সোনাগাছির বর্তমান অবস্থান উত্তর কলকাতার মার্বেল প্যালেসের উত্তরে চত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, শোভাবাজার ও বিডন স্ট্রিটের সংযোগস্থলের কাছে। নানা ক্যাটাগরির যৌনকর্মী অপেক্ষা করে থাকেন রসিক ক্লায়েন্টদের জন্য। শরীর-মূল্য প্রতি ঘণ্টায় ১০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা বা তারও বেশি। এই সমস্ত পল্লি এলাকায় ঢুকলেই। চোখে পড়বে গলির দু-ধারে এবং আশেপাশে বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে। এঁরা মুখে সস্তার রং মেখে উৎকট প্রসাধনে সেজে বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। এঁরা নিজের নিজের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে, গলির মুখে দাঁড়ায়, দরজায় চৌকাঠে। এঁদের শরীর-মূল্য খুবই কম। উচ্চমূল্যে, অতি উচ্চমূল্যে শরীর বিক্রি করেন এমন যৌনকর্মীও আছে এই পল্লিতে। তাঁদের খুঁজে নিতে হয়। যাঁর যেমন সামর্থ্য সে তেমন মূল্যের যৌনকর্মীর যৌন পরিসেবা নেন। তবে যিনি যে মূল্যেই যৌন-পরিসেবা নিক না-কেন কন্ডোম বাধ্যতামূলক। শুধু সোনাগাছিই নয়, কন্ডোম ছাড়া কোনো এলাকার কোনো যৌনকর্মীই যৌন-পরিসেবা দেয় না।
সোনাগাছিতে বেশকিছু বিলাসবহুল বাড়ি আছে, যেখানে উচ্চমূল্যের যৌনকর্মীরা থাকে। বাড়িগুলি বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন–প্রেমবন্ধন, নাইট লাভার্স, ১২ নম্বর, কাঞ্চন প্যালেস, গঙ্গা-যমুনা, নীলকমল ইত্যাদি। এঁদের বেশিরভাগই ভিনরাজ্যের। আগ্রা, দিল্লি, পাঞ্জাব ইত্যাদি প্রদেশ থেকে আসা মেয়েরা। এঁরা শীততাপনিয়ন্ত্রিত ফানিশড সুগন্ধযুক্ত ঘরেই যৌন পরিসেবা দিয়ে থাকে। যদিও এইসব বাড়িগুলি ছাড়াও অন্য বাড়িতেও যৌনকর্মীরা ফার্নিশড ঘর না-হলেও শীততাপনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা রেখেছে। তবে তার জন্য অতিরিক্ত ৬০০ টাকা গুণতে হয় ক্লায়েন্টকে। নামাঙ্কিত বাড়িগুলির মাসিক ভাড়া ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। তাহলে বুঝতেই পারছেন এইসব বাড়ির যৌনকর্মীদের শরীর-মূল্য কত হতে পারে! যেমন গুড় তেমন মিষ্টি আর কী! এইসব যৌনকর্মীর শুধু যৌন-পরিসেবাই দেয় না, সঙ্গে নাচ-গানও চলে। শুধু নাচ-গানও শুনতে বা দেখতেও কেউ কেউ আসে এখানে। নাচ বলতে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নাচ। যৌনমিলন ছাড়া এই ধরনের কাজের রেটও আলাদা। ৩২০০ টাকা থেকে শুরু। যৌনকর্মে আলাদা রেট। আজকাল সোনাগাছির কিছু কিছু বাড়িতে ম্যাসাজ সেন্টারের নামেও এক ধরনের যৌনপেশা চালু হয়েছে। বলা হয়, ১৫ মিনিটের ‘ফুল বডি ম্যাসাজের রেট ৫০০ টাকা, ‘অন্য কিছু চাইলে প্রতি ঘণ্টায় ১৫০০ টাকা। পারিশ্রমিকের এত বৈচিত্র্য ভারতের আর কোনো গণিকালয়ে পাওয়া যায় না। যেমন সোনাগাছির ‘আগ্রাওয়ালিদের কোঠি’ বলে পরিচিত এই বাড়ির যৌনকর্মীদের কাছ থেকে যৌন পরিসেবা নিতে হলে বেশ চড়া মূল্য গুণতে হয়। যে-কোনো যৌনপল্লিতে প্রবেশ করলেই দুটি শব্দ আপনার কানে আসবে। একটি হল—‘বসবে’? এখানে বসবে’ মানে আমার সঙ্গে শোবে’? দ্বিতীয় শব্দটি হল–‘শট’। শট শব্দের মানে যোনিমূলে লিঙ্গের প্রবেশ (Penetration)। অর্থাৎ ক্লায়েন্ট কতবার যৌনমিলন করবেন। প্রতি যৌনমিলনে রেট নির্ধারিত হয়। এক একটি ইনিংস কমপক্ষে এক ঘণ্টার হয়ে থাকে। তবে। ক্লায়েন্টের বীর্যস্থলনের সঙ্গে সঙ্গে একটি শট শেষ হয়ে যায়।
সোনাগাছিতে তিন শ্রেণির গণিকাদের পাওয়া যায়—(১) যাঁরা এই অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। এঁরা হয় বিক্রি হয়ে আসা, নয় পাচারকৃত হয়ে আসা, নয় প্রতারণার শিকার হয়ে আসা। (২) যাঁরা স্থায়ী বাসিন্দা নয়, সকালে এসে কাজ করে সন্ধ্যায় নিজের বাড়ি ফিরে যায়। প্রয়োজন হলেই ফুল নাইট’ কাজ করে। ফুল নাইট কাজ তখনই করে, যখন কোনো একজন ক্লায়েন্ট তাঁকে সারা রাতের জন্য চায়। এঁদের বয়স মোটামুটি তিরিশের নিচে। এঁরা স্বেচ্ছায় এই পেশা বেছে নিয়েছে। এবং (৩) এঁরা স্থায়ী বসিন্দা যেমন নয়, তেমন বাড়ি থেকে এসেও এখানে ঢোকে না। এঁরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা এসে কাছাকাছি বিভিন্ন মানুষের যাতায়াতের জায়গায় দাঁড়ায়। যেমন–উল্টাডাঙা বা শিয়ালদহ স্টেশন সংলগ্ন এলাকা, বুকিং কাউন্টারের সামনে, ভিআইপি ফুটব্রিজের উপরে, আশেপাশে ক্লায়েন্টের জন্য অপেক্ষা করে। এছাড়া ছবিঘর, প্রাচী, মেট্রো, পূরবী সিনেমা হলের সামনে শো টাইমে দাঁড়ায়। ক্লায়েন্ট জুটে গেলে তাঁকে নিয়ে সোজা সোনাগাছির কোনো ঘরে নিয়ে এসে যৌন পরিসেবা দেয়। কেউ কেউ কাছাকাছি হোটেলেও পরিসেবা দেয়। এইসব যৌনকর্মীরা সাধারণত মধ্যবয়স্কা ও পড়ন্ত যৌবনা। এঁরাও স্বেচ্ছায় এই পেশা বেছে নিয়েছে। সবাই যে শুধুমাত্র পেটের জন্য আসে, তা নয়। কথা বলে জানা গেছে, অনেক মেয়েরা বহুগামিতা চেতনা থেকেও এই পেশায় আসে। তাঁদের বহু পুরুষের সঙ্গ না পেলে ভালো লাগে না। তাঁদের কাছে যৌনতা একটা প্যাশন। জনৈক শরীর-ব্যাবসায়ী স্পষ্টত জানালেন–“আমি আমার ক্লায়েন্টদের ক্লায়েন্ট’ ভাবি না। বন্ধু ভাবি এবং ভাবাই। আর্থিক লেনদেন থাকলেও ক্লায়েন্টদের বন্ধু হই এবং বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করি। ক্লায়েন্টদেরও বোঝাতে সক্ষম হই যে, আমি তোমার কিছু মুহূর্তের জন্য যৌনসঙ্গী হলেও, বন্ধুও। বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে সেক্স করতে আমার ভালো লাগে। বিচিত্র যৌন অভিজ্ঞতা হয় আমার, যা খুবই মজাদার। পূর্ণ স্বাধীনতায় আমি আমার কাজ করি। ইচ্ছে হল করি, ইচ্ছে না হলে করি না। বাড়িতে রেস্ট নিই। আমি সোনাগাছি অঞ্চলে কাজ করি বটে। কিন্তু থাকি না। ঘড়ি ধরে বাড়ি থেকে বেরোই, আবার ঘড়ি ধরে বাড়িতে ঢুকে যাই। বেরোনোর সময় কোনো ক্লায়েন্ট এলেও ছেড়ে দিই। বাড়ির সবাই জানে আমি চাকরি করি। এটা আমার কাছে এখন আর পেশা নয়, নেশা। অর্থ ও যৌনসুখ দুই-ই পাই।”
