এ চিত্র শুধু বাংলাদেশের নয়। এ চিত্র ভারত সহ বিভিন্ন দেশে প্রায় একই। গণিকা হওয়া ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বিষয় নয়। খুব কম গণিকাই মানসিকভাবে এ পেশাকে বেছে নেয়।
গণিকালয়ের বাইরেও বহু নারী দেহব্যাবসায়ে জড়িত। বিভিন্ন শহরে-নগরে বাড়ি ভাড়া করেও এঁরা গণিকাবৃত্তি চালায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে শুরু করে গৃহবধুরাও অতিরিক্ত আয়ের জন্য এই কাজ করে থাকে। আবাসিক হোটেলে ঘর ভাড়া নিয়ে দেহব্যাবসায় করা একটি প্রতিষ্ঠিত কর্ম। এক শ্রেণির দালালের মাধ্যমে সাধারণ নারীরা খদ্দের জোগাড় করে।
বাংলাদেশে তো গণিকাদের হোম সার্ভিসও চালু আছে। বাংলাদেশের জনৈক দালাল অকপটে জানিয়েছেন–“ঢাকায় হোটেলে পুলিশের হয়রানি। ফ্ল্যাট বাড়িতে স্থানীয় হোমরাচোমরা ও মস্তানদের উৎপাত। তাঁদের বখরা না-দিয়ে নিস্তার মেলে না। তাই বাধ্য হয়েই হোম সার্ভিসে জড়িয়ে গেছি। খদ্দেরের কল পেলে বাসায় যাই।” রাজধানীর এক যৌনকর্মীর আবাসিক হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাঁর। কিন্তু সেখানে কমিশন দিয়েও রেহাই ছিল না, তাঁদের অন্যান্য চাহিদায় সাড়া দিতে হত। এ অবস্থায় বাধ্য হয়েই তাঁকে বেছে নিতে হয়েছে হোম সার্ভিস। এভাবে অসংখ্য যৌনকর্মী নানাভাবে তাঁদের পেশাকে বিস্তৃত করেছে এখন। হোটেল আর রাজপথ পেরিয়ে তাঁরা যুক্ত হয়েছে হোম সার্ভিসে। তাদের এ পেশার নেপথ্যে রয়েছে শক্তিশালী দালাল চক্র। এঁরা প্রকাশ্যে চলার পথে হাত বাড়িয়ে পথিকদের হাতে ধরিয়ে দেয় তাদের ভিজিটিং কার্ড। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট, বাসস্ট্যান্ড, বাজার, অলিগলি ও অফিস-আদালতের সামনে দালালরা এসব কার্ড বিলি করে। যে-কোনো প্রয়োজনে ফোন দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মুহূর্তেই জনতার ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে যায় তাঁরা। যৌনকর্মীরা জানায়, আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার ও বয়-বেয়ারা নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে খদ্দের যোগাড় করে দেয় তাঁদের। অনেক পেশাদার যৌনকর্মী অবশ্য নিজেরাই কার্ড বিলি করে। এসব কার্ডে সাধারণত মধ্যস্থতাকারীর মোবাইল নম্বর থাকে। পার্ক, ওভারব্রিজ এলাকায় তাদের তৎপরতা বেশি। আরেক কৌশল হল হারবাল চিকিৎসার নামে ভিজিটিং কার্ড বিতরণ। ফার্মগেট, শাহবাগ, কাকরাইল, মালিবাগ, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, গাবতলি এলাকায় এ তৎপরতা বেশি। ব্যস্ততম গাড়িতে ছুঁড়ে দেওয়া হয় যৌন-চিকিৎসার নামের হ্যান্ড বিল। ওইসব চিকিৎসার আড়ালে চলে যৌন-ব্যাবসা। রাজধানীর আবাসিক হোটেলের সামনে প্রতিদিন অবস্থান করে দালাল চক্র। টার্গেট করা পথচারীকে তাঁরা ডাকে মামা বলে। কাছে এলেই ধরিয়ে দেয় ভিজিটিং কার্ড। বলে, মামা যেমন বয়সের দরকার সব ব্যবস্থা আছে। জায়গার সমস্যা হলে বলবেন। তবে রেটটা বাড়িয়ে দিতে হবে। যৌনকর্মীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের পরিচিত মানুষের মাধ্যমে বাড়িতে খদ্দের পেয়ে থাকে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফ্ল্যাট বাড়িতে ভিআইপি যৌন-ব্যাবসা নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে মহাখালী ডিওএইচএস, গুলশান, বনানী লালমাটিয়া, দিলু রোড, ইস্কাটন রোড, সেন্ট্রাল রোড, মোহম্মদপুর, রামপুরা, শান্তিনগর, উত্তরা, কাকলী, কালাচাঁদপুর এলাকায় এ ব্যাবসা চলছে বলে জানায় এক যৌনকর্মী। তবে ভিআইপি এলাকায় যৌন-ব্যবসা পরিচালিত হয় বিশেষ গোপনীয়তায়। সেখানে যাতায়াত করে বিশেষ ধরনের খদ্দের। মালিবাগের এক ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মী জানায়, ঢাকা শহরের দু-একটা স্থান ছাড়া সব জায়গাতেই এ ব্যাবসা চলছে। মোবাইল ফোন ও ভিজিটিং কার্ডের মাধ্যমে এ ব্যাবসার গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। পেটের দায়ে যে যৌনকর্মীরা রাস্তায় নেমেছে পুলিশের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হতে হয় তাঁদের। কিন্তু ভিআইপি এলাকায় পুলিশকে সালাম দিয়েই ঢুকে যায় তাঁরা। পথচারী আলাল মিয়া জানান, তার হাতে একটি কার্ড পড়েছিল। কল করলে একজন পুরুষ রিসিভ করে। বিনয়ের সঙ্গে জানায়, আপনার ফোনের অপেক্ষায় আছেন ঢাকার বিভিন্ন কলেজ, ইউনিভারসিটির ছাত্রী ও মধ্য বয়সের মহিলা যৌনকর্মী। বলুন কী সেবা করতে পারি স্যার? তাঁর মতে, আজকাল সংসারে অশান্তি, স্বামী বিদেশে বা স্বামীর কর্মস্থল ঢাকার বাইরে এ ধরনের অনেক মহিলা হোম সার্ভিসে যোগ দিয়েছেন। ভিজিটিং কার্ডের নম্বরধারীরা সাধারণত চারটি ভাগে রাজধানীতে যৌনকর্মী সরবরাহ করে। প্রথমত, যৌনকর্মীকে ভিজিটরের বাড়ির ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, যৌনকর্মী ও ফ্ল্যাট ভিজিটরকে নিরাপদে নিয়ে আসা। তৃতীয়ত, হোটেল ঘরে যৌনমিলনে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা এবং চতুর্থত, প্রাইভেট পরিবহন ও পার্ক।
তবে বিশেষ শ্রেণির যৌনকর্মীরা নিজের ফ্ল্যাট বাসা-বাড়িতে খদ্দেরকে আপ্যায়ন করে। একটি সূত্র জানায়, সংখ্যায় কম হলেও কেবল টাকার জন্য নয়, নিজেদের যৌনবাসনা পূরণ ও মনোরঞ্জনের জন্যও অনেক মহিলা এ কাজে নেমেছে। এমনও যৌনকর্মী আছে যাদের সন্তান বড়ো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। সূত্র মতে, আবাসিক হোটেলের প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ ভিজিটিং কার্ডধারী যুবক এখন যৌনকর্মীদের মধ্যস্থতাকারীর কাজে লিপ্ত। ভিজিটিং কার্ডের আয় থেকে চলছে তাঁদের সংসার। কাওরান বাজারের এক হোটেল বয় জানায়, আজকাল ভদ্রঘরের মেয়েরাও যৌন-ব্যাবসার প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা নেমেছে এ পেশায়। তাঁরা বড়ো বড়ো হোটেলে যায়। তাঁদের কন্টাক্ট নম্বর কেবল হোটেলে পাওয়া যায়। ডিওএইচএস-এর এক যৌনকর্মী সম্পর্কে সে জানায়, দূরের জেলায় ব্যাবসা করে। নিঃসন্তান। প্রতি শুক্রবার স্বামী ঢাকায় ফেরে। ওই মহিলা সপ্তাহে তিন দিন আমাদের মাধ্যমে নিজের বাড়িতে খদ্দের নেয়। ভিজিটের অর্ধেক টাকা দিয়ে দেয়। বনানীর এক যৌনকর্মীর স্বামী সরকারি কর্মকর্তা। সে এক সন্তানের মা। তবুও অতিরিক্ত টাকার রোজগারের নেশায় এ পেশায় এসেছে। সূত্র খুব বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, সে একেবারে হাড়কিপটে। জিজ্ঞেস করা হয়, মহিলার আয় কত? সপ্তাহে ২৫ হাজার টাকা। আর সে কমিশন পায় ৫ হাজার টাকা। জানতে চাওয়া হয় কতদিন ধরে মহিলা এ কাজে লিপ্ত? উত্তরে জানায়, ৪ মাস। আরেক সূত্র জানায়, হোটেলে শুধু গণিকা মেয়েরা আসে না। কেউ আসে গণিকা সেজে। খদ্দের দেখে পছন্দ হলে বাসায় নিয়ে যায়। বিনিময়ে আমাদের কিছু টাকা ধরিয়ে দেয়। তাঁর মতে এরা গণিকা নয়। স্বামীর অসংগতি, সংসারে ঝামেলা ও বিভিন্ন মানসিক কষ্টের কারণে এ কাজে তাঁরা ঝুঁকে পড়েছে। জানতে চাওয়া হয়, এই ধরনের মহিলাদের সংখ্যা? সে বলে, তার হাতে আছে ২৩ জন। প্রতিদিন পালাক্রমে তাঁদের খদ্দের পাঠাতে হয়। এঁরা ‘ভাবী’ নামে পরিচিত। এই ‘ভাবী’দের ভিজিট কেমন? ঘণ্টা প্রতি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। তবে সুদর্শন পুরুষ তাঁদের বেশি পছন্দের। তাঁদের জন্য ডিসকাউন্ট আছে। এ সূত্রটির মাসিক আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এক যৌনকর্মী জানায়, সে ঢাকায় এসেছে স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে। প্রতিবেশী ভাবীর সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁর উৎসাহে এ পেশায় এসেছে। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর শতাধিক খদ্দের জুটে গেছে। এক ডাকে সবাই তাঁকে চেনে। পুলিশ তাঁর জন্য কোনো সমস্যা নয় বলে জানায়।
