অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বখে যাওয়া বাঙালি বাবু’ সম্প্রদায় এই অঞ্চলে নিজ নিজ উপপত্নীদের প্রতিপালন করতেন। এই অঞ্চলের বেশ কিছু বাড়ি নির্মিত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। প্যারিসের যৌনকর্মীরাও এই সোনালি অঞ্চলের (Golden District) খ্যাতি সম্পর্কে অবহিত ছিল। সেই বাবু সম্প্রদায় আজ নিশ্চয় নেই। তবে অন্য এক বাবুরা তো আছেন যাঁরা লুকিয়ে গণিকাদের সঙ্গ নেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে সমাজের মান্যগণ্য অনেক ব্যক্তিবাবুরাই গণিকালয়ে পদধূলি দেন। সোনাগাছিতে আর-এক ধরনের ‘বাবু’-র সন্ধান পাওয়া যায়। আসুন, সেইসব বাবুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।
সোনাগাছির অন্দরমহলে ‘বাবু’ কাকে বলে? নিষিদ্ধপল্লিতে ‘বাবু’, ‘বসা’, ‘বাড়ি’ ইত্যাদি শব্দগুলির চালু আছে। শুধু বাবুদের কথাই বলি, সাধারণ ক্লায়েন্ট বা খরিদ্দারদের আর বাবুদের মধ্যে তফাতটা বুঝে নিই। বাবু তাঁরাই, যাঁরা যৌনকর্মীদের খরিদ্দার। সাধারণ খরিদ্দাররা শুধুমাত্র যৌন উত্তেজনা প্রশমণ করতে যৌনকর্মীদের সঙ্গ নেয় কিছু সময়ের জন্য। এঁদের অন্য কোনো দায় নেই। পয়সা ফেলবে, তার বিনিময়ে যৌনসুখ নেবে। ফেলো কড়ি মাখো তেল। কিন্তু বাবুদের দায় আছ। দায় থাকে। বাবু হল বাঁধা কাস্টমার, যাঁর সঙ্গে একজন যৌনকর্মীর সম্পর্ক প্রায় স্বামী-স্ত্রীর মতো। সেই সম্পর্কে ভালোলাগা থাকে, ভালোবাসা থাকে, আবার একটু আশ্রয়ের জন্যেও হতে পারে। এই যৌনকর্মীরা মূলত সোনাগাছি এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। বাঁধা খরিদ্দারের দায়িত্ব অনেক বেশি। এঁরা বসন্তের পাখি নয়। এঁদের কেউ কেউ উপাসনালয়ে গিয়ে শাখাসিঁদুর পরিয়ে বিয়েও করে নেয়। কাঁধে তুলে নেয় আজীবনের দায়িত্বভার। এঁরা গণিকাপল্লিতে ‘বাবু’ হিসাবেই পরিচিত।
সমাজের যে-কোনো স্তরের খরিদ্দাররাই বাবু হতে পারে। কোনো বাছবিচার নেই। অফিসের পিওন থেকে শুরু করে কোনো উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, ডাক্তার, আইনজীবী, মাফিয়া ডন, পুরোহিত, কুলি-কামিন, ঠ্যালাওয়ালা–কে নয়! তবে সব মাছ যেমন ইলিশ নয়, তেমন সব পুরুষই জাত-বাবু নয়। বাবুদেরও প্রকারভেদ আছে। বাবুদের দায়বদ্ধতাকে কেন্দ্র করেই প্রকারভেদ।
(১) টাইমের বাবু : ইনি সেই পুরুষ, যিনি কাম্য নারীর কাছে টাইমে আসেন, টাইমেই যান। মধু খেতে আসেন, খাওয়া হলেই ফুড়ৎ। ইনি বসন্তের পাখি। দায়িত্ব তো নেই-ই, উলটে বিপদ বুঝলেই ধা। তবে নীতিগতভাবেই এই পুরুষটি অন্য মেয়ের ঘরে যান না। তাই ইনি বাঁধা বাবুর মর্যাদা পান।
(২) সাহসী বাবু : ইনি সেই পুরুষ, যিনি ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। যৌনকর্মীটিকে বিয়েও করেছেন। বিয়ে করে নিজের বাড়িতেও নিয়ে যান মর্যাদার সঙ্গে নিজের বাড়ি না-থাকলে ঘর ভাড়া করেও অন্যত্র থাকেন।
(৩) অভিজাত বাবু : ইনি সেই পুরুষ, যিনি ভালোবাসার বিবিকে সাহস করে নিজের বাড়ি বা অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারে না। তবে বিবিটির সারাজীবনের দায়িত্ব নেন। অন্য কোনো বাবুর সঙ্গে সেই বিবি সহবাস করতে পারবে না। তবে বাবুটি মেয়েটির ‘যৌনকর্মী’ হিসাবে বিশ্বস্ত থাকবেন, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। বাবুটি অন্য একাধিক যৌনকর্মীর সঙ্গে শোবেন, শুতে পারেন।
(৪) খাওয়া-মোছা বাবু : এই বাবু অবশ্য কাঠ-বেকার পুরুষ। কোনো যৌনকর্মীর অন্নে প্রতিপালিত হয়। বিনিময়ে ঘর মুছে দেওয়া, রান্না করে দেওয়া, বাজার করে দেওয়া, বিভিন্ন ফাইফরমাস খাটা ইত্যাদি।
পড়ন্ত বয়সে যৌনকর্মীদের পরিণতি কী? এই প্রশ্নটার উত্তর তো খুঁজতে হবে। দুটি পরিণতি দেখতে পাওয়া যায়–(১) গেরস্ত হওয়া এবং (২) হাফ-গেরস্ত হওয়া। গেরস্ত হওয়া মানে যদি কোনো বাঁধা বাবু’, সে মজুর দালাল পাতি চাকুরে বা ব্যাবসায়ী যেই হোক তাকে ধরে কপালে সিঁদুর নিয়ে কোথাও সংসার পাতা যায়। অপরদিকে হাফ-গেরস্ত মানে অন্তত কোনো বাঁধা বাবু’ পাওয়া, যে তাঁকে বিপদে-আপদে দেখবে, হয়তো দু চার পয়সা মূলধন দিয়ে সাহায্য করবে, যাতে কিনা সে কালেকালে বাড়িওয়ালি’ হয়ে উঠতে পারে। এইভাবেই তাঁর পেশার উত্তরণ হয়। এই দুয়ের মধ্যে কিছুই না-হলে ক্ৰমে ওই পল্লিতেই ঝি-গিরি করে পেট চালাতে হয়। নয়তো পথে পথে ভিক্ষে করে বেড়াতে হয়। যদি দেশ-গাঁঘর-আত্মীয় বলে কিছু খুঁজে পাওয়া যায়, তবে। সেখানেই বেঁচে থাকার অন্তিম ঠাঁই মেলে।
যে সমস্ত পুরুষরা ওই পাড়ায় থাকে তাঁরা অধিকাংই নেশাগ্রস্ত, বেকার, গণিকাদের উপার্জনের নির্লজ্জ পরজীবী। ওইসব নিষ্কর্মা গুলিশোর পুরুষরাই ওদের (গণিকাদের) প্রহার করে, অত্যাচার করে। সংগঠনের সদস্য অলংকৃত করে, মতামত প্রদান করে। এইসব পুরুষপুঙ্গবদের হাত থেকে, দালালদের হাত থেকে, মাসিদের হাত থেকে অত্যাচারিত মেয়েদের রক্ষা করতে পারবে কারা? সংগঠন? সংগঠনের কর্মকাণ্ডে মিশে গেছে অত্যাচারী যাঁরা, তাঁরাও। গণিকাপল্লির স্থায়ী বাসিন্দা দুর্ভাগা গণিকাদের কথা বলবে কারা? সংগঠন? ওদের কণ্ঠ কারা? সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীরা, যাঁরা মৌচাকে রানি-মৌমাছি হয়ে বসে আছে পিরামিডের চূড়ায়। সংগঠনের অফিস আছে, অফিসে মোটা বেতনের চাকুরে আছে, সংগঠনের প্রেস আছে, সভা-সমিতি আছে। সংগঠনের রাজনীতি আছে। পাড়া কোন রাজনৈতিক দলের কুক্ষিগত থাকবে, তা নিয়ে নিত্য লড়াই-সংঘর্ষ আছে।
