হ্যাঁ, যৌনকর্মীদের যতই হেলাফেলা করি না-কেন, যতই অবজ্ঞার চোখে দেখি না কেন, তাঁরা অজান্তেই সমাজের সেফটি ভালভ, যাঁরা যৌন অবদমনের ভয়ংকরতা থেকে সমাজকে মুক্তি দেয়। এটা নিদারুণভাবে উপলব্ধি করতে পারব সেদিন, যেদিন ‘অলৌকিকভাবে গোটা পৃথিবী থেকে যৌনকর্মীরা উধাও হয়ে যাবে। অতএব চোখ বন্ধ করে রাখলে প্রলয় থামানো যাবে না।
আইনজীবীকে অনেকে রক্ষণশীল বলতেই পারেন। তাঁর সঙ্গে কেউ একমত হতেও পারেন, আবার না-ও হতে পারেন। তবে আমি বলব–প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সারা পৃথিবীতে যে বিপুল পরিমাণ নারী বা পুরুষ এই পেশার যুক্ত হয়েছেন বা হতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁরা যেভাবেই হোেক তাঁদের শ্রমই বিক্রি করছেন। একদিনের বা এক মাসের নোটিসে এদের এই পেশা থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একটি বড়ো শহরের সবকটি বড়ো বড়ো শিল্পপ্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে বন্ধ করে দিলে শহরে যেরকম দুর্যোগ বাড়বে, শ্রমিকদের যে করুণ পরিণতি হবে, এটিকেও সেভাবেই দেখতে হবে।
১৮৫৩ সালে তৈরি এক পুলিশ রিপোর্ট কলকাতার তৎকালীন চিফ ম্যাজিস্ট্রেট এলিয়ট গোটা কলকাতা শহরে ৪০৪৯ টি গণিকাদের ঘর আছে বলে স্বীকার করেন, যাতে বাস করত মোট ১২,৪১৯ জন গণিকা বা যৌনকর্মী। অর্থাৎ ঘরপ্রতি যৌনকর্মীর সংখ্যা ছিল ৩ জনেরও বেশি। ১৮৬৭ সালে কলকাতার হেস্থ অফিসার ফেভার টোনার যৌনকর্মীর সংখ্যা ৩০,০০০ জন সনাক্ত করেন। ১৯১১ সালের আদমসুমারিতে উল্লিখিত এ সংখ্যা ১৪,২৭১ জন। ১৯২১ এবং ১৯৩১ সালে আদমসুমারিতে সংখ্যাটি কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ১০,৮১৪ এবং ৭,৯৭০ জনে। কিন্তু ১৯৩২ সালে বেঙ্গল উইমেনস ইউনিয়নের সভানেত্রী দাবি করেন যে, পুলিশের হিসাবে কলকাতার যৌনকর্মীর সংখ্যা ২০,০০০ জন। ১৯৩২ সালের পর অনেক জল গড়িয়ে গেছে গঙ্গা দিয়ে। এর মধ্যে গোটা ভারত উপমহাদেশে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিকের পটভূমি ব্যাপক উলটপালট হয়ে গেছে। গোটা বিশ্বজুড়ে বিশ্বযুদ্ধ সমস্ত মূল্যবোধের খলনলচে বদলে গেছে। এই বাংলায় একের পর এক মন্বন্তর। সবচেয়ে ভয়ানক ছিল পঞ্চাশের (ইংরেজি ১৯৪৩) মন্বন্তর। এই বাংলাতেই না খেতে পেয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছিল ৩০ লক্ষ মানুষ। যাঁরা মরেননি, তাঁরাও আর্থিকভাবে ব্যাপক প্রভাবিত হয়েছিল। অভাবের করাল থাবায় এবং বিশ্বায়নের কুফল হিসাবে দিকে দিকে দরিদ্রতা হু হু করে বেড়েছে, তার তালে তালে বেড়েছে নারী পাচার। অসংখ্য মেয়েরা পেটের জ্বালা নিরসনে যৌনপেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। কলকাতা সহ গোটা রাজ্যে হু হু করে বেড়েছে যৌনকর্মীর সংখ্যা, গজিয়ে উঠছিল অসংখ্য যৌনপল্লি।
দেবাশিস বসুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৩ সালে ‘অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেঙ্খ’ বিভাগের মহামারিতত্ত্ব বিভাগ যে জরিপ চালায়, তাতে কলকাতা ও হাওড়া শহরে মোট ১৯টি যৌনপল্লি চিহ্নিত হয়। প্রতিটি পল্লিতে যদি গড়ে ২০০ করেও ঘর ধরা হয়, তাহলে মোট ঘরের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮০০টি এবং ঘরপ্রতি ৩ জন ধরলে যৌনকর্মীর সংখ্যা হয় ১১,৪০০ জন। ভাসমান যৌনকর্মীর সংখ্যা যদি ৮,৬০০ জন ধরা হয়, তবে এই সংখ্যাটি হবে ২০,০০০ জন। দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির হিসাবটা ঠিক এরকমই। তাঁদের মতে, কলকাতার মোট যৌনকর্মীর মধ্যে পাড়া-নির্ভর ১২,০০০ জন এবং ভাসমান ৮,০০০ জন। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এই সংখ্যায় আবাসিক হোটেল, সাধারণ গৃহকোণ এবং ফ্ল্যাটবাড়িভিত্তিক যৌন পরিসেবাকারীদের চিত্রটি নেই। নেই তাঁদের কথাও, যাঁরা গোপনে আড়ালে-আবডালে যৌনপেশার সঙ্গে যুক্ত, অথচ নিজেকে ‘যৌনকর্মী পরিচয় দেয় না। সে হতে পারে স্কুল-কলেজের ছাত্রী বা সাধারণ গৃহবধূ। এই ভাগে আরও ২০,০০০ জন থাকাও বিচিত্র নয়। এটি ধরা হলে কলকাতা শহরে মোট যৌন পরিসেবাকারীদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৪০,০০০ জন।
তথাকথিত ‘নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনও গণিকাবৃত্তিকে বৈধতা দেওয়ার বিরুদ্ধে। তিনি এক লেখায় বলছেন–“পতিতাপ্রথাকে বৈধ করা মানে নারী নির্যাতনকে বৈধ করা। যে রাষ্ট্রে পতিতাপ্রথা বৈধ সেই রাষ্ট্র সত্যিকার কোনো সভ্যতা বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। গণতন্ত্র মানবাধিকার নিশ্চিত করে, নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করে। কোনো গণতন্ত্র মানুষের উপর নির্যাতনকে ছল-ছুতোয় মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে না। করতে পারে না। যদি করে, সেই গণতন্ত্রের নাম নিতান্তই পুরুষতন্ত্র, আর সেই সভ্যতার নাম বর্বরতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।” তসলিমা নাসরিন একটু মোটা দাগের নারীবাদী। মোটা দাগের বিবৃতি দিতেই বেশি পছন্দ করেন। তাই উনিই বলতে পারেন, “পুরুষরা যেমন খালি গায়ে ঘুরে বেড়ায় নারীরাও তেমনি খালি গায়ে ঘুরে বেড়বে।” যাই হোক তসলিমার বিবৃতি প্রসঙ্গে বলব, প্রতিটি দেশের সংবিধানে প্রতিটি ব্যক্তির পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে। কে কোন্ পেশা স্বাধীনভাবে বেছে নেবে সেটাই গণতন্ত্র। গণতন্ত্রই নিজের পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেয়। কারোকে কোনো পেশায় বাধ্য করানো যায় না। বাধ্য করানোটাই অগণতান্ত্রিক।
তা ছাড়া পৃথিবীতে এমন হাজার হাজার পেশা আছে, যেগুলো মানুষের ইচ্ছা না-থাকলেও করতে বাধ্য হয়। সবার ভাগ্যে পছন্দের পেশাটি করে উঠতে পারে না। আমরা বেশিরভাগই অমলকান্তির মতো, যে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে উল্লেখ করে আর-একটু বলতে চাই–“আমাদের মধ্যে যে এখন মাস্টারি করে,/অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,/যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল, উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।/অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।/অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।” কারণ অমলকান্তি অন্ধকার ছাপাখানায় কাজ করে। এরকম অনেককেই এমন পেশা বেছে নিতে হয়, যা তাঁর পছন্দের নয়, ভালোবাসার নয়, ভালোলাগার নয়। তবুও করতে হয় সারাজীবন। সবার ক্ষেত্রেই যে এমনটা হয়, তেমনটাও নিশ্চয়ই নয়। আবার বিকল্প পেলে পেশা পরিবর্তনও করতে পারে। যৌনপেশাও ঠিক তেমনি।
