জনশ্রুতি আছে যে, আজকের দড়াটানা জামে মসজিদ যে স্থানে অবস্থিত, অতীতে সেখানে ছিল গণিকালয় ও বাইজিখানা। কাপুড়িয়া পট্টি এলাকায় ছিল নামজাদা সব বাইজিদের বসতবাড়ি। এই বিশেষ আকর্ষণে একদা ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে জমিদার, মহাজন, মাড়োয়ারি বাবুরা ছুটে আসতেন এই প্রাচীন যশোর পৌরশহর জনপদে। বাবুবাজার, বাবুঘাট, মাড়োয়ারি মন্দির এই স্থানিক নামবাচক শব্দ আজও বহন করে চলেছে সেই প্রাচীন গণিকাবৃত্তির ইতিহাস। প্রাচীন এই গণিকাবৃত্তির ইতিহাস-ঐতিহ্য আর শিল্পের সঙ্গে কোনো মিল নেই আজকের গণিকাবৃত্তির। হয়তো-বা পরিবর্তনশীল এই সমাজের গণিকাবৃত্তির আধুনিক রূপান্তরের ফলেই শিল্প হারিয়েছে পুরোনো ধাঁচের এই সব গণিকালয়গুলি। হয়তো-বা পণ্যের সস্তা মূল্যই এই গণিকালয়গুলিকে আরও বেশি অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। তবুও ব্যাবসার সচেতনতা এবং সেই সঙ্গে ন্যূনতম আর্থিক সংগতি থাকার কারণে মাড়োয়ারি মন্দির গণিকালয়ের বাসিন্দারা স্ব-উদ্যোগে নিয়মিত পয়ঃনিষ্কাশন ও আনুষাঙ্গিকের ব্যবস্থা করলেও নিম্নশ্রেণির এই দুটি গণিকালয়ের (ঝালাইপট্টি ও বাবুবাজার)-তে নিয়মিত পয়ঃনিষ্কাশন স্বাস্থ্যকর রাখার কোনো ব্যবস্থাই তাঁরা নিতে পারে না। ডাক্তারী পরীক্ষাসহ কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি এখানে মানা হয় না। মুখে তাঁরা যাই বলুক না-কেন, ডাক্তার হয়তো-বা কদাচিৎ যায়ও কিন্তু সবকিছুই ‘ওকে’ হয়ে যায় সামান্য টাকায়। ফলে বছরের পর বছর ধরে এই গণিকালয়গুলি যে সমাজে মারাত্মক সব রোগের বীজ ছড়াচ্ছে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
কেমন আছে বাংলাদেশের যৌনকর্মীরা? বাংলাদেশে ‘গণিকাবৃত্তি’ বৈধ হলেও নানা কারণে উচ্ছেদ হয়েছে বেশ কিছু গণিকালয়। গণিকাপেশা নির্মূলের সদিচ্ছার জন্য নয়, অনেকক্ষেত্রেই উচ্ছেদের আসল কারণ জমি দখল। বাংলাদেশে যেমন বৈধ যৌনকর্মী আছেন প্রায় ১ লাখ, তেমনি অবৈধভাবে আছেন আরও তিন-চার লাখ। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরের মধ্যে মাদরীপুর, খুলনার ফুলতলা এবং টাঙ্গাইল মিলিয়ে মোট তিনটি গণিকালয় উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইল ছাড়া আরও দুটি এখন বহুতল মার্কেট। টাঙ্গাইলের রেজিস্টার্ড গণিকালয়ের যৌনকর্মী হাসি ডয়চে ভেলেক জানান, “আমাদের নির্মম নির্যাতন আর অত্যাচার করে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। আমাদের অনেকের নিজেদের জমি ও ঘর থাকার পরও আমরা সেখানে থাকতে পারিনি। পরে আদালতের রায়ে আমরা ফিরে আসতে পারলেও সবাই আসেনি। তাঁরা এখন দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। জানি না তাদের সন্তানরা কেমন আছে, কেমনভাবে চলছে তাদের জীবন।” হাসি বলেন, “আমরা ফিরে এলেও এখন আমাদের উপর পুলিশের নতুন নির্যাতন শুরু হয়েছে। পুলিশ হামলা চালায়, খদ্দের ধরার নামে চাঁদা নেয়। ওদিকে বাড়িওয়ালারাও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। ছোট্ট একটা রুমের একদিনের ভাড়া ৬০০ টাকা। তার উপর মাস্তানদের চাঁদা তো আছেই। তাই যৌনকর্মীদের অনেকেরই এখন পেটে ভাত নেই। কেউ কেউ ধার দেনা ও ঋণ করে চলছে।” টাঙ্গাইলের গণিকালয়কে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে যাঁরা আন্দোলন করেছেন, তাঁদের মধ্যে সবার আগে আসে মাহমুদা শেলির নাম। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমার মনে হচ্ছে, পুলিশ প্রশাসন এখন কৌশলে এই গণিকালয়টি উচ্ছেদ করতে চায়। তাই ক্লায়েন্টরা যাতে আসতে না পারে, সেজন্য তাঁরা নানাভাবে হয়রানি করে। ক্লায়েন্ট না-এলে যৌনকর্মীরা তাঁদের কাজ টিকিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি জানান, “এই যৌনপল্লিটি উচ্ছেদের পিছনে প্রভাবশালী মহলের হাত ছিল। তাঁদের টার্গেট ছিল এখানকার জমি দখল করা। তাই তাঁরা দু-ঘণ্টার মধ্যে যৌনপল্লিটি উচ্ছেদ করেছিল।”
নারায়নগঞ্জের টানবাজার এবং ঢাকার ইংলিশ রোডের গণিকালয়ও এক রাতের মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এই দুটি গণিকালয়ের যৌনকর্মীদেরও মারপিট ও নির্যাতন করে উচ্ছেদ করা হয়। প্রভাবশালীরা প্রশাসনের সহায়তায় এ কাজ করে। যৌনকর্মীদের আটক করে প্রিজন ভ্যানে ভবঘুরে কেন্দ্রে পাঠানো হলেও, তাঁরা শেষপর্যন্ত সেখানে থাকেননি। পুলিশও এঁদের উপর অত্যাচার করে, ভয় দেখিয়ে ওঁদের ভোগ করে, ধর্ষণ। করে। সেখান থেকে পালিয়ে তাঁদের অনেকেই এখন ভাসমান যৌনকর্মী।
জয়া শিকদার যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করা ‘অ্যাক্টিভিস্ট মুভমেন্ট’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রধান নির্বাহী। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ করা হলে তাঁদের ভাসমান না-হয়ে উপায় থাকে। তাঁদের বিকল্প পেশা নেই। ফলে দিন দিন ভাসমান যৌনকর্মীদের সংখ্যা বাড়ছে। তা ছাড়া ভাসমান যৌনকর্মীরা স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সুবিধা পর্যন্ত পায় না। ফলে তাঁরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়। তাঁদের সন্তানরাও দুর্বিষহ জীবনযাপন করে।”
বাংলাদেশে ‘গণিকাবৃত্তি’ অবৈধ নয়। প্রাপ্তবয়স্ক নারী, যাঁদের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি, তাঁরা স্বেচ্ছায় ঘোষণা দিয়ে এই পেশা বেছে নিতে পারেন। তবে রাষ্ট্র গণিকাবৃত্তি বন্ধে ব্যবস্থা নেবে। এখানে জোর করে কাউকে এই পেশায় নিয়োজিত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তা ছাড়া ১৮ বছরের নীচে কোনো নারী এই পেশা বেছে নিতে পারবেন না। তবে এই পেশা স্বেচ্ছায় বেছে নিতেও পুলিশকে ঘুস দিতে হয়। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার কমে অনুমতি মেলে না। সেক্স ওয়ার্কার্স নেটওয়ার্ক’-এর আরিফুর রহমান সবুজ ডয়চে ভেলেকে জানান, “আমাদের হিসাবে সারা দেশে ২৫,০০০ ভাসমান এবং যৌনপল্লিগুলোতে ৭০,০০০ বৈধ যৌনকর্মী আছেন।” তবে জয়া শিকদার মনে করেন, “বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে এই সংখ্যা পাঁচ লাখের কম হবে না।”
