ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মন প্রচণ্ডভাবে গতিশীল এবং এই মন’ নামক মানবিক উপাদানটি সহজাত প্রবৃত্তি, তাড়না, বিরোধ, গূঢ়ৈষা, অবদমন ইত্যাদির মতো কিছু ইচ্ছামূলক ক্রিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা আমাদের সমাজব্যবস্থায় অবস্থান করি বিভিন্ন বিরোধ আর বাধাকে গ্রাহ্য করে এবং এর ফলে আমরা কখনোই সম্পূর্ণ। স্বাধীন নই। আমাদের চিন্তারও নেই কোনো স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ। যে কামনা, বাসনা আর যৌন তাড়না একটি মানুষ বিভিন্ন সামাজিক নিয়মকানুনের জন্য তৃপ্ত করতে পারে না, সেই অতৃপ্তি-জাত ইচ্ছেগুলোকেই অবদমিত হয়ে স্থান করে নেয় মানুষের মনের অচেতন স্তরে। এই অচেতন স্তরেই অবদমনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় এক ধরনের বিপরীতমুখী বিরোধ ও বাধার, যা লজ্জা, ভয়, দুঃখ ইত্যাদিসহ বিভিন্ন মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে থাকে। মানুষের যে ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি, যার জন্য সে অতৃপ্ত, সেই অবদমিত অতৃপ্তি ও ইচ্ছাগুলোই অচেতন স্তর থেকে স্বপ্ন হয়ে বেরিয়ে আসে বা বাস্তবে তার প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ে যায়। ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী মনের চেতনও অবচেতন স্তরের সমন্বয়ে তৈরি হয় একজন ব্যক্তিমানুষের অহং। সামাজিক অহং সবসময় বাস্তবতায় নিয়মকানুন মেনে চলে এবং অচেতনে বন্দি কামজ ইচ্ছা বা বাসনাকে সমাজ-বাস্তবতায় আসতে দেয় না। ফ্রয়েডের সংশোধিত মতবাদে অহং আংশিক চেতন ও আংশিক অচেতন রূপকে গ্রাহ্য করা হয়েছে।
ফ্রয়েড কথিত আংশিক চেতন অহংকে আমরা শুধু অহং হিসাবেই চিহ্নিত করব এবং অচেতন অহংকে বলব অদ। অদ সবসময় সুখসূত্র মেনে চলে—জৈবিক সুখ, কামনা, বাসনা ইত্যাদির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন চায় অদ। অদের জৈবিক কামনা, বাসনা ও তাড়না যেহেতু সবসময় সমাজের নিয়মকানুন মানে না, সেহেতু অহং, অদের সব ইচ্ছে পূরণ হতে দেয় না বাস্তবতার সূত্র গ্রাহ্য করে। অদের যে কামনা, বাসনা বা ইচ্ছা সমাজের নৈতিক আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, তা অপূর্ণ থেকেই অবদমিত হয়ে অচেতন মনে জমা হতে থাকে। যে অহং বাস্তবতার সূত্র মানে, তাকে ফ্রয়েড অতি-অহং বা অধিসত্তা হিসাবেও চিহ্নিত করেছেন।
ফ্রয়েড তাঁর মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বে মানুষের যৌন-আকাক্ষা, অবদমন এবং শৈশবকালীন যৌনতার বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের আত্মরক্ষামূলক কাজ হল অহং প্রবৃত্তি। কামপ্রবৃত্তির উপাদান হিসাবে আমরা সব ধরনের প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুপ্রীতি, আদর, সোহাগ ইত্যাদিকে চিহ্নিত করতে পারি। কামপ্রবৃত্তির উপস্থিতি হল একজন মানুষের জৈবিক সংগঠনের মৌলিক উপাদান এবং এর ফলে একটি শিশুর জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আত্মকামী সত্তা হিসাবে যৌন অনুভূতিকেন্দ্রিক কামপ্রবৃত্তির দিকে এগিয়ে যায়। একটি শিশু জন্মের পর নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে স্বাধীন সত্তা হিসাবে গ্রাহ্য করে না, এ অবস্থায় সে হয়ে ওঠে এক আত্মকামী ‘নার্সিসাস’। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি কিশোর যখন তার সমবয়স্ক অন্য কোনো কিশোরের ভালবাসা কামনা করে, তখন মনস্তাত্ত্বিক কারণেই এক ধরনের কামপ্রবৃত্তির সৃষ্টি হয়, যাকে আমরা বলি সমকাম (এরকম যৌনচতনা যদি প্রাপ্তবয়স্ক স্তর পর্যন্ত চেতনায় থাকে তবে তা সমকামী বিষয় হিসাবে গণ্য হয়)। একটি শিশুর সমলিঙ্গ প্রেম সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় এবং একসময় তা নারী-পুরুষকেন্দ্রিক যৌন কামনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। কামপ্রবৃত্তির উপাদান হিসাবে আরও কিছু বিষয় নিয়ে তাত্ত্বিক ধারণা দিয়েছেন ফ্রয়েড, যার মাঝে ইদিপাস এষণা, ইলেক্ট্রা এষণা, মর্ষকাম, ধর্ষকাম, জীবনবৃত্তি এবং মরণপ্রবৃত্তি উল্লেখযোগ্য। একটি পুরুষ শিশু তার আত্মকামকে গ্রাহ্য করে বিপরীত লিঙ্গের মায়ের প্রতি যে যৌন-আকর্ষণ অনুভব করে এবং একই সঙ্গে সমলিঙ্গের পিতাকে ভালোবাসার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে চিহ্নিত করে যে ঈর্ষা ও ঘৃণা দেখায়, তাকে ফ্রয়েড ইদিপাস এষণা হিসাবে চিহ্নিত করেন। ইদিপাস এষণার বিপরীত মনস্তাত্ত্বিক উপাদান হল স্ত্রী-শিশুর পিতার প্রতি যৌন-আকর্ষণ এবং মাকে ঘৃণা ঈর্ষা করা, যাকে ফ্রয়েড বলেন, ইলেক্ট্রা এষণা, মর্ষকাম হচ্ছে ভালোবাসার পাত্র বা পাত্রী দ্বারা নিগৃহীত হয়ে যৌনসুখ নেওয়া, আর ধর্ষকাম হল ভালোবাসার মানুষকে নিপীড়ন করে যৌনতৃপ্তি পাওয়া। ফ্রয়েডের তত্ত্বের একটা বড়ো অংশজুড়ে রয়েছে যৌনতা বা অবদমিত কামনা। ফ্রয়েডের তত্ত্বে যেভাবে অবদমিত কামনা বা লিবিডোের ধারণা এসেছে ঘুরেফিরে, তাতে করে অনেকেই কানে তুলো খুঁজেছিলেন তঙ্কালীন সময়ে। কানাঘুসো করছিলেন–ছিঃ, আমরা কামসর্বস্ব! ফ্রয়েড কিন্তু বলছেন—ঠিক তাই, আর এটাই হল নিদারুণ বাস্তব। এমনকি মানবশিশুর বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে ধাপেধাপে ভেঙে তিনি দেখিয়েছেন, সেখানেও কেমনভাবে যৌনতার ভূমিকা আছে।
বিশ্বের যে-কোনো সাহিত্যে আমরা যৌন অবদমনের প্রসঙ্গ পেয়েছি। দুনিয়া কাঁপানো লেখা লিখছেন সাদাত হোসেন মান্টোর মতো লেখকরা। এমনকি বাংলা সাহিত্যেও পেয়েছি। শুরু হয়েছে রবীন্দ্র-পরবর্তী প্রথা-ভাঙা সাহিত্যচর্চা। সাহিত্যে তখন উত্তাল কল্লোল যুগ। বুদ্ধদেব বসুর কলমে তখন বজ্রনিঘোষ। সময়ের ডাকে বাংলা সাহিত্যে হু-হু ঢুকে পড়ছে যৌনতা। আর ঠিক এই সময়ে দেখা যাচ্ছে, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দাসাহিত্যেও ফ্রয়েডের ‘অবদমিত কামনা’ চলে আসছে। অবদমিত যৌনতা সাহিত্যেও এড়ানো যায়নি। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছুরি’ বলে একটা গল্পের বিষয় হল—এক যুবক একটি বন্ধকি কারবারের দোকান চালায়। যুদ্ধের বাজারে গোরা সৈনিকরা জিনিসপত্র বাঁধা দিয়ে টাকা ধার নেয় সেখান থেকে। এমনই একজন লোক একদিন একটা ছুরি বাঁধা দিতে আসে সেই যুবকের দোকানে। ছুরিটা খুব সামলে রাখতে বলা হল। এদিকে বাড়িতে তাঁর রুগ্ন বিগতযৌবনা স্ত্রী। তাই সে অর্থে যুবকের যৌনজীবন বলে কিছুই নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, তার জন্য আক্ষেপও নেই তাঁর সচেতন মনে। কিন্তু ছুরিটা হাতে পাওয়ার পর থেকেই সব যেন কেমন ওলটপালট হয়ে গেল। ওই ছুরি যেন যুবকের অবদমিত কামনার প্রতীক হয়ে দাঁড়াল। সে প্রথমে ওই ছুরিটা তাঁর দোকানের নরম গদির উপর বিধিয়ে দিল। সে কী অপার্থিব অনুভূতি! তারপর একদিন মাঝরাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তার এক কুকুরকে ওই ছুরি চালিয়ে মারল। তারপর সেদিন এসে গেল, ওই ছুরিটা চালিয়ে দিল তাঁর স্ত্রীর শরীরে। শরীর এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দিল যুবকটি। একবার নয়, বারবার বিধিয়ে দিয়ে যেন এক অপার্থিব সুখ পেল। বলাই বাহুল্য, বন্ধকি কারবারি ওই যুবক যে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে যৌনভাবে অতৃপ্ত ছিল, তা কিন্তু সরাসরি কোথাও বলা হয়নি গল্পে। শুধু তাঁর হালকা আভাস দিয়েছিলেন লেখক। ওই ছুরিটা হল যুবকের অবদমিত যৌনতার প্রতীকমাত্র। ওটা হাতে পেয়েই যুবকের অবদমিত কামনা জেগে উঠেছিল। আর ওই ছুরি সে নরম গদি থেকে শুরু নরম শরীরে বিধিয়ে বিঁধিয়ে নিজের সাপ্রেসড সেক্সকে পরিপূর্ণ করল। ছুরি যেন লিঙ্গের প্রতীক হয়ে গেল।
