পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই নারীবিরোধী পুরুষেরা ‘পুরুষরক্ষা সংগঠন’, ‘পুরুষাধিকার সংগঠন’ ইত্যাদি গড়ে তুলেছে। এসব সংগঠন নারীবিরোধিতা, নারীবিদ্বেষ, নারীঘৃণা প্রচার করতে সারাক্ষণই ব্যস্ত। আমার খুব ভালো লাগে, যখন দেখি পুরুষেরা ‘নারী দিবস’ পালন করছে, নারীর অধিকারের পক্ষে পথে নামছে। এই পুরুষদের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু আজ নারী দিবসে আমার একান্ত চাওয়া, এই পুরুষদের সংখ্যাটা বাড়ুক। এই সংখ্যাটা বাড়লেই সমাজে পরিবর্তন আসবে, আসতে বাধ্য। যে পুরুষেরা নারীকে ধর্ষণ করে, খুন করে, তারা আজ প্রতিজ্ঞা করুক আজ থেকে কোনও নারীকে তারা ধর্ষণ করবে না বা খুন করবে না। যে পুরুষেরা নারীকে নারী বলে নির্যাতন করে, তারা আজ প্রতিজ্ঞা করুক নারীকে আর নির্যাতন করবে না। যে পুরুষেরা যৌন হেনস্থা করে, তারা আজ থেকে বন্ধ করুক যৌন হেনস্থা। আজ থেকে পুরুষ আর নারীর সংসারের কাজ, নিজেদের সন্তান-পালন, নিজেরা মিলে ঝিলে করুক। আজ থেকে বাইরের দুনিয়ার কাজ নারী-পুরুষ উভয়ে করুক, স্বনির্ভর আর পরনির্ভরের সংসারের বদলে সংসার হয়ে উঠুক দু’জন স্বনির্ভর মানুষের সংসার। আজ থেকে নারী আর পুরুষের সমতা আসুক সংবিধানে, রাষ্ট্রে, আইনে, সমাজে, পরিবারে, অফিসে, আদালতে, রাস্তা-ঘাটে, বাসে, ট্রেনে, জাহাজে, লঞ্চে সর্বত্র। নারী পুরুষের মধ্যে গড়ে উঠুক সত্যিকারের বন্ধুতা। প্রভু-দাসির সম্পর্কটা, উঁচু-নিচুর সম্পর্কটা সম্পূর্ণ নির্মূল হোক।
দু’দিন আগে কিছু আফগান পুরুষ নীল বোরখা পরে, হাতে ব্যানার নিয়ে, কাবুলের রাস্তায় হেঁটেছে। তারা নারী নির্যাতন বন্ধ হোক চায়। কী চমৎকার এই দৃশ্য! নারী- নির্যাতন বন্ধ করার জন্য পুরুষের মিছেলের দৃশ্য, নারীর মিছিলের দৃশ্যের চেয়ে, বেশি সুন্দর, বেশি যৌক্তিক, বেশি মানবিক। অত্যাচারের বিরুদ্ধে অত্যাচারিত গোষ্ঠির রুখে দাঁড়ানোর চেয়ে অত্যাচারী গোষ্ঠীর রুখে দাঁড়ানোটা জরুরি। কাবুলের রাস্তায় মাত্র পনেরো-কুড়িজন আফগান ছেলে নেমেছে। এই সংখ্যাটা দিন দিন বাড়ুক। রাস্তার পুরুষেরা নারী নির্যাতন বন্ধ করার জন্য পুরুষের উদ্যোগ দেখুক, শিখুক। এই দৃশ্য টিভিতে দেখাক। ইন্টারনেটে ছেয়ে যাক। লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখুক, শিখুক।
পাশ্চাত্যের পুরুষেরা মেয়েদের জুতো পরে রাস্তায় হাঁটে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘পুট ইওরসেল্ফ ইন মাই সুজ’। মানে, আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করো। তারা আক্ষরিক অর্থে প্রচলিত বাক্যটি নিয়েছে। সত্যি সত্যি পায়ে মেয়েদের জুতো পরে, এক মাইল পর্যন্ত হাঁটে। এই হাঁটার পেছনে উদ্দেশ্য হলো, মেয়েদের বিরুদ্ধে যত যৌন-হেনস্থা-নির্যাতন পুরুষেরা করে, সেসব বন্ধ হোক, নারী-পুরুষের মধ্যে যত বৈষম্য আছে, সব দূর হোক। শুধু মেয়েদের হাই-হিল পরে হাঁটা নয়, পুরুষরা তুরস্কে, ভারতে, মেয়েদের স্কার্ট পরে মেয়েদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। নারী-পুরুষের সমানাধিকারে বিশ্বাস করা এই সচেতন পুরুষদের সংখ্যাটা লক্ষাধিক হোক। কোটি ছাড়িয়ে যাক। এবারের ‘নারী দিবসে’ এটিই আমার আশা, আমার স্বপ্ন।
অভিজিৎকে যেভাবে চিনি
অভিজিৎ এর সঙ্গে আমার পরিচয় আজ থেকে পনেরো-ষোলো বছর আগে। অভিজিৎ তখন সিঙ্গাপুরে থাকতেন। বেশ কয়েকদিনের আলাপে এবং ওঁর বেশ কিছু ব্লগ পড়ে আমি বুঝি যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, বিবর্তন, দর্শন, ধর্ম, কুসংস্কার নিয়ে অভিজিৎ আর আমার বিশ্বাসের মধ্যে কোনও অমিল নেই। আমরা মূলত একই আদর্শের মানুষ। অভিজিৎ আমার লেখা বই আগেই পড়েছেন, সুতরাং নারীবাদ, মানববাদ এবং অস্তিত্ববাদে আমার বিশ্বাসের কথা তিনি জানতেন। মুক্তমনা নামে সবে একটা ব্লগ খুলেছেন তখন। মুক্তমনার জন্মটা একেবারে আমার চোখের সামনে। মুক্তচিন্তায় আর যুক্তিবাদে বিশ্বাসী যে কোনও মানুষই তাঁদের মত প্রকাশ করতে পারবেন মুক্তমনায়। এর চেয়ে চমৎকার ঘটনা আর কী হতে পারে, বিশেষ করে আমার কাছে, যার বাক স্বাধীনতা প্রায় নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের প্রকাশকরা বই ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বই আজ বেরোয় তো বাংলাদেশে পরদিন সে বই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর থেকেই দেশের সমস্ত পত্রপত্রিকা আমার লেখা ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছে। তারা কি আমাকে ভুলে গিয়েছে, না, ভুলে যায়নি, ভুলে গেলে আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতেও ভুলে যেত, ও কিন্তু ভোলেনি। আমার মত অন্য অনেকের মতের চেয়ে ভিন্ন। এ কারণে আমাকে জীবন দিয়ে পোহাতে হয়েছে দুর্ভোগ। অভিজিতের মুক্তমনা আমার মত প্রকাশের জন্য ছিল খুব প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম। যে কথা আমি কোথাও বলতে পারিনি, সবসময় জানতাম সে কথা বলার জন্য একটি মাত্র জায়গা যদি কোথাও থাকে, সে মুক্তমনা। বিস্মিত আমি লক্ষ্য করি, আমি একা নই। অভিজিৎও একা নন। আমাদের মতের সঙ্গে আরও অনেক সাহসী উজ্জ্বল তরুণ-তরুণী একমত। সবাই বাঙালি। বেশির ভাগই বাঙালি-মুসলিম পরিবারের, কিন্তু ধর্মমুক্ত। আমি যে কী ভীষণ উত্তেজিত এবং উচ্ছ্বসিত ছিলাম মুক্তমনা নিয়ে! প্রগতিশীল কারও সঙ্গে দেখা হলে মুক্তমনার লেখাগুলো পড়তে এবং আলোচনায় অংশ নিতে অনুরোধ করতাম। পৃথিবীর অনেক মানুষের অনেক মতই অন্য অনেকের মতের চেয়ে ভিন্ন। বিভিন্ন বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের বিভিন্ন মত প্রকাশ চলতে লাগলো মুক্তমনায়। মুক্তমনা দিন দিন সমৃদ্ধ হতে থাকে। বিস্তৃত হতে থাকে। একটা অশিক্ষিত মৌলবাদী মানুষের দেশ আমার দেশ — এই ভাবনাটি আমাকে মাথা নত করিয়েছিল, অভিজিতের ‘মুক্তমনা’ আমার নতমস্তক উঁচু করিয়েছে। ওই মুক্তমনার ব্লগগুলো, বিজ্ঞান আর দর্শন নিয়ে আলোচনাগুলো মানুষকে পড়তে দিয়ে আমি বলতে পেরেছি, আমার দেশেও শিক্ষিত সচেতন মানুষ আছেন, বুদ্ধিজীবী আছেন, বিজ্ঞানী আছেন, দার্শনিক আছেন, ধর্মমুক্ত, কুসংস্কারমুক্ত, চিন্তক, ভাবুক আছেন। ওই সময় ইংরেজিতে লেখা হতো ব্লগ। পরে পাশাপাশা বাংলা শুরু হল। ধীরে ধীরে লক্ষ্য করেছি, বাঙালি ছাড়াও ভিনভাষী বিজ্ঞানমনস্ক নিরীশ্বরবাদী অাসছেন মুক্তমনায়।
