বাংলাদেশের জনৈক সাংসদ শামীম ওসমান বলেন, “এই গণিকাপল্লিতে ১১,০০০ মেয়ে ছিল, যাঁদের বয়স ৯ থেকে ১১ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশের অনেক বড়ড়া বড়ো লোক, যাঁরা আজকে টিভি টকশোতে কথা বলেন বা বড়ো বড়ো পত্রিকার সঙ্গে জড়িত সুশীল সমাজ। এখান থেকে প্রতি মাসে ৩০০ করে মেয়ে নিয়ে পুনর্বাসন দেখাত। পুনর্বাসন দেখিয়ে মাথাপিছু ৫০,০০০ টাকা নিত। সাংসদ দাবি করেছেন, টানবাজার গণিকাপল্লি থেকে থানা পেত প্রতিদিন ৪৫ লাখ টাকা। ৪৫ লাখ!
গাঙ্গিনাপাড় পতিতালয় : গাঙ্গিনাপাড় গণিকালয় ময়মনসিংহ রেলস্টেশন থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরে। ভবনের উপরে বিশাল সাইনবোর্ডে লেখা—“আসুন, এইডস থেকে বাঁচুন”। নাজমা বোডিং’ নামে একটা গণিকালয়। সরকার অনুমোদিত গণিকালয়গুলির একটি হল গাঙ্গিনাপাড়। ৪০,০০০ টাকায় মিলে যায় রেজিস্ট্রেশন। দুই পুলিশ কর্মকর্তার গ্রিন সিগন্যাল আর টাকা দিলেই মেলে যৌনপেশার রেজিস্ট্রেশন নম্বর। এখানে আনুমানিক ৪০ জন সর্দারনির অধীনে ৪০০ থেকে ৫০০ মেয়ে যৌনপেশায় যুক্ত আছে। যৌনকর্মীদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ভবনে ছোটো ছোটো নিজস্ব ঘর। এক একটা ঘরের ভাড়া ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা। ঘরগুলি এক-একজনের নামে পরিচিতি। ঘোট ঘোট এসব রুম সর্দারনিরা দৈনিক ভিত্তিক ভাড়া নিয়ে থাকেন। ঘরের মূল মালিককে দেওয়া হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। বেশির ভাগ সর্দারনী আবার ভাড়া দেন নিয়ন্ত্রণে থাকা গণিকাদের কাছে। তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয় দৈনিক ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। কোনো-কোনো ঘরে টাঙানো রয়েছে গণিকার বাঁধাই করা বড়ো ছবি। ময়মনসিংহের এই গণিকালয়ে কিশোর-যুবকদের ক্লায়েন্টদের ক্রমাগত বৃদ্ধি লক্ষণীয়। প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক ক্লায়েন্ট এই কিশোর-যুবকরাই। এখানে কিশোরী গণিকাদের প্রচুর চাহিদা। ক্লায়েন্টদের পছন্দের তালিকায় এইসব কিশোরীরাই। রাত ১১টা পর্যন্ত আসা-যাওয়া চলে। তারপর বন্ধ হয়ে যায় গণিকালয়ের প্রধান ফটক। ভিতরে চলে যৌনপ্রমোদ। সেখানে পাহারায় থাকে বেতনভোগী দারোয়ান। শহরের প্রাণকেন্দ্র রমেশ সেন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এই গণিকালয়ের বয়স প্রায় ১৫০ বছর।
২০০১ সাল থেকে গণিকালয় নিয়ন্ত্রণে ‘শুকতারা কল্যাণ সংস্থা’ নামে একটি সংগঠন আছে। এই সংগঠনে আছে ১১ সদস্যের নির্বাচিত কমিটি। ২ বছর পরপর যৌনকর্মীদের সরাসরি ভোটে এ কমিটি নির্বাচন করা হয়। এই সংগঠনের সভাপতি লাভলি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই পল্লিতে পেশাগত কারণে বসবাস করে। সাধারণ সম্পাদক রুমানা আক্তার। কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে লাভলি বলেন—গণিকালয়ের যৌনকর্মীদের অধিকার আদায়ে তাঁরা কঠোর ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেন। কাউকে ধরে নিলে কিংবা নতুন মেয়ে আনলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা তাঁরাই গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, মূলত নেত্রীদের দ্বারাই সাধারণ যৌনকর্মীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হচ্ছে। অপরদিকে নেত্রীরা টাকার কুমির বনে গেছে। তিনি বলেন, আগে কোনো সংস্থা বা কমিটি না-থাকায় যৌনকর্মীরা ছিলেন অসহায়। এখন সময় পাল্টেছে। নিজেদের পেশাকে করেছি নিরাপদ। এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার গণিকালয়ের কাজকর্ম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেষপর্যন্ত তা কার্যকর করতে পারেনি প্রশাসন। সভাপতি লাভলি বলেন, আমরা সেক্স করে জীবিকা নির্বাহ করছি। যতদিন ভালো লাগবে এ পেশায় থাকব। এ সকল প্রভাবশালী সর্দারনিদের এই শহরে একাধিক ভাড়া বাড়ি আছে। এঁরা আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। তারপরও এ ব্যাবসাকে পুঁজি করে রেখেছেন।
সন্ধ্যাবাজার গণিকালয় : সিলেটের ধোপাদিঘীর পাড় এলাকায় সন্ধ্যাবাজার গণিকালয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘পৌরবিপণি’ নামে পরিচিত। এখানেই একটি আবাসিক হোটেলের মধ্যেই আছে একটি মিনি গণিকালয়। নিচে মসজিদ, উপরে গণিকালয় হওয়ার কারণে জায়গাটি বিশেষভাবে আলোচিত। এই কারণেই গণিকালয়টি নজরে আসার উচ্ছেদও করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এঁরা জায়গাটির আশেপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়।
এ তো গেল কিছু রেজিস্টার্ড গণিকালয়গুলির কথা। এছাড়াও বাংলাদেশে প্রায় হাজারখানেক গণিকালয় আছে। রাস্তার পাশে যে আবাসিক হোটেলটি দেখতে পাচ্ছেন, সেটিও গণিকালয় হতে পারে। পেতে পারেন মাত্র ৩০০/৪০০ টাকা পারিশ্রমিকের গণিকাও।
মাড়োয়ারি মন্দির গণিকালয় : মাড়োয়ারি মন্দির এলাকার নিষিদ্ধ তিনটি গণিকালয়। মাড়োয়ারি মন্দির এলাকার এক নম্বর গলির মালিক ডাঃ ইয়াকুব তাঁর ২৪টি ঘর থেকে ভাড়া বাবদ দিন ১০০ টাকা হারে মাসে ৭২ হাজার টাকা আয় করে। দুই নম্বর গলির মালিক দুই সহোদরা কণা ও কাজল তাদের ১৬টি ঘর থেকে মাসে ভাড়া বাবদ আদায় করে ৪৮ হাজার টাকা। তিন নম্বর গলির মালিক একসময়ের যৌনকর্মী মেরি তাঁর দ্বিতল বাড়ির ২৭টি ঘর থেকে দিন ৪০ টাকা হারে মাসে ৩২ হাজার টাকা ভাড়া বাবদ আয় করে। ঘরওয়ালিদের ঘরের পজিশন বাবদ এককালীন বাড়িওয়ালাকে দিতে হয় ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এই গণিকালয়ের ঘরওয়ালিদের আছে আর-এক নাম সর্দারনি’। শারীরিক আবেদন হারানোর কারণে এঁরা এখন আর নিজ দেহ বিক্রি করতে পারে না। ফলে জীবিকার জন্য ভাড়াটিয়া রাখে ২/৩ বা তারও অধিক যৌনকর্মীকে। এই যৌনকর্মীরা ৩ বেলা খাবার ও ঘরের জন্য ভাড়া দেয় দিন প্রতি ১০০ টাকা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু কিছু সর্দারনির অধীনে আছে ১২/১৩ বছরের অল্প বয়সি মেয়ে, এখানে যাঁরা ছুকড়ি’ হিসাবে চিহ্নিত হয়। এরা যে অর্থ আয় করে তার পুরোটাই নিয়ে নেয় সর্দারনি। বিনিময়ে তাদের আশ্রয়, খাবার, পরিধান ও চিকিৎসাসহ যাবতীয় দায়িত্ব নেয়। প্রতিদিন এই যৌনকর্মীদের মাথা প্রতি নাইটগার্ডকে দিতে হয় ১০ টাকা, ভিতরে নিয়মিত পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য দিতে হয় চাঁদা। দিনভর কঠিন যন্ত্রণার পরও রাতে একটু শান্তিতে ঘুমোনোর কোন সুযোগ নেই তাঁদের। ছোট্ট ঘরে একটি খাটে সর্দারিনীসহ ৩/৪ জনকে ঘুমাতে হয় কোনোরকমে। সকালে ল্যাট্রিনের জন্য লাইন, স্নানের জন্য অপেক্ষা, দিনভর নানা পুরুষের মনোরঞ্জন, বিকৃত রুচিসমপন্ন মানুষের বিচিত্র উৎপাত সব কিছুকেই এদের আলিঙ্গন করতে হয় হাসিমুখে। কারণ, এই হাসিই তাদের বিজ্ঞাপন। পুঁজি শরীর।
