বাংলাদেশের গণিকাবৃত্তিতে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও পাওয়া যায়। নারীদের গণিকাবৃত্তিতে সাহায্য করতে স্বামী পরিচয়ে পুরুষ ভাড়াও পাওয়া যায়। ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে যৌনকর্মীদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওইসব যৌনকর্মীরা এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া নিয়ে দেহ-ব্যাবসা শুরু করেছে। বাড়ি ভাড়া নিতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বামী ছাড়া বাড়ির মালিক বাড়ি ভাড়া দিতে চান না। বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ওই প্রতিবন্ধকতার কথা চিন্তা করে যৌনকর্মীরা তাঁদের পূর্বপরিচিত কোনো পুরুষকে স্বামী হিসাবে ভাড়া করেন। বাড়ি ভাড়া করার সময় সঙ্গে থাকেন ভাড়াটে স্বামী। দেখা গেছে, বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় বাড়ির মালিককে বলা হয় স্বামী নিয়মিত ঢাকায় থাকে না, বাইরের কোনো জেলায় চাকরি বা ব্যাবসা করে। একই সঙ্গে বলা হয়, বাসায় নিয়মিত থাকবে তাঁর স্ত্রী ও দুই বা তিন বোন। ওই বোনদের থাকার কথা বলে বৈধ করে নেওয়া হয় আরও দুই-তিনজন যৌনকর্মীকেও। এভাবেই ঢাকা শহর জুড়ে ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতে চলছে যৌন-বাণিজ্য।
শনির আখড়ার সোহান (ছদ্মনাম) বরিশাল থেকে অভাবের তাড়নায় ঢাকায় আসেন। এসএসসি পাস নয়, তাই কোনো চাকরি দিতে চাইছে না কেউ। এরই মধ্যে দেখা মিলে ছিনতাইকারী কাজলের সঙ্গে। নিরূপায় হয়ে তাঁর সঙ্গে যোগ দেয় সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইয়ের কাজে। পরিবর্তন করে ফেলে নিজের বংশ-পরিচয়ও। এরই মধ্যে পরিচয় হয় স্বামী পরিত্যক্তা রূপার (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তখন তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে। চাকরির পাশাপাশি যৌন-ব্যবসায় লিপ্ত ছিলেন।
সিদ্ধান্ত হয় স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে দুজন রাজধানীর শনির আখড়ায় বসবাস করবেন। এরপরই বিউটি পার্লার ব্যাবসার আড়ালে রুপা শুরু করে জোরালো যৌন-ব্যাবসা। বিধি বাম, এলাকার দুষ্ট বেরসিক ছেলেরা জেনে যায় সোহান-রূপা আসলে স্বামী-স্ত্রী নয়। দুজনের এই অবাধ বসবাসে বাদ সাধে তাঁরা। দুজনকেই বাধ্য করে সত্যিকারের বিয়েতে। এছাড়াও সোহান রাজধানীর শান্তিনগর, বাড্ডা, ফার্মগেট এলাকাসহ ৮/৯টি জায়গায় যৌনকর্মীদের স্বামী পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে নিজে রোজগার করছেন মোটা অঙ্কের টাকা। আর মাঝে মধ্যে খদ্দের জোগাড় করে দিলে তাঁর কমিশন তো আছেই।
রাজধানীতে তিন ধরনের কাজের জন্য মহিলাদের স্বামী পরিচয়ে পুরুষ ভাড়া করার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা গেছে। বিশেষ করে যৌন-ব্যাবসার সঙ্গে জড়িত নারীরা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় স্বামী হিসেবে লোক ভাড়া করে বাড়ির মালিককে দেখিয়ে থাকেন। এনজিওসহ বেশকিছু মাল্টিপারপাস কোম্পানি থেকে ক্ষুদ্রঋণ নেওয়ার শর্ত হিসাবে স্বামীর পরিচয় ও তাঁর ছবি ব্যবহার করতে স্বামী ভাড়া করেন। এছাড়া, সাম্প্রতিককালে পাসপোর্ট অফিসে কোনো মহিলা স্বামী ছাড়া একা গেলে তাঁকে স্বামীর উপস্থিতি দেখানোর প্রয়োজনে স্বামী ভাড়া করে আবার স্বামী নিয়ে আসার ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে হয়।
১৯৯৭ সালে স্থানীয় কমিশনার এক সময়ের কান্দুপট্টির অধিপতি হোসেন মোল্লার নেতৃত্বে তথাকথিত পঞ্চায়েত কমিটি নামে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র ইংলিশ রোডে কান্দুপট্টির গণিকাদের উপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে গণিকালয়ে অবস্থানরত নারী ও শিশুদের উচ্ছেদ করেছিল। তাঁদের উপর নির্মম নির্যাতন চালায় এবং গণিকাদের সারাজীবনের সঞ্চিত সম্পদ লুটপাট নিয়ে যায়। উচ্ছেদকৃত মমতাজ বেগম নামে জনৈক গণিকা উচ্ছেদকৃত যৌনকর্মীদের একত্রিত করে ‘পতিতা সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করে প্রেসক্লাবে অবস্থান শুরু করে। এই সংগ্রাম পরিষদকে সামনে রেখে নারীপক্ষ এবং বেশ কিছু মানবাধিকার সংগঠন মিলে সংহতি প্রকাশ করে এই আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দেয়। ১০ টি নারী ও মানবাধিকার সংগঠন মিলিতভাবে কান্দুপট্টি নারী ও শিশু সংহতি পরিষদ’ নামেও একটি কমিটি গঠন করে। নারীপক্ষের উদ্যোগে কালুপট্টি থেকে উচ্ছেদকৃত যৌনকর্মীদের নিয়ে আরও একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয় এবং বাংলাদেশে প্রথম ‘উল্কা নারী সংঘ’ বিভিন্ন কাজ করে আসছে। অন্যদিকে ‘কেয়ার’ এইচআইভি/এইডসের কাজ করতে গিয়ে ঢাকায় ভাসমান যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করছে। নারী মৈত্রী এবং বিডাব্লিউএইচসি যৌনকর্মীদের সঙ্গে অনুরূপ প্রকল্প চালাচ্ছিল।
দুর্জয় নারী সংঘ, উল্কা নারী সংঘ, মুক্তি নারী সংঘ, টানবাজার ও নিমতলী যৌনকর্মীদের বাংলাদেশ সরকারের কাছে যে দাবিগুলি জানিয়েছে, তা হল–(১) পুনর্বাসনের নামে উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে, (২) যৌনকর্মীদের বর্তমান বাসস্থানে রেখে উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে, যেমন–শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি, (৩) সরকারকে যৌনকর্মীদের উন্নয়ন কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যৌনকর্মী ও মনবাধিকার ও নরী আন্দোলনের কর্মীসহ সকলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, (৪) যে কারণে এবং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন নারী যৌনকর্মী হয়, সরকারকে সকল কারণগুলি চিহ্নিত করে প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিতে হবে, (৫) যেসব দালাল, পাচারকারী সহ জড়িত সকল লোকজন, যাঁরা গোটা প্রক্রিয়ার জড়িত তাঁদের চিহ্নিত করতে হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, (৬) যেসব যৌনকর্মীকে পুনর্বাসনের নামে তাঁদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে বা হচ্ছে তাঁদের বাসস্থান ও জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে, এবং (৭) পুনর্বাসনের নামে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা বন্ধ করতে হবে।
