তবে ‘যৌনকর্মী’ শব্দটি ইউনিসেক্স। কারণ শুধু নারীরাই যৌনকর্ম করে না, পুরুষরাও করছে। পুরুষদের গণিকা, পতিতা, বেশ্যা বলা যায় না। কারণ এই শব্দগুলো স্ত্রীবাচক বিশেষণ। অতএব ‘যৌনকর্মী একটি যথার্থ বিশেষণ। সমস্ত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়। এই মুহূর্তে যাঁদের যৌনকর্মী বলা হচ্ছে, তাঁদের আজও বলা হয়, বেশ্যা, পতিতা, গণিকা, বারাঙ্গনা ইত্যাদি। এই শব্দগুলির সবকটাই স্ত্রীলিঙ্গবাচক। কেবল নারীরাই এই পেশা করে, এটাই বোঝাত। কিন্তু এখন সময় বলেছে। এখন কেবল নারীরাই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে না। যুক্ত হচ্ছে। পুরুষরাও। পুরুষ যৌনকর্মীদের জন্য কোনো শব্দ সৃষ্টি হয়নি। সেক্ষেত্রে যৌনকর্মী’ শব্দটি নারী ও পুরুষ উভয় শ্রেণির যৌনপেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বোঝায়। সম্বিত একজন বেশ্যা বা পতিতা, ব্যাকরণগতভাবে ভুল। সম্বিত একজন যৌনকর্মী, ব্যাকরণগতভাবে সঠিক। তেমনি সুপ্রিয়া একজন যৌনকর্মী, এ কথা বললে একজন নারীই যৌনকর্মী বলে চিহ্নিত করা হয় না। যৌনকর্মী নারী ও পুরুষ উভয়ই। কোনো লিঙ্গের সমস্যা নেই। তবে সাইড এফেক্ট হিসাবে যেটা পাওয়া গেল, তা হল ‘যৌন’। অর্থাৎ পেশায় কর্ম কী, যোনি বা যৌনাঙ্গের ব্যবহার। অর্থাৎ যিনি যৌনাঙ্গের ব্যবহার করে, তিনিই যৌনকর্মী। নামচিহ্নে প্রকট হয়ে উঠল পেশার ধরন। দেহ নয়, কেবলই যৌনাঙ্গ। শরীর নয়, শরীরের একটা অংশ। কিন্তু বাস্তবিক পুরোপুরি তো তা নয়। একজন যৌনকর্মীর কাছে সকলেই যৌনকর্ম (Intercourse) করতে আসে না। সময় কাটাতেও অনেকে আসেন। বহু এমন কর্মী আছে যাঁরা পুরুষদের কাছ থেকে অর্থ নেয় শুধু শরীর মর্দন করেই। আবার অনেক মহিলা আছেন পুরুষ যৌনকর্মীদের অর্থ দেয় শুধুমাত্র শরীর মর্দন করিয়ে, অন্যান্য সঙ্গদানের বিনিময়ে। সবসময়ই যে যৌনকর্মের বিনিময়ে অর্থ আদানপ্রদান হয়, তা তো নয়।
এখন প্রশ্ন হল, যৌনকর্ম কি কোনো কর্ম? আমি বলি অবশ্যই কর্ম। আমরা সবাই শরীরের কোনো না-কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ব্যবহার করে কাজ করি। কেউ হাত, কেউ পা, কেউ চোখ, কেউ মুখ, কেউ কান দিয়ে কাজ করি। যৌনকর্মীরা যৌনাঙ্গ সহ গোটা শরীরকে লাগিয়ে কাজ করে। কাজটা ‘সেক্স করা’ বলে সেটা কর্ম নয়? এ কেমন কথা! সেক্স একটি স্বাভাবিক কর্ম। যৌনকর্মীরাও তো সেক্সই করে। পার্থক্য একটাই, বিবাহ বহির্ভূত সেক্স। যৌনকর্মীদের যৌনকর্ম উচ্ছেদ করলেই কি বিবাহ বহির্ভূত যৌনকর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে? কখনোই নয়। এরপর যৌনকর্ম করে অর্থোপার্জনের প্রসঙ্গ। বিবাহ সম্পর্কিত যৌনকর্ম বিনা খরচায় হয়? হয় না। অনেকে মনে করেন, গণিকাবৃত্তিকে ‘কর্ম’ বললে তা আসলে গণিকাবৃত্তিকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। হ্যাঁ, হয়। অবশ্যই হয়। তাতে আপত্তি কীসের? হাজার হাজার বছর ধরে সারাবিশ্বে কর্মের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি বলে কি যৌনপেশা বিলুপ্ত হয়ে গেছে! হয়নি, উল্টে বৃদ্ধি পেয়েছে, পাচ্ছে। এই পেশাকে বৈধতা দিন বা অবৈধ বলুন, পেশা কিন্তু চলবেই। বরং আরও আধুনিকীকরণ হবে এবং হচ্ছে।
যৌনকর্মীরা কি শ্রমিক? এমন প্রশ্নে উচ্চ আদালতের আইনজীবী অশোক কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এক বিবৃতিতে বলেছেন–“চরম দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে যে সমস্ত মেয়েগুলোকে ধরে এনে দেহব্যাবসা করানো হচ্ছে, তাঁদের পুনর্বাসন না-করে ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে আরও জাঁকিয়ে ব্যাবসা করার দাবি জানানো হচ্ছে। এর থেকে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? যৌনকর্মীরা চাইছে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, ভাবা যায়! আরে বাবা, ব্যাবসা হল সাধারণত দু-রকম। এক, সুস্থ ও আইনি ব্যাবসা। দুই, অসুস্থ ও বেআইনি ব্যাবসা। এখন যে ব্যাবসাটা আপদমস্তক অসুস্থ ও বেআইনি, তার আবার ট্রেড ইউনিয়ন কীসের, আমার মাথায় তো কিস্যু ঢুকছে না। আর এই দাবির পিছনে যুক্তিটা কী, না আইনের অধিকার পেলে যৌনকর্মীদের ব্যাবসা করতে আরও সুবিধা হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই ব্যাবসা চালাতে আজও কি আইন তাঁদের স্বীকৃতি দিয়েছে? দেয়নি। সুতরাং যে পেশা বা ব্যাবসার কোনো আইনি ভিত্তিই নেই, সে ব্যাবসার আবার পরবর্তী সুযোগসুবিধা নিয়ে ভেবে লাভ কী? আজ যৌনকর্মীরা তাঁদের শ্রমিক বলে দাবি করছে। তাঁদের গতর খাটানোর সঙ্গে শ্রমিকের গতর খাটানোর তুলনা করছে। খুব নিষ্ঠুর অর্থে তাঁদের এবং শ্রমিকের গতর খাটানোর এই তুলনাটা মেনে নিলেও জানতে ইচ্ছে করে একজন যৌনকর্মীর পক্ষে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কি একজন শ্রমিকের মতো উৎপাদন করা সম্ভব? সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, সমাজের প্রতি একজন শ্রমিকের দায়বদ্ধতা, একজন যৌনকর্মীরও কি সেই সমান দায়বদ্ধতা আছে! নিশ্চয় নয়। যদিও তাঁদের বক্তব্য, যৌনকর্মী না-থাকলে আজ ঘরে ঘরে এই ব্যাবসা হত, যে ব্যাবসা বন্ধ করেই নাকি সোনাগাছি, প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট, কালীঘাটের মতো যৌনপল্লির প্রয়োজন। এটা একেবারেই অযৌক্তিক কথা। যেমন অযৌক্তিক তাঁদের দাবি। আরে বাবা, আইনের স্বীকৃতি পেলেই কি মানুষের মানসিকতা, সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ পালটে যাবে?” (টপ কোয়ার্ক, ডিসেম্বর ২০০৪, ৭০ পৃষ্ঠা)
অশোকবাবুর জন্য আমার একটাই প্রশ্ন–অন্ধ হয়ে থাকলে কি প্রলয় থাকে? আইনজীবী অশোকবাবুর সঙ্গে আমার কয়েকটা পয়েন্টে দ্বিমত আছে। অশোকবাবু প্রশ্ন করেছেন—(১) একজন যৌনকর্মীর পক্ষে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কি একজন শ্রমিকের মতো উৎপাদন করা সম্ভব? অশোকবাবু, শ্রমিক মাত্রই কি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত? তাহলে যাঁরা উৎপাদন করে না তাঁরা শ্রমিক নন? যাঁরা পরিসেবা দেন তাঁরা শ্রমিক নন? শ্রম দান করেন যিনি তিনিই তো শ্রমিক। তাই না? শ্রম দান করে যে রোজগার করে, তাঁর রোজগারকেই তো পারিশ্রমিক বলে। সেই শ্রমদান শুয়ে শুয়ে, বসে বসে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, দৌড়ে দৌড়ে যে-কোনোভাবেই হতে পারে। বড়ো মুখ করে আজ যাঁদের শ্রমিক বলি, তাঁদেরও একদা শ্রমিক ও শ্রমের মর্যাদা দিতে চায়নি রাষ্ট্রগুলো। তখনও আপনাদের মতো মানুষেরাই শ্রমিকের দাবির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অনেক রক্তের বিনিময়ে আজ তাঁরা শ্রমিকের মর্যাদা পেয়েছেন। সেও তো প্রায় ১৩৫ বছর হয়ে গেল। এককথায় বলতে গেলে যিনি শ্রম দেন তিনিই শ্রমিক, তবে আইনের ভাষায় হওয়া উচিৎ—যিনি মজুরি বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রম দেন তিনিই শ্রমিক। শ্রমিকের সংজ্ঞা হবে–শ্রমের বিনিময়ে যিনি মজুরি গ্রহণ করেন তিনিই শ্রমিক অথবা মজুরির বিনিময়ে যিনি শ্রম দেন তিনিই শ্রমিক। মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে কৃষকরা তাঁদের মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ার জন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। এই বিদ্রোহের অন্যতম নেতা জন বল তার এক বিখ্যাত বক্তৃতায় বলেন, “জন্মের সময় সব মানুষই সমান। যখন আদম ও হাওয়া পৃথিবীতে এসেছিল, তখন কি তারা ভদ্রলোক ছিল?” শ্রমিকরা প্রায়ই তাঁদের পূর্বতন অধিকারের জন্য আপিল করত। উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজ কৃষকরা যখন আন্দোলন শুরু করে, তখন তাঁদের বেশিরভাগ আন্দোলনই ছিল ঐতিহ্যগতভাবে পাওয়া সাম্প্রদায়িক জমিগুলো নিয়ে। ইংল্যান্ডে ১৮৩৩ সালে একটি আইন পাস করেছিল। যেখানে বলা ছিল যে, ৯ বছরের কম বয়সি কোনো শিশু কাজ করতে পারবে না, শিশুদের বয়স ৯-১৩ এর মধ্যে হলে দৈনিক মাত্র ৮ ঘণ্টা এবং বয়স ১৪-১৮ এর মধ্যে হলে দৈনিক মাত্র ১২ ঘণ্টা কাজ করতে পারবে।
