দৌলতদিয়া গণিকালয়টি সরকারি অনুমোদিত হলেও বিভিন্ন সময় এখানে আইন বহির্ভুত কাজকর্ম চলছে। যেমন, বেআইনিভাবে জোরপূর্বক কোনো মহিলাকে যৌনপেশায় বাধ্য করা বা নারী পাচারের মতো অভিযোগ রয়েছে। গণিকালয়ের অভ্যন্তরে নানা রকম মাদকদ্রব্য বিক্রি ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ সেবন, অপ্রাপ্তবয়স্ক যৌনকর্মী নিয়োগ, তাঁদের উপর শারীরিক নির্যাতনসহ অনেক অমানবিক ও বেআইনি কার্যকর্ম সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ আছে। বিভিন্ন এনজিও এবং সামাজিক সংগঠনরা মনে করেন যৌনকর্মীরা এখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে এবং অনেক সময় বিভিন্নভাবে তাঁদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। দৌলতদিয়া গণিকাপল্লির গণিকাদের পারিশ্রমিক প্রতি ঘণ্টায় ১০০ টাকা থেকে শুরু। দরকষাকষিও চলে।
দীর্ঘ ৪৭ বছর পর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া বর্তমানে নতুন নামে পরিচিত হচ্ছে সরকারিভাবে। দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হাসিনা সরকার নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে একটি গেজেট প্রকাশ করেছে। নাম পরিবর্তনের কারণ গণিকালয় তকমা থাকায় এই অঞ্চলের বসবাসকারী গণিকাদের ছেলেমেয়েদের কোনো স্কুলে ভর্তি নিত না। ফলে তারা পড়াশোনার কোনো সুযোগ পেত না। উক্ত গেজেটবলে ‘দৌলতদিয়া গণিকালয়’ পরিবর্তে ‘দৌলতদিয়া বাজার পূর্বপাড়া’ বলে পরিচিত হয়েছে। বর্তমানে এই গণিকাপল্লির সন্তানেরা পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। স্থানীয় স্কুলগুলোও খুশি।
কান্দাপাড়া গণিকালয় : কান্দাপাড়া গণিকালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন গণিকালয়। প্রায় ২০০ বছর আগে এই গণিকালয়ের গোড়াপত্তন হয়, দেশভাগের আগে অবিভক্ত ভারতে অবস্থিত ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে গণিকালয়টি জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়। উচ্ছেদের আগে পর্যন্ত এই গণিকালয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম গণিকালয় হিসাবে বিখ্যাত ছিল। কান্দাপাড়া গণিকালয়টি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলায় অবস্থিত। কান্দাপাড়া গণিকালয়ে মোট ঘর আছে প্রায় ৮০০টি। এখানে প্রায় ৯০০ জন যৌনকর্মী বসবাস করেন। এই গণিকালয়কে ব্যবহার করে কোনো মহিলাকে বসবাস ও যৌনপেশা হিসেবে গ্রহণ করতে হলে সেই মহিলাকে আদালতে উপস্থিত হয়ে একটি হলফনামা জমা দিতে হয়। এই মর্মে যে, তাঁরা তাঁদের নিজস্ব পছন্দ ও জোরজবরদস্তি ছাড়াই যৌনপেশাকে বেছে নিয়েছে এবং একই সঙ্গে এটাও উল্লেখ করতে হবে যে, তাঁরা অন্য কোনো পেশা গ্রহণ করতে বা খুঁজে পেতে অসমর্থ। কান্দাপাড়া গণিকালয়ে বৈধ যৌনকর্মীর সংখ্যা ৯০০ জন বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা অনেকগুণ বেশি। ২০১৪ সালের শেষের দিকে ‘Bangladesh National Women Lawyers Association’ যৌনকর্মীদের উচ্ছেদকে অবৈধ কর্মকাণ্ড বলে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে এক মামলা দায়ের করে। আদালত তাঁদের আবেদনের পক্ষে রায় দেন। ফলে কান্দাপাড়ার যৌনকর্মীরা তাঁদের পুরোনো আবাস ও পেশা ফিরে পায়। বর্তমানে কান্দাপাড়া গণিকালয়টি ২ মিটার দেয়াল। দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচিল পরিবৃত্তের ভিতরে মূল গণিকালয়টি অবস্থিত। মূল গণিকালয়ের ভিতরে সরু সরু রাস্তা আছে, আর রাস্তার পাশ দিয়ে বিভিন্ন দোকানপত্র আছে। জার্মান আলোকচিত্রশিল্পী সান্দ্রা হোইন কান্দাপাড়া গণিকালয়ে আসেন এবং এখানকার জীবনমান ও গণিকালয়ের অবস্থা নিয়ে ছবি তোলেন। ছবিগুলো প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলের কাছে কান্দাপাড়া গণিকালয়ের দুরবস্থার চিত্র প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যৌন পরিসেবা নিতে এলেও ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে কান্দাপাড়া গণিকালয়কে বিভিন্ন সময় হামলা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বাংলাদেশে সামাজিক ভাবে গণিকা ঘৃণ্য চোখে দেখা হয়।
টানবাজার গণিকালয় : টানবাজার গণিকালয় বাংলাদেশের আর-একটি গণিকালয়। ধারণা করা হয় যে, প্রায় ৪০০ বছর আগে অর্থাৎ অবিভক্ত ভারত-ভূখণ্ডে এই গণিকালয়ের যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালে গণিকালয়টি উচ্ছেদ করে দেওয়ার আগে এটি ছিল দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো গণিকালয়গুলির মধ্যে একটি। টানবাজার গণিকালয় নারায়ণগঞ্জ জেলার টানবাজার পার্কের পাশে কুটিপাড়ায় অবস্থিত ছিল। টানবাজার মূলত রং, সুতো ও কেমিক্যাল পণ্যের ব্যাবসার জন্য বিখ্যাত। এই গণিকালয়ে যাওয়ার জন্য দুটি রাস্তা ছিল। একটি ‘আশা’ ও ‘মাশা’ নামের সিনেমা হলের পাশ দিয়ে এবং অন্যটি টানবাজার মসজিদের পাশ দিয়ে। প্রায় ৩ একর জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছিল এই গণিকালয়টি। টানবাজার গণিকালয় বর্তমানে মোহাম্মদ কমপ্লেক্স’-এ এসেছে। তবে পুরোনো গণিকালয়ের ৪/৫ তলা কিছু ভবন এখনও আছে। এখান থেকে যৌনকর্মীরা গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
টানবাজার গণিকালয়ে প্রায় ২০০০টি ঘরে ৩৫০০ জনের বেশি যৌনকর্মী যৌনপেশার সঙ্গে জড়িত ছিল। যাঁদের অনেকেই বংশানুক্রমে সেখানে বসবাস করত। প্রায় ৪০০ বছর ধরে সেখানে যৌনপেশাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ড়া গণিকালয়টি গড়ে উঠেছিল। ১৯৯৯ সালে সাধারণ একশ্রেণির জনগণ ও পুলিশ একযোগে আচমকা মধ্যরাতে যৌনকর্মীদের উপর হামলা করে এবং তাঁদের সেখান থেকে বের করে দেয়। যৌনকর্মীদের আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য যে মন্দির ছিল, সেই ‘মা ফাতিমা মন্দির’ও ভেঙে ফেলা হয়। কোনোরকম পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়। এর প্রতিবাদে গোটা বাংলাদেশে বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। গণিকালয় রক্ষা আন্দোলনে সেই সময় যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম সর্দারনি ছিলেন রিতা খানম।
