পুরুষ যৌনকর্মীদের বিষয়ে নারীবাদীরা কী মনে করেন একটু দেখা যাক। নারীবাদীরা পুরুষের যৌনপেশায় আসা নিয়ে সোচ্চারভাবে কিছু না-বললেও যে একেবারেই বলেননি তা কিন্তু নয়। কট্টর নারীবাদীরা গণিকাবৃত্তির বিরোধিতা করছে চিরকাল, সেটা নারী কিংবা পুরুষ হোক। তাঁরা অস্তিত্ববাদী বা উদারপন্থী নারীবাদীদের মতো যৌনকর্মকে সমাজের বুকে মেনে নিয়ে আইনসম্মত করাটা মানবতার বিরোধিতা মনে করে। যেমন করে সমাজে পুরুষরা নারীকে শোষণ করে যৌনপেশায় কাজ করায়, তেমনি পুরুষরাই কিছু পুরুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই পেশায় নিয়োগ করে শোষণ করছে, অর্থবলে-ক্ষমতাবলে। এটা ঠিক যে, অনেক পুরুষ স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসছে। কিন্তু অন্যদিকে অস্বীকার্য যে অনেক কম বয়সি পুরুষ বাধ্য হয়। সমকামী পুরুষের মনোরঞ্জনে যৌন চাহিদা মেটানো। এমন কি বয়োঃসন্ধিকালে অনেক অল্প বয়সি পুরুষ এই পেশায় নিয়োজিত হয়, সমকামী না-হয়েও। অবশেষে অর্থাভাবে অনেকেই এই পথকেই বেছে নেয় পেশা হিসাবে। তা ছাড়া, অপ্রাপ্ত বয়স থেকে এই পেশায় থাকার কারণে মানসিকভাবে অন্য পথটাও তাঁদের চেনা ওঠে হয়ে না।
পুরুষ হওয়ার কারণে এঁরা নির্যাতিত হয় না, সেটা সঠিক তথ্য নয়। নারী যৌনকর্মীদের মতোই পুরুষরাও ধর্ষিত হয়, শারীরিকভাবে অত্যাচারিত হয়, আর্থিকভাবে প্রতারিত হয়। সেইজন্য পাশ্চাত্যে পুরুষদের ‘রেপ ক্রাইসিস সেলটার’-গুলোতে এতো পুরুষ যৌনকর্মীদের ভিড়। সমকামী পুরুষ এবং যৌনকর্মীরাই সেখানে বেশি। যৌনকর্মী, হোক সে নারী কিংবা পুরুষ, যৌন হয়রানির শিকারের আধিক্য তাঁদের উপরই বেশি। তাঁদেরকে যেমনভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করা যায়, কারণ তাঁরা অর্থের বিনিময়ে ভোগ্য মানুষ। অর্থশালী নারী-পুরুষ উভয়েই তাঁদেরকে ব্যবহার করে ইচ্ছানুযায়ী। প্রথমে আর্থিকভাবে ঠকানো, তারপর শারীরিক নির্যাতন। পুলিশও ওদের পক্ষে থাকে না, থাকলেও পুলিশরেই উপর্যুপরি প্রশ্নে জর্জরিত হতে হয় ওদেরকে। তা ছাড়া বেশিরভাগ দেশেই তো ওরা বেআইনি, পুলিশের সাহায্য আশা করতে পারে না। অত্যাচারী গ্রাহকেরা সে ব্যাপারে অবগত বলেই অত্যাচার করতে দ্বিধাবোধ করে না। অনেকসময় ওরা নির্যাতন সয়ে নিয়ে ক্রাইসিস লাইনে ফোন করে কথা বলে অবস্থার প্রতিকার চায়। সেইজন্যই অস্তিত্ববাদীরা এবং উদারপন্থীরা মনে করে যে, যৌনকর্মীদের জন্য বিশেষ আইন থাকা প্রয়োজন। কর্মী বা ক্লায়েন্ট কেউই যেন কোনো অনাচারের শিকার না হয়, সঙ্গে সঙ্গে যৌনকর্মীরা বয়সকালে রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না-হয় সেইজন্য তাঁরা উপযোগী আইন গঠনের পক্ষে।
এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে পুরুষের বেশ্যাবৃত্তি কি আইনসম্মত? অনেক দেশেই এই পেশা বিধিসম্মত, কিছু দেশে আংশিক আইনি, আবার কোনো-কোনো দেশে সম্পূর্ণ বেআইনি। যৌন-ব্যাবসায় নারী-পুরুষের আইন প্রকৃতপক্ষে একই। কিন্তু কোনো কোনো দেশে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ অঞ্চলেই পুরুষের যৌন-ব্যাবসা বে-আইনি নেভাডা অঞ্চল ছাড় দিয়ে। কিন্তু পুরুষ যৌনকর্মীদের সঙ্গে বসবাস নিষিদ্ধ। ২০০৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে শুধুমাত্র রোড আইল্যান্ডে গণিকাবৃত্তি বিধানসম্মত ছিল। কানাডায় পুরুষের যৌনবৃত্তি আইনসিদ্ধ। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে দরদাম বা কারবারি নিষিদ্ধ। ভারতে পুরুষের যৌন-ব্যাবসা বেআইনি নয়। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো পুরুষকে জবরদস্তি করে এই ব্যাবসায় নামানো বা প্রলুব্ধ করাটা বে-আইনি। বাংলাদেশে নারীর যৌন ব্যাবসা আংশিক আইনি, কিন্তু পুরুষের যৌন-ব্যাবসা বেআইনি।
একজন পুরুষ যৌনকর্মীদের কাছ থেকে নারী আসলে কী চায়? আসুন, উত্তর জেনে নিই একজন পুরুষ যৌনকর্মীর কাছ থেকে। পুরুষ যৌনকর্মী হিসাবে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছেন অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা রায়ান জেমস। নারীদের সঙ্গে যৌনসঙ্গমে দীর্ঘদিনের প্রচুর অভিজ্ঞতা তাঁর। বিবাহিত, অবিবাহিত, কুমারিসহ নানা বয়সের নারী তাঁকে ভাড়া করে ভোগ করেছে। আর সময় দেওয়ার বিনিময়ে ৪০০ ডলার থেকে শুরু করে ৬০০০ ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক পেয়েছেন রায়ান জেমস। তাঁর মতে, নারীরা কেবল যৌনমিলকেই প্রাধান্য দেন না, তাঁদের চাহিদা অন্যরকম। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ডেইলি মেইলের অস্ট্রেলিয়া ভার্সনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নারীর বিভিন্ন চাওয়া পাওয়ার কথা বলেন। তিনি জানান, বিছানায় নারী শুধু যৌনতাই চান না। একে অপরের কথা বলা, এখানে-ওখানে ঘুরতে যাওয়াও নারীর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন পুরুষের কাছে নারী প্রেমিকের মতো আচরণ চায়, যন্ত্রের মতো নয়। তিনি জানান, তাঁকে শুধু নারীর সঙ্গে যৌনমিলন করার জন্যই ভাড়া করা হয় না। একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানোসহ আরও অন্যান্য কাজের জন্যেও তাকে পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। তিনি তাঁর পেশাদারিত্বের খাতিরে ৪০০ ডলার থেকে শুরু করে ৬০০০ ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিয়ে থাকে। তার মধ্যেই যৌনমিলন ও হোটেলে অবস্থান সংযুক্ত থাকে।
রায়ন বলেন, পুরুষরা বেশিরভাগ সময় যৌনমিলনকেই প্রাধান্য দেয়। বিশেষ করে কোনো পুরুষ ক্লায়েন্ট যখন মহিলা যৌনকর্মীর কাছে যায়। শুধু যৌনকর্মই সব কিছু নয়। অনেক নারী আছেন যাঁরা যৌনতা নির্ভর খুনসুটি করতেও ভালোবাসেন। তাই পুরুষদের উচিত শুধু যৌনমিলনের উপর গুরুত্ব না দিয়ে, অন্যান্য বিষয়ের উপরেও গুরুত্ব দেওয়া। রায়ান আরও বলেন, “অনেক নারী আছেন যাঁরা বারে গিয়ে যে-কোনো পুরুষ যৌনকর্মীকে নিয়ে আনন্দ ফুর্তি করেন, কিন্তু যৌনমিলন করেন না। বেশিরভাগ নারী তাঁর যৌনকর্মীর সঙ্গে কী করবেন, তা আগে থেকে ঠিক করেন না। ভাড়া করার পর যা করতে ভালো লাগে তাই করতে শুরু করেন। আবার অনেক নারী আছেন, যাঁদের পছন্দের বিষয় তাঁরা জানান। তাঁরা মিলিত হয়ে সেভাবেই কাজ করতে বলেন। আবার কিছু নারী আছেন, যাঁরা শুধু যৌনমিলনের জন্যই টাকা পরিশোধ করেন। তাঁরা নিজেদের শারীরিক চাহিদা মিটিয়েই চলে যান। তাঁদের নিজের কোনো পছন্দের কথা বলেন না। আমি যা করি তাঁরা তাতেই খুশি থাকেন।” নিজের অভিজ্ঞতা কথা বলতে গিয়ে রায়ান আরও বলেন, “পুরুষের উচিত নারীর মনের কথা জানা। তা না-হলে নারীকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। আর এ বিষয়টি একজন পুরুষ যৌনকর্মীর খুব ভালো করেই জানতে হয়।”
