১৯১৯ সালে শ্রমিক অধিকার রক্ষার জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা পরবর্তীতে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ নিজেই তাঁদের মানবাধিকার সনদের ২টি আর্টিকেলে শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে সমর্থন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার (নিবন্ধ ৬-৮) চুক্তিতে বলা হয়েছে–(১) প্রত্যেকেরই কাজ করার, স্বাধীনভাবে কর্মসংস্থান পদ্ধতি বাছাই করে নেওয়ার, পছন্দের কাজের ক্ষেত্রে ন্যায্য ও অনুকূল শর্ত এবং বেকারত্ব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার অধিকার আছে। (২) প্রত্যেকেরই কোনোরূপ বৈষম্য ছাড়া সমান কাজের জন্য সমান বেতন পাওয়ার অধিকার রয়েছে। (৩) যারা কাজ করে তাদের প্রত্যেকেরই ন্যায্য ও অনুকূল পারিশ্রমিক পাবার এবং তাদের পরিবারের সকল সদস্যদের সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। (৪) সবারই তাঁদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য ট্রেড ইউনিয়নে যোগদানের অধিকার আছে।
শ্রমের অধিকার ও শ্রমিকের মর্যাদা আদায়ের লড়াই নতুন কিছু নয়। শ্রমিকদের প্রতি শোষণ ও বঞ্চনা তো অনস্বীকার্য। শ্রমিকদের দিয়ে উদয়াস্ত খাঁটিয়ে নেওয়ার অভ্যাস ছিল মালিকদের। শ্রমিকরা ছিল পশুর মতো। যথাযথ পারিশ্রমিক পর্যন্ত দেওয়া হত না। শ্রমিক যেন ক্রীতদাস। শ্রমিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করল। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবিতে শ্রমিকরা জমায়েত হয়েছিল। তাঁদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। এরপর ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষ্যে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজন করতে সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে “শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না-খাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে মাসের ১ তারিখে ‘বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না-করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। হে মার্কেটের হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পয়লা মে তারিখে যে-কোনো আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
অতএব শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের লড়াই সেদিনও করতে হয়েছিল, আজও করতে হয়। আজ না হয় কাল, গণিকারা শ্রমিকের মর্যাদা পাবেই। কোনো জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতাই এটা আটকাতে পারবে না। শ্রমদান কে শুয়ে করবে কে বসে করবে, সেটা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য সেটাই হবে কোনো ব্যক্তি সত্যিই শ্রমদান করছে কি না। অনেকের মনে হতে পারে, সেক্স করাটা একটা আরামের বিষয়, সুখের বিষয়। শ্ৰম কীসের? এটা সাধারণ যৌন-সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও পেশাদার যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। প্রতিদিন অসংখ্য ক্লায়েন্টের সঙ্গে যৌনসঙ্গম নিশ্চয় আরামের হতে পারে না। কোনো ছুটি নেই। কোনো ডিউটি আওয়ারস নেই। ২৪ X ৭ X ৩৬৫ দিন একটানা যৌনসঙ্গমে কতটা যৌনসুখ পাওয়া যায়? শরীরটা তখন শরীরের সেই বিরল সুখ দিতে পারে না, যন্ত্র হয়ে যাওয়া শরীর তখন যন্ত্রের যন্ত্রণা দেয় এবং তা হাসিমুখে হজম করতে হয়।
যৌনপল্লিতে কোনো পুরুষই পয়সা খরচা করে কোনো যৌনকর্মীকেই যৌনসুখ দিতে আসে না, যৌনসুখ বুঝে নিতে আসে। তাই যৌনকর্মীদেরও সর্বদা শরীর-মন সুস্থ-সবল-চাঙা রাখতে হয়। ইচ্ছা-অনিচ্ছার স্বাধীনতা সব যৌনকর্মীর থাকে না, বিশেষ করে যখন বাড়িওয়ালি কিনে কোনো মেয়েকে যৌনপেশায় নিযুক্ত করেছে। সে সব মেয়েরা একপ্রকার ক্রীতদাসীই। এইসব মেয়েদেরকে দিনে প্রচুর খরিদ্দারদের সঙ্গে শুতে হয় রোজগার বাড়ানোর জন্যে। তা না-হলে বাড়িওয়ালির ভাগের পয়সা মেটানো যাবে না। ফলে খরিদ্দারের সঙ্গে দ্রুত কাজ সেরে, পরের খরিদ্দারের সঙ্গে শোওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। এইভাবে প্রতিদিন চলে। এঁদের শরীর বলতে একটি ফুটো’ ছাড়া আর কিছু নয়। শীঘ্রপতনের খরিদ্দার পেয়ে গেলে একটু রেহাই পায় বইকি। অনেক খরিদ্দার মনে করেন দীর্ঘক্ষণ সঙ্গম করলে বোধহয় পৌরুষত্ব দেখানো যায়। সেক্ষেত্রে এইসব যৌনকর্মীরা সময় হয়ে গেলে ঘর থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেয় কাস্টমারকে। তবে অবসন্ন ও দুর্বল শরীর দিক বা না দিক, বাবু’ এলে ‘বসতেই হবে। একটু দরিদ্র শীর্ণকায় যৌনকর্মীদের কখনো-সখনো শরীরের জেল্লা বাড়াতে গর্ভধারণও করতে হয়। গর্ভধারণ করলে বুক-দুটো ভারী হয়ে ওঠে, শরীরটাও গোলপানা হয়। পোয়াতি মেয়ের ভরা বুক ভরা শরীর অনেক খরিদ্দারকে তাতিয়ে দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু সন্তান যতক্ষণ ধারণ করা সম্ভব ততক্ষণ ধারণ করে। তারপর গর্ভপাত। পেট খসাতে’ হাতুড়ে ডাকতে হয়। অনেকক্ষেত্রে ব্যাপারটা খুব বিপজ্জনক হয়ে যায়। জীবন সংকটে পড়ে যায়।
