বিশ্বের ইতিহাস একটি বিস্মৃতবাদী সমাজের (Misogynist Society) মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। সুতরাং বিস্ময়ের অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই যে, মহিলারা অতীতকালীন যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা, কলা এবং বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে এমন সমস্ত মহান পুরুষদের বিপরীতে গৌণ ও নিম্নমানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। সেন্ট অগাস্টিন থেকে শোপেনহাউয়ার এবং ডারউইন পর্যন্ত ইতিহাস পুরুষদের কৃতিত্বের দিকে বর্ণনা করেছে। মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত কিছু বোকা হুল্লাবলুদের (Foolish hulabaloos) উৎসাহিত করেছিল। অন্ধকার যুগের সময় অনুসন্ধানের শাস্তি বা মহিলা বিশৃঙ্খলা প্রবণতা ব্যাখ্যা করার জন্য এবং প্রমাণ করার জন্য মহিলা যৌন উগ্রতার উত্থান হয়। দুষ্টের প্রতিমূর্তি হিসাবে মহিলাদের ধারণার ফলে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল, যেখানে পুরুষ লিঙ্গ ঠিক তেমন শক্তিশালী বা তত উন্নত দেখা যায় না। এই অনুচ্ছেদের একটি হল প্রাচীন গ্রিস এবং রোমের পুরুষ যৌনকর্মীদের কাহিনি।
প্রাচীন গ্রিসে লিঙ্গভিত্তিক যৌন দৃষ্টিভঙ্গির একটি গৌণ ভূমিকা ছিল। তাঁদের যৌন পছন্দগুলির দ্বারা কারও সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি এবং সামাজিক নিয়মাবলি যৌনতাকে একটি প্রাকৃতিক অনুশীলন হিসাবে দেখেছিল, যার। কোনও পোলিসের সঙ্গে সম্পর্কিত বা অন্যের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। গ্রিসে পুরুষ যৌনবৃত্তি নারী যৌনবৃত্তির মতোই সাধারণ ব্যাপার ছিল। তবে পুরুষত্ব যৌনতার সময় একটি ‘শ্রেষ্ঠত্বের নীতি’ প্রকাশ করেছিল। লিঙ্গের ক্ষেত্রে সক্রিয়-নিষ্ক্রিয় (Active-Passive) দ্বিপদী এক অপরিসীম তাৎপর্য অর্জন করে। যেহেতু যৌনক্রিয়া চলাকালীন একজন ব্যক্তির ভূমিকা তাঁদের সামাজিক অবস্থান প্রকাশের একটি খাঁটি উপায় হয়ে উঠেছে। অনুপ্রবেশকারী’ (Penetrator) সাধারণত সামাজিক বা সামরিক খেতাব সহ উচ্চমানের ব্যক্তি ছিলেন।
পুরুষ যৌনকর্মীদের থেকে মহিলা যৌনকর্মীরা কিছুটা পৃথক। কারণ পুরুষরা তাঁদের শরীর মহিলাদের কাছে যেমন উপস্থাপন করতে পারত, তেমনই একই লিঙ্গের অন্যান্য ব্যক্তিদের উপভোগ এবং আনন্দ দিতে পারত। পুরুষ যৌনবৃত্তির অনুশীলনের দুটি ভিন্ন উপায় ছিল, যা বিভিন্ন স্তরে অবনমিত ছিল। ট্রামোস বা পর্নোইকে নিকৃষ্ট বা অবাঞ্ছিত হিসাবে বিবেচনা করা হত। কারণ তারা বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে উপার্জনের জন্য তাঁদের দেহ বিক্রি করেছিল, কিন্তু তাঁদের কেউই গ্রিসের নাগরিক ছিল না। যেহেতু তাঁরা যুদ্ধবন্দি ছিল, তাই হেলেনিক সমাজের নিম্ন স্তরের চেয়েও নিকৃষ্ট বলে বিবেচিত হয়েছিল। তাঁদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা কঠোরভাবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল, যাঁদের পরিসেবা প্রয়োজন। রোমান সমাজ একই নীতি গ্রহণ করেছিল, এটি বেশ কয়েকটি আইন দ্বারা প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা নিশ্চিত করেছিল যে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিটি প্রবেশকারী (Penetrator) হিসাবে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করবে। অন্যথায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি পেতে হবে।
দ্বিতীয় ধরনের পুরুষ যৌনকর্মীকে হেঁটেরিকোস (Hetairikos) বলা হত। তাঁদের মর্যাদা হিটেইরাস নামক এক উচ্চপদস্থ মহিলা যৌনকর্মীদের সমান ছিল। তাঁদের ভূমিকা আজকের এসকর্টের মতো ছিল। এই পুরুষরা সাময়িকভাবে একই পদমর্যাদার নাগরিকদের দ্বারা গৃহীত (Adopted) হত। যতক্ষণ না তাঁরা প্রকাশ্যে অন্তত তাঁদের সম্পর্কের সক্রিয়-নিষ্ক্রিয় নীতিটিকে সম্মান করে, তাঁরা তাঁদের মাস্টার’-দের প্রতি যৌন অনুগ্রহ প্রদান করেছিল।
পুরুষের যৌনপেশা বা পুরুষ যৌনবৃত্তি বিষয়টি নতুন মনে হলেও এটি সভ্যতার নতুন কোনো বিষয় নয়। রোমান এবং গ্রিক পুরাণেও এমন অনেক চরিত্র পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে সেই সময়েও পুরুষ দেহব্যাবসা প্রচলিত ছিল এবং পুরুষদেরকে বাধ্য করা হত এই পেশা বেছে নিতে। ইতিহাসেও পাওয়া যায় এমন ঘটনা! প্লেটোর রচনা ‘ইলিসের ফিডো’ এমনই একটা সত্যকাহিনি, যাতে পুরুষ যৌনকর্মীদের বর্ণনা আছে। হিব্রু বাইবেলেও পুরুষের যৌনপেশার কাহিনির উল্লেখ আছে। অতীতে অনেক যুদ্ধ ফেরত সৈনিক এই পেশা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেইসময় পুরুষের যৌনবৃত্তি নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন মনে করত না কেউ। কারণ সেটা কতিপয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেই যেমন সীমাবদ্ধ ছিল। তেমনি এই বিষয়ে তৎকালীন সমাজে সাধারণ মানুষের ধারণাও ছিল সামান্য। কাজেই বলা যেতে পারে, পুরুষের যৌনপেশা কোনো নতুন বিষয় নয়, বরঞ্চ এই ঘটনাটি নারীদের পাশাপাশি চলে আসছে বহুকাল ধরেই।
সোস্যাল মিডিয়ায় পুরুষ যৌনকর্মীদের দেখা মেলে প্রচুর পরিমাণে। একজন পুরুষ যৌনকর্মীকে পেশিবহুল, মার্জিত, অতি সুসজ্জিত এবং আকর্ষণীয় ছবিসহ সেইসব পেইজের দেয়াল ভরে আছে। তা ছাড়া ওই নির্দিষ্ট রেন্টবয়ের কাছে সে কী কী সুযোগসুবিধা, সেবা এবং পরিচর্যা গ্রাহক পেতে পারে, সে বিবরণ আকর্ষণীয়ভাবেই তুলে ধরা হয়, কিছু দাবি-দাওয়াও আছে সেখানে। যেমন—ক্লায়েন্টের কী কী ব্র্যান্ডের গাড়ি থাকতে হবে, কটেজে না বাড়িতে থাকবে, কী খাবার খাওয়াতে হবে, এইসব আবদার পেশাদারি দাবি। আরও কিছু তথ্য জানা গেল এমন কিছু পেইজ ঘাঁটাঘাঁটি করে। খুব স্পষ্ট করে জানানো আছে এইসব পেইজে। যেমন—কে শুধুমাত্র সমলিঙ্গের সঙ্গ দিতে চায়, কে শুধুমাত্র নারীর সঙ্গী হতে চায় এবং কারা উভয়ের সঙ্গ দিতে আগ্রহী ইত্যাদি। যাই হোক, অর্থ আর আয়ের বিষয় এইক্ষেত্রে খুবই আনুসঙ্গিক। কারণ এই পেশাও একটা বাণিজ্য। এই পেশায় যদি পুরুষের আয় নারীর চেয়ে বেশি হয় তাহলে এটাও ভুললে চলবে না, পুরুষ যৌনকর্মীদের ক্লায়েন্ট শুধুমাত্র নারীই নয়, ধনী, উচ্চবিত্ত এবং অনেক প্রভাবশালী পুরুষও। অর্থের বাড়তি অঙ্কটার আমদানি সেই পাল্লাতেই ভারী। যে কারণে ব্যক্তিগতভাবে সমকামী না-হলেও এই পেশায় অনেক কর্মী সমকামী পুরুষদেরও সঙ্গী হয়।
