যৌনপল্লির মেয়েদের যৌনজীবন ঠিক কেমন? গড়পড়তা একজন যৌনকর্মীকে প্রতিদিন কমপক্ষে চারবার যৌন-সম্পর্ক করতেই হয়। দিনের বা রাতের খরিদ্দারটির জন্য যখন সে ‘বসছে’, তখন সে অবসন্ন, ক্লান্ত। সপ্তাহে সাতদিন, মাসে তিরিশ দিনে, বছরে তিনশো পঁয়ছট্টি দিন নিরন্তর যৌবন বিক্রি করতে হয় যৌনকর্মীদের। ইচ্ছা হলে কাজ করব, না-ইচ্ছা হলে কাজ করব না–এমন চিন্তা মাথাতেই আনতে পারবে না। যৌনপল্লির এইসব স্থায়ী বাসিন্দারা। এঁদের একপ্রকার যৌনদাসীই বলা যায়। এঁরা শ্রমিক, যেমন কলকারখানায় কায়িক শ্রমের বিনিময়ে অর্থোপার্জন করে। ভালো না-লাগলেও একঘেয়ে লাগলেও শ্রম দিয়ে যেতে হয়। কারণ এই শ্রমটা না-দিলে সেই যৌনকর্মীর মুখে ভাত উঠবে না। বসিয়ে বসিয়ে কে কাকে খাওয়ায় এ পৃথিবীতে!
বিচ্ছিন্ন প্রবাসী শ্রমিকদের বস্তির মধ্যে গণিকাপল্লি এখনও জাঁকিয়ে বসতে পারেনি, যেখানে কলকাতার মেয়েরা ওভারটাইম খাটে। গণিকাদের কাজ হল যথাযথ অর্থের বিনিময়ে পুরুষদের যৌনসুখ দিতে হয়। শুধুই কি যৌনসুখ? একজন পুরুষ যখন মূল্য দিয়ে একতাল নারীমাংস ভাড়ায় নেয়, তখন সে মনে করে সব কিনে নিয়েছে। তখন যৌনসুখ যৌনকর্মীদের মাথায় উঠে যায়। ক্রেতাপুরুষটি মনে করে মূল্য যখন সে দিয়েছে, তখন সে যা খুশি করতে পারে। সে যেমন সঙ্গম করতে পারে, তেমনি যৌন-বিকৃতি চরিতার্থ করতে পারে, যৌনকর্মীকে প্রহার করতে পারে, ধর্ষকাম মেটাতে পারে, যৌনকর্মীর যৌনাঙ্গে জ্বলন্ত সিগারেট ঠুসে দিতে পারে।
শুধু কলকাতার সোনাগাছিই নয়। সোনাগাছি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি প্রসিদ্ধ যৌনপল্লি আছে কলকাতাতে। যেমন হাড়কাটা গলি, বউবাজার, খিদিরপুর আরও অনেক। কলকাতা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতে অসংখ্য গণিকাপল্লি আছে। জেলার হোটেল ও রিসোর্টগুলিতেও যৌনকর্মীদের রমরমা ব্যাবসা চলে।
২০. উত্তরণ: বেশ্যা থেকে যৌনকর্মী
গণিকাপল্লির স্থায়ী বাসিন্দা গণিকাদের ‘যৌনকর্মী’ বা ‘বেশ্যা’ যাই বলা হোক না-কেন, তাঁদের ‘যৌন-ক্রীতদাসী’ বলাটাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত। সিটি কলেজের অধ্যাপক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেছেন–”যাঁদের দেহ বেঁচে খেতে হয়, তাঁদের ‘যৌনকর্মী’ বলে এই কুপ্রথাটিকে এক ধরনের অনুমোদন (স্যাংশান) দেওয়ায় আমার প্রবল আপত্তি আছে। পদ্মলোচন নাম দিলে অন্ধের দৃষ্টি ফেরে না। দেহব্যাবসা শ্রেণিসমাজের বহু কলঙ্কের একটি শ্রেণিপূর্ব সমাজে এমন কোনো কুৎসিত পেশা ছিল না। জীবনধারণের কোনো উপায় না থাকলে তবেই মেয়েদের এই পথ বেছে নিতে হয়–তার কারণ বেছে নেওয়ার মতো আর কোনো বিকল্প তাঁদের থাকে না। এই পেশা বন্ধ করাই হবে শ্রেণিহীন সমাজের দিকে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কাজ। ‘যৌনকর্মী’ নাম দিয়ে, ট্রেড লাইসেন্স চালু করে যাঁরা এই পেশাটাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তাঁরা আসলে শ্রেণিসমাজেরই পক্ষে : আরও বহুরকম শোষণের মতো এই শোষণেও তাঁদের কোনো আপত্তি নেই।” (টপ কোয়ার্ক, ডিসেম্বর, ২০০৪, ৬৯ পৃষ্ঠা)।
রামকৃষ্ণবাবুর সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই হাজার হাজার বছর ধরে যৌনপেশা চলে আসছে। ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করেও নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। ‘অবৈধ’ পেশা দেগে দিয়েও হাজার হাজার বছর ধরে যৌনপেশা চলে আসছে। সারাবিশ্বে রমরমিয়ে যৌনপেশা চলছে নানা বৈচিত্র্যে। পৃথিবীতে এমন কোনো পেশা নেই, যা রাষ্ট্রের কঠোর হস্তক্ষেপে বিলুপ্ত হয়েছে। বিলুপ্ত করতে পারেনি। কারণ চাহিদা থাকলে জোগান থাকবেই। চাহিদা নির্মূল করা কি সম্ভব? আগে চাহিদা নিমূল করুন, তখন দেখবেন স্বাভাবিক নিয়মেই জোগান বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও এটা একটা অবাস্তব চিন্তা। যৌন-চাহিদা এমন এক চাহিদা, যা একটি মৌলিক চাহিদা। আমরা নানাভাবে সেই চাহিদা মেটাই। কেউ বিয়ে করে মেটায়, কেউ যৌনকর্মীর কাছে গিয়ে মেটায়, কেউ পরকীয়ায় মেটায় দুপুর ঠাকুরপো’ হয়ে, কেউ হস্তমৈথুনে মেটায়। আর যে এসব কিছুই করে উঠতে পারে না, সে যৌন-অবদমনে ডুকরে মরে।
শরীর বিক্রির পেশাকে ‘যৌনকর্ম বা পেশায় যুক্ত মেয়েদের যৌনকর্মী’ হিসাবে চিহ্নিত করা বড়ড়াই বিভ্রান্তিকর। কারণ যৌনকর্ম বলার মধ্যে দিয়ে গণিকাবৃত্তিকে কর্ম বা পেশার অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। মূলত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে এ ধরনের যৌনাচারের সিস্টেমকে বিশাল পুঁজি বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে যৌনশিল্প বা সেক্স ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করেছে। পৃথিবীর এই সেক্স ইন্ডাস্ট্রিগুলি নারীমাংসের বেচাকেনা করে বিলিয়ান বিলিয়ন ডলার ঘরে তোলে। অর্থগৃধু আর লালসায় নারীও স্বয়ং এবং স্বেচ্ছায় শরীর-ব্যাবসায় নেমে পড়েছে চড়া দর হাঁকিয়ে। সব মিলিয়ে কেবল নারীত্বের আবমাননাই নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় স্বয়ং নারী এবং নারীর চারপাশ তাঁকে ‘পণ্য’ বা ‘মাল’ হিসাবে চিত্রিত করেছেন। তবে আমার মনে হয় যাঁরা যৌনকর্মী শব্দটি জীবিকা হিসাবে বর্ণনা করতে চাইছেন, তাঁরা হয়তো এটাই উদ্ভাবন করতে চাইছেন যে, এই শব্দটি দ্বারা যৌনপেশার সঙ্গে যুক্ত নারীদের নামের সুপ্ত কলঙ্ক খণ্ডন করা যাবে, তাঁদের কর্মী বা শ্রমিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। যৌনপেশার যুক্ত নর-নারীদের কর্মী বা শ্রমিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়তো করা যাবে একদিন–আজ, না হয় কাল। তাই বলে কলঙ্ক ঘোচানো যাবে কখনো? কখনোই নয়। নামবদলে কলঙ্ক ঘুচবে এটার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
