পরিসংখ্যান বলছে, শিকাগো শহরে সেক্স ব্যাবসায় উপর আলোকপাত করে। এখানে গণিকাবৃত্তি বাজার কেবলমাত্র ব্যাবসার কাজ করে। বাজার সবসময় ক্রেতা আর বিক্রেতা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। এখানে লেনদেন একসঙ্গে পারস্পরিকভাবে চলে। এখানে চার্জ নির্ধারিত হয় আলোচনা, কন্ডোম সবকিছুর উপর নির্ভর করে। তবে গণিকারা তাঁদের নিজেদের জন্য ক্রেতাদের খুঁজে নেয়। সম্প্রতি এক গবেষণায় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন ডি লেভিত এবং সুধীর আল্লাদি ভেঙ্কটেশ্বর শিকাগোর পুলিশ বিভাগ থেকে সর্বজনীনভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য বলছে, ১৬০ জন গণিকা দ্বারা পরিচালিত ২০০ টি গণিকাগৃহ বর্তমান। এঁরা ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং চানেলে সহজলভ্য নয়। তবে শপিংমলের দোকানে এরা যথেষ্ট পরিচিত। গণিকাবৃত্তিতে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও মাদক বিক্রয়ে এরা সম্পৃক্ত নয়। রোজল্যান্ডের গণিকারা বাইরের কাজ করে না, যদিও পুলেমানের সমস্ত রাস্তার গণিকারা কাজ করে।
১৯. গণিকালয়ের নাম সোনাগাছি
গণিকা ও গণিকালয় নিয়ে লেখালেখি হবে, অথচ সোনাগাছি নিয়ে আলোচনা হবে না! সোনাগাছি নিয়ে আলোচনা করার জন্য তাই আলাদা একটি অধ্যায় রাখা হল। সোনাগাছি’, এই শব্দটি ফিসফিস করে উচ্চারণ করতে হয় ভদ্রসমাজকে। অনেকে অবশ্য সোনাগাছি না-বলে গণিকাপল্লি বোঝাতে ‘বি কে পাল অ্যাভিনিউ’ বা ‘চিৎপুর’ বা ‘যাত্রাপাড়া’ও বলে থাকে। সোনাগাছি, এই শব্দটির সঙ্গে গণিকাপল্লির ৪০০ বছরের ইতিহাস আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। সুনামেই হোক বা দুর্নামেই হোক–গণিকালয় হিসাবে সোনাগাছি অদ্বিতীয়তম্। ‘সোনাগাছি’ আর ‘গণিকালয়’ আজ একটি সমার্থক শব্দ। বাংলা সাহিত্যে-সিনেমায় কখনোই উপেক্ষিতা হয়নি। বাংলা সাহিত্যে-সিনেমার আনাচে-কানাচে সোনাগাছির অন্ধকার উঠে এসেছে।
বস্তুত ব্রিটিশ-ভারত সরকারের আমলেই সোনাগাছি বৃহৎ আকার ধারণ করে। এলাকা বৃদ্ধি আজও অব্যাহত। শুধু ঊনবিংশ শতাব্দীই নয়, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সোনাগাছির সীমানা ছিল উত্তরে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট (বর্তমানে বিধান সরণি), দক্ষিণে চিৎপুর রোড (বর্তমানে রবীন্দ্র সরণি), পূর্বদিকে শোভাবাজার বি কে পাল অ্যাভিনিউ এবং পশ্চিমে জোড়াসাঁকো ঠকুরবাড়ির প্রায় সংলগ্ন অঞ্চল। পরে সোনাগাছির মাঝখান দিয়ে একটা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। উত্তর থেকে দক্ষিণে, অর্থাৎ বাগবাজার থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত। শুরুতে চিত্তরঞ্জন, পরে ভূপেন্দ্র বসু অ্যাভিনিউ। চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের পূর্বদিকের অঞ্চলটায় ক্রমশই নির্বাসিত হল গণিকারা। সোনাগাছির উল্টোদিকের দর্জিপাড়া অঞ্চলটি ক্রমশই গৃহস্থদের দখলে চলে যাচ্ছে। অথচ এই দর্জিপাড়াই একসময় গণিকাপল্লির সমার্থক ছিল। এখন সেখান থেকে গণিকাদের পাততাড়ি গোটাতে হয়েছে। নবনির্মিত গৃহস্থ পাড়ায় গণিকাদের জায়গা দিতে নারাজ ভদ্র বাবুবিবিরা। এইভাবেই দর্জিপাড়া হাতছাড়া হয়ে গেল গণিকাদের। এলাকা ছোটো হোক বা বড়ো, এখন পুরো অঞ্চলটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘রেড লাইট এরিয়া হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। অনেকে বলেন এশিয়ার সর্ববৃহৎ নিষিদ্ধপল্লি। ভারতের তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গেরও।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই সোনাগাছির জন্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুর্দা দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংরেজদের হাতে তামুক খেতে খেতে ‘প্রিন্স’ উপাধিও পেয়ে গেছেন। আর এটা পেয়েছেন ইংরেজদের ভেট দিয়ে। ভেটের মধ্যে অন্যতম ছিল নারীশরীর। দ্বারকানাথ নিজেও ছিলেন প্রচণ্ড নারীবিলাসী। স্বদেশ-বিদেশ যেখানের তিনি থাকুন না-কেন নারীই তাঁর নিত্যসঙ্গী। তিনি জাহাজের ব্যাবসা, নীলের ব্যাবসা, সিল্কের ব্যাবসা সবেতই দখল নিয়েছিলেন ইংরেজদের আনুকূল্যে। ইংরেজদের আনুকূল্যে পেয়েছিলেন বিশাল জমিদারি। জোড়াসাঁকো থেকে শোভাবাজারের জমি। এই অংশেই ছিল সোনাগাছি অঞ্চল। আসলে এই অঞ্চলটির আদি নাম সোনাগাজির চত্বর। এই সোনাগাজিই লোকের মুখ-ফেরতা হয়ে হয়ে এখন সোনাগাছি। কেউ বলেন, স্বর্ণ নামে এক বাইজি ওই এলাকায় বাস করত। তাঁর নাম থেকেই সোনাগাছি। আবার কেউ বলেন, সোনাগাজি বা মুসলিম পির সনা উল্লাহ গাজি নামে এক পির বসবাস করত। তাঁর নামে একটি মসজিদও আছে এই এলাকায়। ৩০০ বছরের পুরোনো সেই মসজিদ। সেই সোনাগাজি থেকেই নাকি সোনাগাছি।
বিভিন্ন সময়ে কলকাতা শহরে আরও অনেক নিষিদ্ধপল্লি গড়ে উঠেছিল। যেমন মধ্য কলকাতার বউবাজার এলাকার হারকাটা গলি, দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট অঞ্চল, খিদিরপুর সহ আরও বহু জায়গায় তৈরি হয় গণিকাপল্লি। একসময় হুতোম কলকাতাকে ‘বেশ্যাশহর’ আখ্যা দিয়েছেন। বুলবুলির লড়াইয়ে কলকাতা শহরে হুতোমি ডিকশনে ‘বেশ্যাবাজী’ ছিল বড়ো মানুষের এলবাত। শুধু সোনাগাছি অঞ্চলেই আছে ১০,০০০ যৌনকর্মী। আছে কয়েকশো বহুতল বাড়ি। সোনাগাছি অঞ্চলে যৌনকর্মীরা আসে সাধারণত নেপাল, বাংলাদেশ থেকে এবং ভারতের অন্য রাজ্য থেকেও। আছে নানা ভাষাভাষীর মানুষ। গোটা ভারতবর্ষই ঢুকে পড়েছে সোনাগাছির অন্দরমহলে। এখানকার কোনো বাড়ি ৫ কামরার তো কোনো বাড়িতে ২৫ কামরা। এমন কয়েকশো বাড়িতে যৌন পরিসেবা দিয়ে চলেছে যৌনকর্মীর মেয়েরা। আবার দেখা গেছে একই ঘরে একাধিক পার্টিশন দিয়ে যৌনকর্ম চলে। সেই পার্টিশনগুলি এতটাই সংকীর্ণ যে, কোনোমতে দুটো শরীরই আটতে পারে।
