তা ঠিক, মিনুকে দেখলে যে কেউ বলবে মিনুর ভেতরে বেড়ালত্ব কিছু আর নেই, যা আছে, তা মনুষ্যত্ব। আজ ন’বছর মিনু আমার সঙ্গে। গড়িয়াহাটের মাছের বাজারে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা ছানাটাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম, আজ তার জীবন অনেকটা রানির মতো বা দেবীর মতো। কত রকম সরকারী নির্যাতন গেল আমার ওপর, সবাই চলে গেলো, সব বন্ধু, সব অনুরাগী, শুধু মিনু রয়ে গেলো। ও আর যাবে কোথায়! রাস্তার জীবনে ও আর অভ্যস্ত নয়, শিকার করেও খেতে পারবে না, চুরি করেও না। ওসব ও অনেককাল ভুলে গেছে অথবা শেখেইনি কোনওদিন। রাস্তায় বেরোলে গাড়ি ঘোড়া কুকুর মানুষের হাতে নির্ঘাত মরবে। তার চেয়ে নিরাপদ ঘরে ঘুমোবে খেলবে, সুস্বাদু খাবার দেওয়া হবে, বিদেশি কোম্পানির ট্রিটস, রয়েল ক্যানিন ফুড, কখনও নাক সিঁটকাবে, অভিমান করবে, রাগ করবে, খেতে পীড়াপীড়ি করলে ‘খাবো না’ বলে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে থাকবে, হাতে পায়ে ধরেও মুখ খোলানো যাবে না, কখনও মর্জি হলে তবেই মুখে খাবার তুলবে। বাড়ি ভর্তি তার খেলনা, পুরো বিকেল জুড়ে তার সঙ্গে খেলতে হবে। আবদারের অন্ত নেই। গরমে তার এসি চাই, শীতে তার পশমী কম্বল চাই, উলের জ্যাকেট চাই, হিটার চাই। কেউ বিশ্বাস করুক না করুক, তার আলাদা শোওয়ারঘর, আলাদা বিছানা, আলাদা টয়লেট। টয়লেট কখনও অপরিস্কার পেলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে। আগে তার টয়লেট পরিস্কার চাই, পরে অন্য কথা। শুধু যে নিজের কথাই ভাবে, তা নয়। সেদিন জ্বর হয়েছিল আমার, যতক্ষণ না জ্বর না সারলো, শিয়র থেকে নড়লো না। এই হলো আমার পালিতা কন্যা মিনু।
মিনু আর এখন বেড়ালের মতো কাঁদে না। কাঁদে মানুষের মতো। হাসেও হয়তো মানুষের মতো। এই মিনুরই পূর্বনারীরা জঙ্গল থেকে মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়েছিল এককালে, ইঁদুর শিকার করার কাজ পেয়ে বর্তে গিয়েছিল। আজ সেই বনবেড়ালের বংশধর ঘরের জীবন যাপনে এমনই অভ্যস্ত হয়েছে যে ইঁদুর দেখলে ভয় পায়। খেলনা ইঁদুরের ঘাড়ে বেশ ছুটে এসে কামড় দেয়, কিন্তু জ্যান্ত ইঁদুর দেখে দৌড়ে পালায়। ঘর-পোষা বেড়ালগুলোর স্বভাব চরিত্র এত পাল্টে যাচ্ছে যে বেড়ালের বদলে অন্য কোনও নামে হয়তো এদের ডাকতে হবে। কী নামে?
নারী দিবস
নারী দিবসটা একটা বোরিং জিনিস। এ অনেকটা ইস্কুলের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে রবোটের মতো দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মতো। গাইতে হয় তাই গাওয়া। গাওয়ার সময় দেশের প্রতি কারও ভালোবাসা বাড়ে না। ওই সঙ্গীত গেয়ে দেশের কোনও উন্নতিও হয়না। তবে হ্যাঁ, ‘নারী দিবস’টা আছে বলে নারীর উন্নতির জন্য নানা কর্মসূচি নিতে পারে লোকেরা। কিন্তু, নারীর উন্নতির জন্য কিছু করতে কি নারী দিবসের দরকার হয় নাকি? বছরের তিনশ’-পয়ষট্টি দিনই তো তা করা যায়। নারী-বিরোধী সমাজে বসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নারীর সমানাধিকারের কথা লিখছি আজ তিরিশ বছর। আমি আর কতটুকু করেছি! হাজারো নারীবাদীরা আরও শত বছর আগে থেকেই নারীর সমানাধিকারের জন্য হেন কাজ নেই করেননি। তাতেও নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার পায়নি আজও।
নারী দিবসটা যদি উৎযাপন করতেই হয়, তবে নারীদের নয়, উৎযাপন করা উচিত পুরুষদের। কারণ নারীদের একা একা চেঁচিয়ে চিল্লিয়ে কোনও লাভ নেই। প্রাপ্য অধিকার থেকে নারীদের বঞ্চিত করছে পুরুষেরা। এই পুরুষেরা যেদিন নারীদের সমানাধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে, যেদিন নারীদের বঞ্চিত করা বন্ধ করবে, সেদিনই নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাবে। যেদিন পুরুষেরা নারীদের অত্যাচার করা বন্ধ করবে, যেদিন যৌন হেনস্থা করা বন্ধ করবে, ধর্ষণ করা বন্ধ করবে, খুন করা বন্ধ করবে, সেদিনই বন্ধ হবে নারীর বিরুদ্ধে ঘৃণ্য জঘন্য নির্যাতন। নারীদের চেঁচিয়ে চিল্লিয়ে কোনও লাভ হয়নি এতকাল, হবেও না। কিছুই হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত কর্তাদের টনক নড়ে। কর্তারা চিরকালই পুরুষ। সুতরাং চিৎকার করতে হবে পুরুষদের। পুরুষের চিৎকার পুরুষ-কর্তাদের কর্ণকুহরে দ্রুত পৌঁছোয়। পুরুষেরা সতীদাহ প্রথা বন্ধ করতে চেয়েছিল, বন্ধ হয়েছে। পুরুষেরা বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে চেয়েছিল, বেশির ভাগ অঞ্চলে বাল্য বিবাহ বন্ধ হয়েছে। পুরুষেরা নারী শিক্ষা চালু করতে চেয়েছিল, চালু হয়েছে। এই কাজগুলো যদি নারীরা করতে চাইতো, শত বছর কেটে গেলেও কিছুই হয়তো সম্ভব হতো না। ভোটের অধিকারের জন্য নারীরা আন্দোলন করেছিল, সেটা পেতে নারীদের শত বছর লেগেছে। সমাজে নারীর স্থান অত্যন্ত নিচে, নিচু স্তরের মানুষের কথা শুনতে উঁচু স্তরের মানুষ অভ্যস্ত নয়। পুরুষেরা উঁচু স্তরের। নারীবাদী-পুরুষরাও পুরুষ হওয়ার কারণে উঁচুস্তরের। পুরুষেরা দাবি করলে সেই দাবি মেটাতে এগিয়ে আসে পুরুষেরা, তাদের হাতেই নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানো-বাড়ানোর ক্ষমতা কিনা। পুরুষকেই তো দূর করতে হবে তাদের নারীবিদ্বেষী মানসিকতা! পুরুষকেই তো শুদ্ধ হতে হবে! তা না হলে নারী কিভাবে ফিরে পাবে নারীর সম্মান।
মানুষই মানুষকে নির্যাতন করছে, মানুষই মানুষের অধিকারের জন্য লড়ছে। নারী-পুরুষের বৈষম্য ঘোচানোর দায় নারীর একার নয়। এ বৈষম্য ঘোচানোর দায় সব মানুষের। যে মানুষেরা সচেতন, যে মানুষেরা চেঁচালে, চেষ্টা করলে বৈষম্য ঘোচে, দায়িত্বটা তাদেরই নিতে হবে। নারী-পুরুষের বৈষম্য যতদিন থাকবে ততদিন মানবজাতিকে সভ্য জাতি বলার কোনও যুক্তি নেই।
