(২) সমাজের প্রতি একজন শ্রমিকের দায়বদ্ধতা, একজন যৌনকর্মীরও কি সেই সমান দায়বদ্ধতা আছে? শ্রমিকের সামাজিক দায়বদ্ধতা? একজন শ্রমিক কি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শ্রম দান করে নাকি? মোটেই না। একজন শ্রমিক তাঁর, তাঁর পরিবার এবং নিয়োগকর্তার কাছে দায়বদ্ধ। তা ছাড়া সে আর কারোর কাছে তাঁরা দায়বদ্ধ নয়। একজন যৌনকর্মীও কোনোরূপ সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকতে পারে না। একজন যৌনকর্মী আর পাঁচজন শ্রমিকের মতো তাঁর ও পরিবারের কাছে দায়বদ্ধ। অতিরিক্ত যে কাজটি একজন যৌনকর্মী তাঁর অজান্তেই করে ফেলে, তা হল মানুষের যৌন অবদমন থেকে সমাজকে মুক্তি দেয়। এটা সামাজিক দায় বইকি। প্রতি সুস্থ মানুষের যৌন তাড়না (লিবিডো) থাকবেই। সেই যৌন তাড়না থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নেবে প্রতিটি সুস্থ মানুষ। এটা তাঁর মৌলিক চাহিদা ও অধিকার। আর যদি মুক্তির পথ খুঁজে না-পায়, তখন তা জোর করে অবদমন করতে হয়। এই যৌন অবদমনের ফলে মানুষ বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক বিকাশে বাধাপ্রাপ্ত হয়। যে ব্যক্তি সারাজীবন যৌনতার সুযোগ পায় না, সে অপরিণতমনস্ক হয়। অকারণে ক্রোধী হয়। জীবনে অবসাদ নেমে আসে। সেই অবসাদ থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। যৌন অবদমন মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
যৌন তাড়না বা যৌন প্রবৃত্তি হল এমন চাহিদা যা সবাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। যৌন তাড়না কোনো ব্যক্তির সার্বিক যৌন প্রবৃত্তি বা যৌনকামনা। যৌন প্রবৃত্তি জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক বিষয় কর্তৃক প্রভাবিত হয়। জৈবিকভাবে, যৌন হরমোনসমূহ ও সহযোগী নিউরোট্রান্সমিটারসমূহ যেগুলো নিউক্লিয়াস অ্যাকিউম্বেন্সের উপর ক্রিয়া করে (প্রাথমিকভাবে টেস্টোস্টেরন ও ডোপামিন), এগুলো মানবদেহে যৌন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে। কাজ ও পরিবারের মতো সামাজিক বিষয় এবং ব্যক্তিত্ব ও মনোদৈহিক চাপের মতো অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক উপাদান বা বিষয়গুলোও যৌন প্রবৃত্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি শারীরিক অবস্থা, ওষুধপত্র, জীবনযাপন-প্রণালী, সম্পর্কের বিষয়াবলি ও বয়স (যেমন বয়ঃসন্ধি) দ্বারাও যৌন প্রবৃত্তি প্রভাবিত হতে পারে। কোনো ব্যক্তির যদি চরমভাবে বারংবার বা হঠাৎ করে যৌন তাড়না বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা থাকে তবে তাঁর হাইপারসেক্সয়ালিটি হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে, আর এর বিপরীত অবস্থাকে বলা হয় হাইপোসেজুয়ালিটি।
কোনো ব্যক্তির হয়তো যৌন আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের কোনো সুযোগ নেই, অথবা ব্যক্তিগত, নৈতিক বা ধর্মীয় কারণে সে উক্ত চাহিদা অনুযায়ী আচরণ করা থেকে বিরত থাকে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে, কোনো ব্যক্তির চাহিদাকে অবদমন সসম্মানে গ্রহণ করা হতে পারে। অপরদিকে, কোনো প্রকৃত বাসনা ছাড়াও কোনো একজন ব্যক্তি যৌনাচরণে অংশ নিতে পারে। বিভিন্ন উপাদান মানব যৌন প্রবৃত্তিকে প্রভাবিত করতে পারে, যেমন শারীরিক ও মানসিক চাপ, অসুস্থতা ইত্যাদি। মানব সমাজে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরিতে ও তা বজায় রাখতে যৌন আকাঙ্ক্ষাসমূহ প্রায়শই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে কাজ করে। যৌন আকাঙ্ক্ষার অভাব বা শূন্যতা উক্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো যৌন-সম্পর্কে যে কোনো সঙ্গীর যৌন আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন যদি বহাল থাকে বা সমাধান না-করা হয়, তবে তা সম্পর্কে সমস্যা তৈরি করতে পারে। কোনো সঙ্গীর অবিশ্বস্ততা এই ইঙ্গিতের আভাস বহন করতে পারে যে, কোনো সঙ্গীর পরিবর্তনশীল/পরিবর্তিত যৌন আকাঙ্ক্ষাবর্তমান সম্পর্কের মাধ্যমে আর তৃপ্ত হতে পারবে না। সঙ্গীদের মধ্যে যৌন আকাঙ্ক্ষার অসমতা বা যৌন আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন ও যৌনতাপ্রিয় সঙ্গীদের মাঝে নগণ্য যোগাযোগের ফলে সমস্যার উত্থান হতে পারে।
যৌন অবদমন থেকে যৌন বিকৃতি চরম মাত্রা পায়। মূলত যৌনতার মতো মানুষের শক্তিশালী জৈবিক প্রবৃত্তির মাত্রাতিরিক্ত দমনের ফলে তা বিকৃত যৌনাচারের দিকে যায়। ধর্ষণের মতো সামাজিক অপরাধ ঘটার এবং উত্তরোত্তর এর বিপজ্জনক প্রাদুর্ভাবের পিছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে। লৈঙ্গিক বৈষম্য, ক্ষমতা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারহীনতা, নারীর দুর্বল সামাজিক অবস্থান, নৈতিক অবক্ষয়, প্রজন্মের পর্নাসক্তি ইত্যাদি। কিন্তু এইসব কারণগুলোকে নেতৃত্ব দেয় অস্বাভাবিক যৌন অবদমন। মাত্রাতিরিক্ত যৌন অবদমন মানুষের অবচেতনে স্তরে স্তরে জমা হয়ে এক ধরনের বিকৃত মনস্তত্ব তৈরি করে। মানুষের মাঝে যৌন হিংসা এবং ধর্ষকামী মনোভাব আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। স্বাভাবিক যৌনতা থেকে বঞ্চিত হয়ে সমাজের সদস্যরা অবচেতনে ধর্ষকামী মনোভাব লালন করে থাকে। এমন না যে, প্রত্যেক অসচেতন ধর্ষকামীই পরবর্তীতে ধর্ষণ করে। বরং এর একটা বড়ো অংশ স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপন করে যায় তাঁর ধর্ষকামী মনোভাবকে মনের অবচেতনে জমা রেখেও। মনের মধ্য ধর্ষকাম পোষণ করা মানুষেরাই পরবর্তীতে নৈতিক পুলিশের ভূমিকা পালন করে। সমাজের কোনো সদস্যের যে-কোনো রকমের চরিত্র বিচ্যুতির ঘটনায় এঁরা উৎফুল্ল হয়ে উক্ত ঘটনার রসালো আলাপ বাজারে চালু রাখে এবং এভাবেই তাঁদের ধর্ষকামকে তাঁরা প্রশমিত করতে চায়।
