মূলত উচ্ছেদের পর যৌনকর্মীদের জোরপূর্বক ভবঘুরে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু গণিকারা তো কেউ ভবঘুরে নয়! তাঁদের ভবঘুরে কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট আইন আছে? গণিকাদের ভবঘুরে কেন্দ্রে নেওয়ার ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। ১৯৯৯ সালে ৩১ জুলাই পুনর্বাসনে অনাগ্রহী গাজিপুরের কাশিমপুর ভবঘুরে কেন্দ্রে স্থানান্তরিত যৌনকর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ২২৭ জন যৌনকর্মী বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য দুপুরে খাবার গ্রহণ না করে বিক্ষোভে অংশ নেন। এমনকি মুক্তি না-দিলে যৌনকর্মীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে বলে হুমকি দেয়। যৌনকর্মীদের নেত্রী সাথী বলেন, “মুক্তি না-দিলে তাঁরা কেন্দ্রের ভিতর আগুন জ্বালিয়ে দেবে। গাছ থেকে লফিয়ে বা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে। ওইদিন কেন্দ্রে এলেই আপনারা লাশ দেখবেন।”
বাংলাদেশে এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। এখানে প্রায়শই যৌনকর্মীদের অমানুষিক পুলিসি নির্যাতন নেমে আসে। মাঝেমাঝেই পুলিশের সঙ্গে যৌনকর্মীদের খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। চলে গুলি, কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ। চলে গণিকাদের শ্লীলতাহানি, ধর্ষণও। রাতের অন্ধকারে যৌনকর্মীদের কোলপাঁজা করে বাসে তোলা হয়। টানাহ্যাঁচড়ায় যৌনকর্মীদের শরীর থেকে কাপড় খুলে পড়ে। সঙ্গমকালীন পুলিশের রেইড হওয়ার কারণে। পতিতারা নগ্ন হয়েই রাতভর দৌড়াদৌড়ি করে ছুটে পালায়। নারী সংগঠনের জনৈক নেত্রী সুফিয়া কামাল স্পষ্টত ক্ষোভ উগড়ে জানান–সমাজে অনেক ধনীঘরের মেয়েবউরাও গণিকাবৃত্তি করে। প্লেনে করে নামে, প্লেনে করে চলে যায়। তাঁদের নিয়ে তো কেউ মাথা ঘামাতে সাহস পায় না? এই গরিব মেয়েগুলোর উপর। কেন এত অত্যাচার করা হবে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক পুলিশ, সেই পুলিশই এঁদের পেটায় বেশি।”
১৭. পুরুষ যৌনকর্মীর বাজার
নারী-শরীর বিক্রির বাজার আছে, সেই বাজারে বিক্রিও বেশি। নারী যৌনতার জন্য শরীর বিক্রি ভাবলেই তাঁর বাজার সর্বদাই মজুত। বাজার ছোটো হলেও পুরুষ-শরীরও বিক্রি হয়। আকাশচুম্বী বেকারত্বের মোকাবিলা করতে যৌনপেশাই এখন একটা পথ অবশ্যই। বাজারে বেশিরভাগ অর্থ পুরুষদের হাতে। তাই নারী-শরীর কেন, সেই পুরুষ পৃথিবীর সবকিছুই কিনে নিতে পারে যে-কোনো মূল্যে। যেহেতু অর্থবান নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম, সেইহেতু পুরুষ-শরীরের বাজার তেমন রমরমিয়ে উঠতে পারেনি। তবে নারী যত বেশি বেশি করে আর্থিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত (স্বাধীনভাবে বা পরাধীনভাবে, যেভাবেই হোক) হবে, ততই পুরুষ-যৌনকর্মীদের বাজার চাঙা হবে। তবে বর্তমানে ধনীঘরের এক শ্রেণির মহিলারা স্বামীর অর্থে পুরুষ যৌনকর্মীর কাছে যৌনসুখ কিনছে।
আসুন, এবার পুরুষ যৌনকর্মীদের হালহকিকৎ জানার চেষ্টা করি। পুরুষ যৌনকর্মীদের ‘গণিকা’ বা ‘বেশ্যা’ বা ‘পতিতা’ বলা যাচ্ছে না। কারণ এই বিশেষণগুলির সবকটাই স্ত্রীলিঙ্গ। বর্তমানে একটি নতুন বিশেষণ চালু হয়েছে, সেটি হল ‘যৌনকর্মী’ (Sex Worker)। এটি একটি ইউনিসেক্স পরিচয়। এই পরিচয়ে মহিলা, পুরুষ, সমকামী সকলেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ব্যাপারটা আর লিঙ্গভিত্তিক থাকল না।
প্রত্যেকদিন সাহসী হচ্ছে বিশ্ব। আসলে নতুন কিছুই নয়–নগ্ন হয়ে জীবনযাপন করা থেকে শুরু করে বিবাহ বহির্ভূত যৌনতা এবং যৌনপেশা। সবই ছিল, সবই আছে এবং সবই থাকবে। ভণ্ডামির মধ্যেও থাকবে। যৌনতার ক্ষেত্রে তো অবশ্যই। আর এক্ষেত্রে মহিলাদের পাশাপাশি পুরষরাও আসছে যৌনপেশায়। গণিকাবৃত্তি মহিলাদের জন্য আর একচেটিয়ে থাকছে না। মহিলাদেরও প্রয়োজন হচ্ছে পুরুষ যৌনকর্মীদের সঙ্গ। অতৃপ্ত দাম্পত্য অথবা অতি দেরিতে বিয়ে করার বা হওয়ার কারণেই এই প্রয়োজনীয়তা। বিশেষত বিশ্বের প্রথম দেশগুলিতে তো বটেই। তৃতীয় বিশ্বের মহিলারাও যৌনতার সুখ খুঁজতে পুরুষ যৌনকর্মী ভাড়া করে জীবন উপভোগ করা শুরু করেছে। Women who pay for Sex’ শিরোনামে বিবিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। সাংবাদিক হান্নাহ বারনেসের লেখা ফিচারধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটেনে এমন অনেক মহিলা আছেন যারা বার কিংবা নাইট ক্লাবে গিয়ে পুরুষ সঙ্গী খোঁজা পছন্দ করেন না। যৌনতা উপভোগের জন্য তাঁরা ‘এসকর্ট এজেন্সির সাহায্য নেন। এসব এজেন্সির কাছে ফোনে এসকর্ট চাইলেই তাঁরা মহিলা ক্লায়েন্টদের শোওয়ার ঘরে পুরুষ ‘এসকর্ট’ পৌঁছে দেয়। এইসব মহিলা সাধারণ নিজের বয়সে চেয়ে অনেকটা কম বয়সি যুবকদের সঙ্গী হিসাবে পছন্দ করে। এতে বেশ একটা অজাচার (Incest) ফিলিংসও আসে।
ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের একটি বিলাসবহুল এসকর্ট এজেন্সির মালিক নিকোল। মহিলাদের জন্য তিনি একটি বিলাসবহুল এবং বড় আকারের বাংলো তৈরি করে রেখেছেন। যেটি শহর থেকে প্রায় অনেকটাই দূরে! এই বাড়ির ভিতরে কী চলছে সেটা বাইরে থেকে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই। নিকোল জানান, “মহিলা ক্লায়েন্টরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে চান। এটা তাঁদের নিজস্ব পৃথিবী, এই গোপনীয়তা তাঁদের জীবনেরই অংশ।” পুরুষ যৌনকর্মীরা জানেন তাঁদের কাছে আসা মহিলারা অবিবাহিত বা একাকী নন। এমনই একজন পুরুষ যৌনকর্মী জানাচ্ছেন, “কিছু মহিলা মনে করেন যৌনতার জন্য অর্থ ব্যয় কোনো অপরাধ নয়। এটি প্রেম বা অন্যান্য সম্পর্কের মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার।” যেসব মহিলার বয়ফ্রেন্ড বা স্বামী আছে, তাঁদের জন্য বারে কিংবা অন্য কোনো প্রকাশ্য জায়গায় অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গ খুবই বিপদজ্জনক। নিকোলের মতে, ‘তাঁদের জন্য এমন জায়গা দরকার যেখানে প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ তাদের দেখে ফেলবে না। সেজন্যে তাঁর তৈরি বাড়ি ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয়। অনেক মহিলাই আসেন, যাঁরা যৌনসুখ খোঁজেন। সেরা যৌনসুখটির খোঁজে তাঁরা যথেচ্ছ অর্থ ব্যয় করে, চলে অবাধ যৌনতা। সেরা যৌনসুখের অনেক ভাগ্যবতী মহিলাদের অর্থও ব্যয় করতে হয় না। কোনো পছন্দের পুরুষকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে সেই পুরুষটির সঙ্গে স্বেচ্ছায় অবাধ যৌনসঙ্গম করে নেয়। বিনিময়ে প্রেমের আকুতি, ভালো-মন্দ উপহার, প্রয়োজনে কিছু আর্থিক সাহায্য, একে অপরের সুখ-দুঃখ শেয়ার করা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে একটু বেশি বয়সের মহিলারাই নতুন এক আইডেন্টিটি খুঁজে পায়। এই ভেবে আত্মশ্লাঘা বোধ করে যে, সে এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এইভাবে এসকর্ট সার্ভিসে না জানিয়ে একজন বিশ্বস্ত ও বিশ্বাসী পুরুষের সঙ্গে নিজের যৌন চাহিদা মিটিয়ে নেয়। তবে এই শ্রেণির মহিলারা যেমন বেশি বয়সের হয়, তেমনি সম-বয়সের পুরুষ-সঙ্গীও খুঁজে নেয়।
