রাজনীতিক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশেষ বাহিনী, পুলিশসহ সমাজের কথিত অভিজাত থেকে নিচুতলার সব শ্রেণির মানুষই এখানকার নিত্য অতিথি। এক প্রশ্নের জবাবে তারা জানায়, গত বছরখানিক ধরে তেমন কোনো উৎপাত নেই। কিন্তু তার আগে ২/৩ বছরে অত্যাচারের ঝড় বয়ে গেছে তাঁদের উপর দিয়ে। এমনও দিন গেছে তাঁদের যে, থালা-বাসন পর্যন্ত কেড়ে নিয়ে গেছে মাস্তানরা। যশোরের সব থেকে পুরাতন একটি দৈনিকের সম্পাদকের মেজো ছেলের উৎপাতের কথা বলতে গিয়ে তারা জানায়, এক সময় সে টাকা তত দিতই না, বরং মারার হুমকি দিত। অনুরূপ অভিযোগ আনে এই শহরের একটি আক্রমণাত্মক দৈনিকের একজন ক্রাইম রিপোর্টারের বিরুদ্ধে, পরে দৈনিকটির সম্পাদকের কান পর্যন্ত বিষয়টি পৌঁছোলে তিনি নাকি তাদের পাওনা ৫০ টাকা দিয়েছেন। এছাড়াও প্রায়ই সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতারকরা এখানে ভিড় করে। এই। সংবাদ সংগ্রহকালে প্রতিবেদক দেখতে পান কতিপয় সাংবাদিককে এই নিষিদ্ধ গলিতে আহ্বান করতে। শহর। ও শহরতলির অনেক মানুষের স্ত্রী হয়ে আছে এই গণিকারা। কথিত ওই স্বামীর উদ্দেশ্য একটাই—স্ত্রীর উপার্জিত অর্থ ভোগ করা। এ ধরনের স্বামীর মধ্যে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের প্রথম শ্রেণির নেতার ছেলের নামও শোনা যায়। বর্তমানে মাড়োয়ারি মন্দিরের সামনে স্যালভেশন আর্মির (নেদারল্যান্ডের একটি স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠান) একটি পরামর্শ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ডাক্তাররা নিয়মিত তাঁদের রক্তসহ আনুষঙ্গিক পরীক্ষা করে।
ব্রিটিশ যুগেরও আগে মোগল আমলে এই মাড়োয়ারি মন্দির এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধুমাত্র এখানেই না, শহরের গাড়িখানা রোডের পুরোনো পুলিশ ফাঁড়ির পিছনে ঝালাইপট্টি এলাকায়ও সেই সময়ে গড়ে ওঠে। গণিকালয়। তিন নম্বর গলির অতীত উল্লেখ করে তিনি জানান, এই বাড়ির মালিক মেরি এই পল্লির গণিকা ছিল, বয়স এখন তার ৬০, প্যারালাইসিস হয়ে বর্তমানে তিনি শয্যাশায়ী। এই মেরি বাড়ি কিনেছেন বুলি নামক আর-এক গণিকার কাছ থেকে, বৃদ্ধা বয়সে তিনি (বুলি) এই বাড়ি বিক্রি করে ভারতে চলে যান। শোনা যায় বুলি মারা গেছেন বেশ কিছুকাল আগে।
ঝালাইপট্টি ও বাবুবাজার গণিকালয় : যশোরের আরও দুটি গণিকালয়—ঝালাইপট্টি ও বাবুবাজার। ঝালাইপট্টি ও বাবুবাজারের দুটি করে চারটি গলি বা বাড়িতে মোট ৬৭টি ঘরে যৌনকর্মীর সংখ্যা রয়েছে ১৩৭ জন। ঘরওয়ালি আছে ৬৭ জন, চৌকিদার গার্ড আছে প্রায় ১৫ জন, এছাড়াও আছে অনেকের ২/১ জন করে ছেলে-মেয়ে, রয়েছে রাঁধুনি (মাসি)। গড়ে প্রায় ৩০০টি মুখের সরাসরি নির্ভরতা রয়েছে এই পেশার আয়ের উপর। পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল আছে অসংখ্য পরিবার। গণিকাদের অনেকের বাবা মার সংসারসহ এই ব্যাবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা পেশার মানুষের জীবন। সরেজমিনে দেখা গেছে, মাড়োয়ারি মন্দির গণিকালয়ের তুলনায় এই দুটি গণিকালয় অতিমাত্রায় নিম্নমানের। ক্লায়েন্ট আকৃষ্ট করার যোগ্যতার ভিত্তিতে এই সমস্ত গণিকালয়গুলি বিভাজিত হয় বিভিন্ন শ্রেণিতে। এই বিভাজনে মাড়োয়ারি মন্দির গণিকালয় চিহ্নিত হয় অভিজাত শ্রেণির গণিকালয় হিসাবে, আর ঝালাইপট্টি ও বাবুবাজার গণিকালয় চিহ্নিত হয় নিম্নশ্রেণির হিসাবে। মাড়োয়ারি মন্দির বাসিন্দাদের জন্য আছে একতালা দুইতলা পাকা ভবন, কয়েকটিতে আছে টালির ছাউনি, ভিতরে হার্ডবোর্ডের সিলিং। এসব ঘরগুলোর মধ্যে জৌলুস কম নয়। আছে রঙিন টেলিভিশন, ফ্রিজ, ফ্যান, পালঙ্ক, সোফা। বেশভূষায় পড়েছে স্যাটালাইটের প্রভাব, পরিধানে রয়েছে স্কার্ট, চোখে গগস, শরীরে দামি অর্নামেন্টস। অপরদিকে ঝালাইপট্টি ও বাবুবাজার গণিকালয়ের চিত্র করুণ। সারিবদ্ধ নিচু নিচু খুপড়ি ঘর, গোলপাতার ছাউনি, ভাঙাচোরা, চাটাইয়ের বেড়া, অনেক ঘরের দরজায় চটের আড়াল বা আচ্ছাদান। ভিতরে নেই কোনো আধুনিকতার বালাই। দিনেরবেলাতেও ঘরে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। এরই মাঝে টিমটিমে বিজলি বাতির স্বল্প আলোয় ঘরে বিরাজ করে এক ভৌতিক অবস্থা।
প্রবীণ পৌর কর্মকর্তা (অবঃ) চুড়িপট্টি নিবাসী দেওয়ান মোস্তফা আমান বলেন মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামল থেকেই যশোর শহরে চলে আসছে গণিকাবৃত্তি। ব্রিটিশ যুগে শহরের তিনটি স্থানে বর্তমান ইডেন মার্কেট ও শিল্প ভাণ্ডারের পিছনে গড়ে ওঠে প্রথম শ্রেণির গণিকালয়। কাঁঠালতলা গণিকালয়, হোটেল মিড টাউন ও মাড়োয়ারি মন্দিরের মাঝে মাড়োয়ারি বাবুদের প্রয়োজনে গড়ে ওঠে দ্বিতীয় শ্রেণির এবং ঝালাইপট্টির পুরোনো ছাগলহাটার দক্ষিণে গড়ে ওঠে তৃতীয় শ্রেণির গণিকালয়। শহরের অভিজাত শ্রেণির মানুষরা যেত কাঁঠালতলা গণিকালয়ে। ইতিহাস আছে বর্তমান জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের বাংলো ছিল তৎকালীন জমিদারদের বাইজিখানা। এই বাইজিখানায় সপ্তাহে দু-দিন কলকাতা থেকে ৮ ঘোড়ার ফিটন গাড়িতে চড়ে আসতেন জমিদার ব্যারিস্টার মন্মথনাথ রায় ও তাঁর সঙ্গীরা। শনিবার আধা বেলা এবং রবিবার সারাদিন ফুর্তি করে তিনি পুনরায় কলকাতায় চলে যেতেন। সে সময়ে ওই বাইজিখানায় মেয়ে সাপ্লাই দেওয়া হত চাঁচড়া রায়পাড়ার ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। জানা যায় কখনও টাকা দিয়ে কখনও জোরপূর্বক ওই মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হত বাইজিখানায়। যে পরিবারের এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
