একুশ বর্ষীয়া মায়া নামে একজন নেপালি যৌনকর্মীর গল্প বলি। নেপালের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় খানারে যেখান থেকে তিনি প্রায় ৫ কিলোমিটার (৩.১০ মাইল) শহর ইটাহাড়িতে এক ক্লায়েন্টের সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ইটাহাড়ি, এটি নেপাল এবং ভারতকে সংযোগকারী একটি হাইওয়ে, যা একটি উন্মুক্ত সীমান্ত ভাগ, এটি যৌন-ব্যাবসার জন্য একটি যথার্থ শহর। শহরটি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে একটি জনপ্রিয় গন্তব্য, যাঁরা যৌনকর্মী ভাড়া নিতে চায়।
মায়া জানায় যে, ১৪ বছর বয়স থেকে তিনি এই শহরের যৌনশিল্পে কাজ করছে। ২০১৩ সালে, তিনি যে হোটেলটিতে কাজ করেছিলেন সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল এমন একজনকে বিয়ে করেছিলেন। তখন তিনি যৌনপেশা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। লোকটি তাঁর বা অন্য কোনও যৌনকর্মীর ক্লায়েন্ট ছিল না। তবে তাঁর মেয়ে স্বস্তিকার যখন তিন মাস বয়স তখন স্বামী মায়াকে ত্যাগ করল। মায়া তখন যৌনশিল্পে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি দিনের বেলা ক্লায়েন্টদের সঙ্গে দেখা করেন, যখন কোনও প্রতিবেশী স্বস্তিকার দেখাশোনা করে। কারণ সে রাতে বাচ্চার জন্য সময় দেয়। সে এক সপ্তাহে ২,০০০ রুপি (১৮.৭১ ডলার) থেকে ৫০০০ টাকা (৪৬.৭৭ ডলার)-এর মধ্যে আয় করেন। এটি কোনো বাড়িতে বা হোটেল ক্লিনারের উপার্জনের চেয়ে অনেক বেশি। মাত্র অষ্টম শ্রেণির পড়াশোনা নিয়ে মায়া, যিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে ভাড়া ঘরে থাকে। সে বলে। তাঁর কাছে অন্য কিছু উপায় নেই। মায়া বলে, “এই পেশা আমার পছন্দ হওয়ার কারণে নয়, তবে আমি এই কাজটি করতে বাধ্য হই।” কাঠমান্ডু আসার দু-বছর পরে এক বন্ধু তাঁকে বলেছিল একটি কারখানায় কাজ করলে সে বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারবে। মায়া যখন এই পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হয়ে গেল, বন্ধুটি তাঁকে কোনো কারখানায় নয়, ইটাহারির এক হোটেলে নিয়ে গেল এবং তাঁকে সেখানে রেখে গেল। এমতাবস্থায় মায়া খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। জায়গাটি নতুন ছিল এবং কাউকে চিনত না। এখানে তাঁকে কী করতে কী তাঁর কাজ সে কিছুই জানত না। এদিকে হোটেল মালিক তো মায়াকে কী করতে পারে তার অপশন দিল। (১) হোটেলটি ছেড়ে দিতে হবে, (২) হোটেলে থেকে ফাইফরমাস খাটতে হবে এবং (৩) যৌনকর্মী হিসাবে কাজ করতে হবে। মোদ্দা কথা বসে খাওয়া চলবে না। দুই সপ্তাহ পর মায়া যৌনকর্মী হিসাবে কাজ করতে রাজি হয়ে যায়। তিনটি অপশনের মধ্যে যে গণিকাবৃত্তিতেই ফায়দা বেশি, সেটা ১৪ বর্ষীয় মায়ার বুঝে নিতে বিলম্ব হয়নি। তরুণ কিশোর ক্লায়েন্টদের কাছে সে খুব জনপ্রিয় ছিল। অনেক পুরুষ তাঁর সঙ্গ পাওয়ার আশায় তালিকাবদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করত। ওই হোটেলটিতে আরও ৫ জন যৌনকর্মী ছিলেন। তবে তাঁদের সকলেরই বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। হোটেল কোনো গণিকালয় নয়–এটি সাময়িকভাবে থাকার জন্য একটি আদর্শ জায়গা। তবে যে ঘরে ঘুমানো এবং খাওয়ার জন্য খাবার আছে, সেখানকার সাধারণ পরিসেবাগুলি ছাড়াও হোটেলটি যৌনকর্মীও সরবরাহ করত।
যৌন পাচার ও জোরপূর্বক গণিকাবৃত্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য বিশ্বব্যাপী যৌন-বাণিজ্যকে নিন্দা করা হয়েছে। তবে নেপালের একটি বড়ো যৌন পরিবহন কেন্দ্র ইটাহারিতে। এই বাণিজ্যটি বাড়ছে, কারণ অল্প শিক্ষায় শিক্ষিত অল্পবয়সি মেয়েরা এই পেশা বেছে নিয়েছে। নেপালে যৌন-বাণিজ্য আইন নয়, তাই এটি অবৈধ বা আইনিও নয়। তবুও এই পেশা সমৃদ্ধ হচ্ছে, বিশেষ করে কাঠমান্ডু, পোখারা, সুনসারি এবং কৈলালিতে। নারায়ণ প্রসাদ কাফলে বলেছেন, নেপালে যৌন-বাণিজ্যের বিষয়ে কোনো জাতীয় সমীক্ষা হয়নি, তবে জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের ২০১১ সালের এক অনুমান অনুযায়ী দেশে মহিলা যৌনকর্মীর সংখ্যা ২৬,৫০০-এরও বেশি হয়ে গেছে। ২০১০ সালে সুইস ত্রাণ সংস্থা টেরে ডেস হোমস দ্বারা পরিচালিত আরেক জরিপে অনুমান করা হয়েছে যে ১১,০০০ থেকে ১৩,০০০-এর মধ্যে কিশোরী ও যুবতীরা কাঠমান্ডু উপত্যকায় বিনোদন শিল্পে কাজ করছিল। যৌন-বাণিজ্য সাধারণত ভালো অর্থ প্রদান করে। অনেকের ধারণা যৌনকর্মীর সংখ্যা আরও। বাড়তে থাকবে। কাঠমান্ডুতে অবস্থিত যৌনকর্মী ফেডারেশনের জাগৃতি মহিলা মহাসংঘের সভাপতি বিজয়া কালাকাল মায়ার মতো বাণিজ্যের অনেক মেয়ে এবং যুবতী মহিলারা সমস্যাগ্রস্ত ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসে। মায়া বলেছেন যে, তাঁর বাবা-মা আলাদা হয়ে যাওয়ার পরে তিনি ১২ বছর বয়সে পশ্চিম নেপালের ডাঙ জেলায় নিজের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তিনি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি এক হোটেলে ডিশ ওয়াশার হিসাবে কাজ পেয়েছিলেন এবং মাসে মাসে প্রায় ৩০০ রুপি (২.৮১ ডলার) আয় করেছিলেন। ইটাহারি সংগঠন মহিলা সহযোগী সামুহের সভাপতি বিমল মল্লা ঠাকুরি বলেছেন—মেয়েরা ১২ বছরেরও কম বয়সি। বস্তুত নেপালি মেয়েরা ভারতীয় ক্লায়েন্টদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কিছু ক্লায়েন্ট এক রাতের জন্য ২০,০০০ টাকা (১৮৭.০৭ ডলার) পর্যন্ত নেপালি গণিকাদের দিয়ে থাকে।
(১২) গ্রিস : প্রাচীন গ্রিসের একটি সাধারণ দিক ছিল গণিকাবৃত্তি। গ্রিসের গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং বিশেষত বহু বন্দরগুলিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গণিকা যৌনপেশায় নিযুক্ত ছিল এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে উপস্থাপন করত। এ পেশায় কোনো গোপনীয়তার ব্যাপার ছিল না। শহরগুলি গণিকালরের নিন্দা করত না বা ঘৃণার চোখে দেখত না। উপরন্তু তাঁরা যাতে ঠিকঠাকভাবে পেশাটি চালিয়ে যেতে পারে তার জন্য রাষ্ট্র কিছু প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করেছিল। গ্রিসের গণিকাবৃত্তিতে নারী-পুরুষ উভয় আলাদাভাবে জড়িত। প্রধানত পুরুষ ক্লায়েন্টেদের জন্য সকল বয়সের মহিলারা এবং যুবকেরা গণিকা ছিল। একই সঙ্গে অবশ্য মুক্ত মহিলাদের সঙ্গে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কগুলি কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হয়েছিল। ব্যভিচারের ক্ষেত্রে ধরা পড়লে অপরাধীকে হত্যা করার আইনি অধিকার ছিল। ধর্ষণের শাস্তিও একইরকম ছিল। পুরুষের জন্য বিবাহের গড় বয়স ছিল ৩০ বছর বয়স, অল্প বয়সি এথেনিয়ান দাস বা গণিকাদের কাছে না-গিয়ে যৌন-সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইলে তার কোনো বিকল্প ছিল না।
