বাংলাদেশে অনেকক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হয়ে গণিকালয়গুলিতে হাজির হন মেয়েরা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যরা কখনো-কখনো অর্থের লোভে মেয়েদের বিক্রি করে দেন বলে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা। এছাড়া ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে কিংবা বিদেশ যাওয়ার লোভ দেখিয়েও মেয়েদের গণিকালয়ে আনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গণিকালয়ের মালিক নতুন আসা যৌনকর্মীদের শরীর ভোগ্যপণ্য করে তুলতে স্টেরয়েড ট্যাবলেট সেবনে বাধ্য করে, যা সাধারণত গোরুকে খাওয়ানো হয়। গোরুর স্বাস্থ্য বাড়াতে ব্যবহার করা এই ট্যাবলেট মানুষের দেহের জন্য ক্ষতিকর। কম বয়সি নাবালিকা মেয়েরা পূর্ণ যুবতী হয়ে ওঠে স্টেরয়েডের প্রভাবে। বাংলাদেশের এক গণিকালয়ের মালিক রোকেয়া জানান, স্টেরয়েড ওষুধ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভালো কাজে দেয়। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক, বিশেষ করে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সি মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নয়। তা সত্ত্বেও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের স্বাস্থ্য ভালো করতে এই বিশেষ ধরনের ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়। স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে গিয়ে একসময় বেশিরভাগ গণিকা স্টেরয়েডে আসক্ত হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড ইউকে এক সমীক্ষার ভিত্তিতে ২০১০ সালে জানায় যে, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ যৌনকর্মী ওরাডেক্সন বা অন্যান্য স্টেরয়েড ট্যাবলেট নিয়মিত গ্রহণ করে। তাঁদের গড় বয়স ১৫-৩৫ বছর। স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচারণা চালাচ্ছে অ্যাকশন এইড। সংস্থাটির বাংলাদেশ অংশের কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার জানিয়েছেন, “ওরাডেক্সন গ্রহণ করার পর শুরুতে মেয়েদের শরীরে চর্বির পরিমাণ বাড়তে থাকে। কিন্তু এটি নিয়মিত সেবন করলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, চামড়ায় ক্ষতসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়।”
বাংলাদেশের বেশ কয়েক নারীকে মধ্যপ্রাচ্যে যৌনদাসী হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের পাচার করে সিরিয়ায় নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক বার্তাসংস্থা। এসব নারীকে ফিরিয়ে আনতে সরকারি উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। তবে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন গণিকালয়েও বাংলাদেশি নারীদের জোরপূর্বক গণিকাবৃত্তিতে নিয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। কাজ দেওয়ার নাম করে বাংলাদেশের মেয়েদের মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যায় একশ্রেণির দালাল। বহু বছর থেকেই তাঁরা অতি সক্রিয়। বাংলাদেশী এইসব মেয়েরা সৌদিতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়।
বিদেশিদের খুশি করতে বাংলাদেশের আশ্রিত রোহিঙ্গা নারীদেরও যৌনকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অল্পবয়সি মেয়েরা বিদেশিদের যৌনকর্মে ব্যবহারের টার্গেট হয়ে উঠছে। কক্সবাজার থেকে যৌন-ব্যাবসার জন্য রোহিঙ্গা মেয়ে ও শিশুদের পাচার করা হচ্ছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিবিসি নিউজের একটি দল এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন সেন্টিনেল ওই অনুসন্ধানে নামে। তাঁরা কক্সবাজারের ছটো হোটেল ও সৈকতের রিসোর্ট থেকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দালালদের টেলিফোন নম্বর যোগাড় করে। এই হোটেল ও রিসোর্টে যৌন-কর্মকাণ্ডের জন্য রুম ভাড়া পাওয়া যায়। পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েই বিবিসি নিউজের দলটি এসব নম্বরে ফোন করে দালালদের কাছে জানতে চায় বিদেশিদের জন্য অল্পবয়সি রোহিঙ্গা মেয়ে পাওয়া যাবে কি না। এর উত্তরে টেলিফোনের ওপার থেকে এক দালাল জানায়–“অল্পবয়সি মেয়ে আছে, কিন্তু রোহিঙ্গা মেয়ে কেন খোঁজা হচ্ছে? ওরা তো খুব নোংরা”। আরও গভীরে গিয়ে দেখা গেল রোহিঙ্গা মেয়েদের সেখানে সবচাইতে সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। গণিকাবৃত্তির ক্ষেত্রেও তাঁরা সেখানে সবচাইতে নিচের সারিতে রয়েছে। বিবিসির দলটি দালালকে জানালো যত দ্রুত সম্ভব তাঁরা এসব মেয়েদের সঙ্গে রাত কাটাতে চায়। খুব দ্রুতই বিভিন্ন দালালদের কাছ থেকে রোহিঙ্গা মেয়েদের ছবি আসতে শুরু করল। যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছর। বলা হল ছবির মেয়েদের পছন্দ না-হলে আরও মেয়ে দেখানো সম্ভব। চাইলেই পাওয়া যাবে। এভাবে এত রোহিঙ্গা মেয়ে পাওয়া গেল, যা খুবই ভয়াবহ। দালালদের সঙ্গে কথাবার্তার রেকর্ডিং ও ভিডিও স্থানীয় পুলিশকেও দেওয়া হয়েছে। অভিযানের অংশ হিসেবে দলটি কক্সবাজারের ওই দালালকে ফোন করে। ছবিতে দেখা দুটো মেয়েকে রাত আটটায় শহরের একটি নামি হোটেলে পাঠাতে বলা হয়। ফাউন্ডেশন সেন্টিনেলের এক কর্মী ‘অনুবাদক হিসাবে হোটেলের বাইরে অপেক্ষা করছিল। হোটেলের কার পার্কে অপেক্ষা করছিল পুলিশ। রাত আটটার দিকে বেশ কিছু ফোন কলের পর একটি গাড়িতে করে ড্রাইভারের সঙ্গে ছবিতে দেখা মেয়ে দুটিকে পাঠানো হয়। বিদেশি ক্লায়েন্ট সেজে থাকা ব্যক্তিটি জানতে চায় আজ রাতের পরে আরও মেয়ে পাওয়া যাবে কি না। গাড়ির চালক সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। টাকা হস্তান্তরের পরই পুলিশ গাড়ির চালককে গ্রেপ্তার করে। মেয়ে দুটিকে উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। দারিদ্র আর গণিকাবৃত্তির জালে যেন এই মেয়ে দুটি আটকে গেছে। তাঁরা জানায় গণিকাবৃত্তি ছাড়া জীবন চালানো তাঁদের জন্য খুব কঠিন।
