাজারও সৃষ্টি হবে।
২১. পুরুষরা কেন যৌনকর্মীদের সাহচর্য চায়
মেয়েরা কেন একাধিক পুরুষসঙ্গ বা পুরুষ যৌনকর্মী কামনা করে, সে বিষয়ে আগের অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এই অধ্যায়ে আলোচনা করব পুরুষরা অধিক নারী সাহচর্য বা যৌনকর্মীদের কেন কাছে যায়। একাধিক নারীসঙ্গ বা একাধিক পুরুষসঙ্গ যাঁরা চায়, তাঁদের বহুগামী বহুগামিনী বলে। তার আগে আমরা জেনে নেব বহুগামিতার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। বহুগামিতা হল মূলত বিবাহ বহির্ভূত যৌন-সম্পর্ক, যা একজন অবিবাহিত ও বিবাহিত উভয়ের পক্ষেই প্রযোজ্য। বিস্তারিতভাবে বললে বহুগামিতা হল পরস্পর সম্মতিক্রমে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে একই জীবনে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার অভ্যাস কিংবা আকাঙ্ক্ষা। বহুগামিতাকে “সম্মতিসূচক, নৈতিক ও দায়বদ্ধ অ-একগামিতা” হিসাবেও বর্ণনা করা হয়। নিজেকে বহুগামী বলে পরিচয়দাতারা বিশ্বাস করে এমন এক মুক্ত সম্পর্কে যেখানে একগামিতার হিংসাপরায়ণতা নেই, আধিপত্যবাদ নেই। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি কোনো ভালোবাসার সম্পর্কের জন্য যৌন এবং প্রেমঘটিত স্বতন্ত্রতার প্রয়োজন নেই। বহু-অংশীদার সম্পর্ক, অ-একগামিতা, অস্বতন্ত্র যৌন এবং প্রেমঘটিত সম্পর্ক বোঝাতে বহুগামিতা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। শব্দটি জড়িত ব্যক্তিদের পছন্দ এবং দর্শন ও নৈতিক মূল্যবোধের উপর। যেমন–ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা, সততা, নিষ্ঠা, সমতা, পরস্পর যোগাযোগ এবং প্রতিশ্রুতি সহ নানাবিধ বিষয় প্রতিফলিত করে। একজন পুরুষ যখন একাধিক নারীকে বিয়ে বা যৌন-সম্পর্ক করে, তা বোঝাতে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘Polygyny’ শব্দটি ব্যবহার করেন। একজন মহিলা যখন একাধিক পুরুষকে বিয়ে বা যৌন-সম্পর্ক করে, তা বোঝাতে সমাজবিজ্ঞানীগণ ‘Polyandry’ শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু বাংলায় দুটো শব্দের জন্য আলাদা প্রতিশব্দ না থাকায় ঢালাওভাবে বহুবিবাহ বা বহুগামী বলে। একদা ভারত সহ সব দেশেই সব ধর্মের মধ্যেই বহুবিবাহ করার রীতি বা অভ্যাস ছিল। বহু বছর হল আইন করে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হলেও বহুগামিতা তো রয়েই গেছে। তাকে তো আইন করে দমন করা সম্ভব নয়।
