কেস স্টাডি–দুই : নাম জাহানারা। বয়স ৩০। সন্তান দুটি। বাপের বাড়ি ময়মনসিংহ। বিয়ের পর তাঁর স্বামী তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসে। স্বামী হোটেলে কাজ করত। বিয়ের পর প্রথম ৪/৫ বছর স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালোই ছিল। ওইসময় তাঁর একটা সন্তান হয়। সন্তান জন্মের পর তাঁর স্বামীর অন্য এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হয় ও নেশায় আসক্ত হয় এবং জাহানারাকে খুব শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। তাঁর স্বামীর সঙ্গে বাড়িতে মাঝেমধ্যে একটা পুলিশ এসেও নেশা করত। একদিন তাঁর স্বামী পুলিশকে বাড়িতে রেখে সরে পড়ে। পুলিশটি জাহানারাকে ধর্ষণ করে। এরপর থেকে প্রায়ই তাঁর স্বামী পুলিশের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সরে পড়ত। আর প্রতিদিন জাহানারা ওই পুলিশের দ্বারা যৌন-লালসার শিকার হত। স্বামী কিন্তু সংসারের খরচ দিত না। ফলে বাচ্চা ও নিজের খাবার জোটানোর জন্য সে বাসা-বাড়িতে কাজ করতে শুরু করে। কিন্তু বাচ্চার কারণে কেউ তাঁকে বেশিদিন কাজে রাখত না। এরপরে সে ওই পুলিশের সাহায্যে পুলিশের ইনফর্মার হিসাবে কাজ শুরু করে। কিন্তু বেশিদিন ওই কাজ করতে পারে না। কারণ তাঁর এক দেবর জেলে ছিল। সে জেল থেকে বের হয়ে জাহানারাকে ওই কাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য হুমকি দিলে ওই কাজ ছেড়ে দেয়। জাহানারার পেটে যখন দ্বিতীয় সন্তান তখন তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে এসে দেহ-ব্যাবসা শুরু করে। প্রায় দুই বছর সে এই কাজ করেছে। কাজ ছাড়ার পাঁচ মাস আগে জাহানারার টাইফয়েড হয়। টাইফেয়েডের ফলে তাঁর এক হাত ও এক পা দিয়ে কোনো কাজই করতে পারে না। উদ্যানে সে সারাদিন একটা পলিথিন বিছিয়ে ৫ বছরের ছেলে ও ১ বছরের মেয়েকে নিয়ে শুয়ে থাকে। খিদে পেলে ৫ টাকার বিনিময়ে খাবার কিনে খেত। জাহানারা সাধারণত রাতে খদ্দেরদের সঙ্গে দেহ-ব্যাবসা করত।
কেস স্টাডি–তিন : নাম কালী। বয়স ২৮। আজিমপুর বস্তির বাসিন্দা কালীর দুটি সন্তান। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর প্রায় ১০ বছর দেহ-ব্যাবসার পেশায় আছে। কালী যখন ছোটো ছিল তখন তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর তাঁদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। কেউ তাঁকে দেখতে পেত না। সারাক্ষণ গালিগালাজ করত। এ সময় কালীর মাসি তাঁকে এক বাড়িতে কাজ দেওয়ার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসে। কালী ওই বাড়িতে কিছুদিন থাকার পর থেকে ওই বাড়ির ছেলের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হতে থাকে। হয়রানি এড়াতে একদিন সে সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে এক মহিলার কাছে আশ্রয় পায়। এই মহিলাই কালীকে দেহ ব্যাবসায় নিয়ে আসে। এই পেশায় থাকতে থাকতে এক ছেলের সঙ্গে কালীর প্রেম হয় এবং একে অপরকে বিয়ে করে। বিয়ের পর কালী দেহ-ব্যাবসা ছেড়ে দেয়। কিন্তু বিয়ের পর কালী জানতে পারে তাঁর স্বামীর আরও একটি স্ত্রী আছে এবং স্বামীর নেশাও করে। বিয়ের আগে তাঁর স্বামী তাঁর সঙ্গে বেশ ভালো ব্যবহারই করত। কিন্তু বিয়ের পরই কালীর উপর শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে। এরই মাঝে তাঁর একটি সন্তান হয়। তাঁর স্বামী সন্তান ও তাঁর খরচ তত দিতই না, উলটে দেহ-ব্যাবসা করে অর্থ উপার্জনের জন্য চাপ দিত। কালীর পেটে দ্বিতীয় সন্তান, তখন তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। এই বিপদে কেউ তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। কালী সন্তান পেটে নিয়ে দেহ-ব্যাবসায় চলে আসে তাঁর সন্তান আর নিজের খাবার জোগাড় করেছে। মাঝে এই পেশায় বিরতি দিয়েছিল দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের কারণে। এরপর পুনরায় পেশায় ফিরে আসে। কাজে আসার সময় তাঁর বাচ্চাদের এক পিসির কাছে রেখে আসে। প্রতিবেশীরা জানত কালী গার্মেন্টসে কাজ করে।
কেস স্টাডি–চার : নাম হামিদা। বয়স ৩৫। এক সন্তানের মা। ১৫ বর্ষীয় সেই সন্তান হামিদার মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে থাকে। হামিদা বিধবা। স্বামী পুলিশের চাকরি করত। নয় বছর আগে তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পরে হামিদার উপর খুব নির্যাতন করত শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরা। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে হামিদা তাঁর বাপের বাড়িতে চলে আসে সন্তানকে নিয়ে। তাঁর ও তাঁর সন্তানের দায়িত্ব ভাইয়েরা নেয়নি। এমতাবস্থায় হামিদা ধারকর্জ করে দিন গুজরান করতে থাকে। কিন্তু হামিদা কোনো ধারই শোধ দিতে পারেনি। ফলে একটা সময় কেউই আর ধার দিতে চায় না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হামিদা মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে চলে আসে ঢাকার মাসির বাড়ি। সেখান থেকে এক বাড়িতে গৃহকর্মী হিসাবে কাজ নেয়। সেখানে হামিদা প্রায়ই গৃহকর্তা ভাইয়ের দ্বারা যৌনলালসার শিকার হতে থাকে। এ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে গৃহকত্রী হামিদাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়। মাসির বাড়ি ফিরে এলে এক মাস সেখানে থাকার পর সেই মাসি সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে গণিকাবৃত্তিতে ঢুকিয়ে দেয়। হামিদার পরিচিত-পরিজনেরা জানত সে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কাজ করে। থাকত আজিমপুর বস্তিতে। সে দুপুর ২/৩ টায় উদ্যানে আসত রাত পর্যন্ত কাজ করত এবং সকাল ৭/৮ টা নাগাদ বাড়ি ফিরত।
কেস স্টাডি–পাঁচ; নাম নাজমা। বয়স ২৯। পরিবারে তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান। থাকেন আজিমপুর বস্তিতে। স্বামী অসুস্থ বলে কোনো কাজকর্ম করতে পারে না। স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর নাজমা সংসারের সব দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়। কাপড়ের ব্যাবসা শুরু দেয়। কিন্তু কাপড়ের ঠিকমতো না জানায় কাগজ কুড়োনোর কাজ নেয়। এতসব করেও অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার খরচ আর সংসার চালানো একবারেই সম্ভব হচ্ছিল না। এরপর বাধ্য হয়েই গণিকাবৃত্তিতে যোগ দেয়। টানা তিন বছর সে এই কাজ করেছে। গণিকাবৃত্তি করে স্বামীর চিকিৎসা, সংসার চালানো, শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা এবং ননদকে ১০ হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে বিয়েও দিয়েছে সে। নাজমার এই পেশার কথা শুধুমাত্র স্বামীই জানত। বাকিরা জানত সে গার্মেন্টসে কাজ করত। তবে এ কাজ নাজমার মোটেই ভালো লাগত না। ভালো না লাগার কারণ, এ পেশাকে গোপন রাখতে তাঁকে সবসময় অনর্থক মিথ্যা কথা বলতে হত। ভয়ে ভয়ে তাঁর দিন কাটত।
