আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে নারী ও শিশু পাচারে খুব শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দরকার হয়। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এখন যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা মেয়েদের ঢাকা, নেপালের কাঠমান্ডু ও ভারতের কোলকাতায় নিয়ে আসা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। কলকাতায় ব্যস্ত যৌন-ব্যাবসায় এরকম অনেক নারীদের পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে তাঁরা। এরপর তাঁদের আজ খোঁজ মিলছে না। এমন ওয়েবসাইটও পাওয়া গেল যেখানে কীভাবে রোহিঙ্গা মেয়েদের ব্যবহার করা যায়, সে নিয়ে ধাপে ধাপে তথ্য দেওয়া হয়েছে। কীভাবে ধরা পরার হাত থেকে বাঁচা যায়, কোন্ এলাকায় সবচাইতে বেশি শিশু পাওয়া যায়, এমন সব তথ্য দিয়েছে এক ব্যক্তি। যদিও এই ওয়েবসাইটটি পুলিশ সরিয়ে ফেলেছে। তবে তার আগে সেটি যাচাই করে জানা গেছে কীভাবে শিশুকামী ও পাচারকারীদের টার্গেট হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা। বাংলাদেশে নতুন সেক্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে না-উঠলেও যৌনকর্মী হিসাবে কাজের জন্য মেয়ে সরবরাহ বেড়ে গেছে। আর সেটির অন্যতম শিকার রোহিঙ্গা মেয়েরা। বাংলাদেশের কক্সবাজারে ক্যাম্পগুলোতে নারীদের যৌন নির্যাতন ও যৌনপেশায় জড়িয়ে পড়ার এমন অনেক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেছে। অল্প বয়সি নারী ও শিশুরা এর মূল টার্গেট। বিপদগ্রস্ত এই নারী ও শিশুদের মূলত কাজের লোভ দেখিয়ে ক্যাম্প থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শিশু ও তাঁদের অভিভাবকরা বলছেন দেশের বাইরে কাজ, রাজধানী ঢাকায় বাড়িঘরে গৃহকর্মীর কাজ বা হোটেলে কাজের অনেক প্রস্তাব আসছে তাঁদের কাছে। মারাত্মক ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে বিশৃঙ্খল পরিবেশ পাচারকারীদের সুযোগ যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মাসুদা নামের আর-এক কিশোরী তাঁর কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে বলছেন, “আমি জানতাম আমার কপালে কী আছে। যে মহিলা আমাকে কাজ দেওয়ার কথা বলেছিল সেও একজন রোহিঙ্গা। অনেকদিন আগে এখানে এসেছে। সবাই জানে যে, সে লোকজনকে যৌনকাজে সহায়তা করে। আমার কোনো উপায় ছিল না, কারণ এখনও আমার জন্য কিছুই নেই।”
‘Research Evaluation Associates for Development (RED)’ সমীক্ষায় বলছে বাংলাদেশের গণিকাপল্লির যৌনকর্মীদের অবস্থা খুবই করুণ। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, মাসদাইর, রূপালি গেট, হাজিগঞ্জ; ঢাকায় তেজগাঁও, কমলাপুর; ময়মনসিংহের স্বদেশিবাজার, নিমতলি, কান্দুপট্টি, রাজবাড়ির দৌলতদিয়া ঘাট; টাঙ্গাইলের কান্দাপাড়ার যৌনকর্মীরা খুবই বিপন্ন। পুলিশ, মস্তান সবাই গিলে খাচ্ছে, নিঙড়ে নিচ্ছে দেহরস। পাশবিক অত্যাচার করে ভবঘুরে কেন্দ্রে চালান করে দিচ্ছে যৌনকর্মীদের। সেখানে পুলিশদের দ্বারা যৌনকর্মীরা ব্যবহৃত হচ্ছে, চলছে যৌন-সন্ত্রাস। বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।
গণিকাদের উচ্ছেদ করে গাজিপুরের কাশিমপুর এবং পুবাইল ভবঘুরে কেন্দ্রে আশ্রয় দেওয়া হয়। পুলিশ মাঝেমধ্যেই গণিকাপল্লিগুলিতে অতর্কিতে হানা দিয়ে মেয়েদের আটক করে ভবঘুরে চালান করে দেয়। মধ্যরাতে পুলিশের অতর্কিত হামলায় গণিকাপল্লিরা মেয়েরা আতঙ্কিত হয়ে বাথরুমের পিছনের পাইপ, দেয়াল, পায়খানাপূর্ণ ড্রেন দিয়ে পালানোর সময় মলমূত্রে মাখামাখি হয়ে যায়। যেহেতু মধ্যরাতে পুলিশি হামলা শুরু হয়, যেহেতু এই সময়ে যৌনকর্মীরা যৌনকর্মে ব্যস্ত থাকেন–অতএব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যৌনকর্মী মেয়েদের সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে অথবা খোলা বুকে ঘর ছেড়ে পালাতে হয়। ধরা পড়লে পুলিশ নৃশংসভাবে এঁদের উপর অত্যাচার করে, শারীরিক নির্যাতন করে। তাঁদের চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয়। মেয়েদের তলপেটে ভারী বুটের লাথি নেমে আসে। পুলিশ-ভ্যানে তুলে এঁদেরকে পাটতনের উপর ফেলে কয়েকজন পুলিশ মিলে ধর্ষণ পর্যন্ত করে থাকে।
বাংলাদেশের গবেষক-লেখক শাহিন পারভিনের কয়েকটি কেস স্টাডি রিপোর্ট গণিকাবৃত্তি প্রসঙ্গে এক সমীক্ষায় মাধ্যমে যে কজন তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তাঁরা সকলেই একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই গণিকাবৃত্তিতে এসেছেন। জানাচ্ছে এঁরা কেউই স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসেননি। তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা, দুঃখ-কষ্ট ও কোন্ প্রক্রিয়ায় তাঁরা এই পেশায় এসেছেন সেই চিত্র স্পষ্ট হয় পাঁচজনের এই কেস স্টাডি থেকে। পনেরো জন পতিতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল।
কেস স্টাডি–এক : নাম স্বপ্ন। পেশা ভাসমান গণিকা। বয়স ২৬। কাজের জায়গা সোহরাওয়ার্দি উদ্যান ও রমনা পার্ক। রাতে ফুটপাতে বা পার্কে ঘুমিয়ে থাকেন। স্বপ্ন ১২ বছর বয়সে তাঁর দুর সম্পর্কীয় এক মামার সঙ্গে ঢাকায় আসেন। তাঁর মামা তাঁকে একটি বাড়িতে কাজের জন্য দেয়। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর সে নতুন আর-এক বাড়িতে কাজ ধরে। সেই বাড়ির ছেলের সঙ্গে তাঁর প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক হয়। গোপনে তাঁরা বিয়েও করে নেয়। কিন্তু এসব জানাজানি হলে গৃহকর্তা তা মেনে নিতে চায় না। এর মধ্যে স্বপ্নার এটি সন্তানও হয়। সন্তান হওয়ার পর স্বপ্নার শ্বশুর তাঁর স্বামীকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয় এবং তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেয়। তাঁর স্বামীও তাঁর আর কোনো খোঁজখবর নেয়নি। স্বপ্নকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে সে কোলের সন্তানকে গ্রামে তাঁর বোনের কাছে রেখে আসে এবং সে গার্মেন্টসে ৩০০ টাকার একটি কাজ জোগাড় করে। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর গার্মেন্টসের এক দারোয়ান তাঁকে ধর্ষণ করে। এর ফলে এ কাজটিও হারায় স্বপ্না। এক মহিলা ৯০০ টাকায় বাসায় কাজ ঠিক করে দেবে বলে নিয়ে যায় একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে তিনজন পুরুষ স্বপ্নকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে। ধর্ষণ করার পর ওই মহিলা স্বপ্নকে ৫০ টাকা দেয় এবং সেখান থেকে বের করে দেয়। এই মহিলার সাহায্যেই এক হোটেলে কিছুদিন কাজ করে। হোটেলের এক কাস্টমার তাঁকে টানবাজারে নিয়ে যায়। এখানে সে পাঁচ বছর কাজ করে। কিছু টাকাপয়সাও তাঁর জমে। কিন্তু কিছুদিন পর উচ্ছেদ হলে সে সেইসব টাকাপয়সা আনতে পারেনি। উচ্ছেদের পর সে কাসিমপুরে বন্দি ছিল। সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশের হাতে ধৃত হয় এবং প্রচণ্ড মার খান। এরপর তাঁর পরিচিত একজন স্বামীর পরিচয় দিয়ে তাঁকে সেখান থেকে ছাড়িয়ে আনে। ছেড়ে দেওয়ার সময় স্বপ্নাকে একটা সেলাই মেসিন আর ৭০০০ টাকা দেওয়া হয়। এসব নিয়ে কিছুদূর আসতে না-আসতেই কিছু দুষ্কৃতি তাঁর সেলাই মেসিন কেড়ে নেয়। ছাড়িয়ে আনার জন্য সেই পরিচিত লোকটিকে ৫০০ টাকা দিয়েছিল। বাকি টাকা গ্রামের বোনকে দিয়ে সে ঢাকায় এসে সোহরাওয়ার্দিতে ভাসমান গণিকা হিসাবে কাজ শুরু দেয়।
