কবি শামসুর রাহমান ‘লজ্জা’ বাজেয়াপ্তের বিরুদ্ধে লিখলেন, ‘তসলিমা নাসরিন প্রতিক্রিয়াশীলদের আক্রমণের লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। তাঁকে আক্রমণ করা হচ্ছে বহুদিন থেকে। একটি কি দুটি ইসলামী সংগঠন তাঁর ফাঁসির দাবি জানিয়েছে। সরকারকে বলেছে তাঁকে গ্রেফতার করার জন্যে। সরকার তাঁকে গ্রেফতার করেনি কিন্তু বাজেয়াপ্ত হয়েছে তাঁর লোকপ্রিয় উপন্যাস ‘লজ্জা’। উপন্যাসটি আমি আদ্যোপান্ত পড়েছি। নান্দনিক দিক থেকে কিছু ত্রুটি লক্ষ্য করলেও আমার কাছে এই উপন্যাসের কোনও কিছুই আপত্তিকর মনে হয়নি। তসলিমা নির্দ্বিধায় সত্য প্রকাশ করেছেন এবং সত্য প্রকাশ করাই একজন লেখকের প্রধান কর্তব্য। তসলিমা নাসরিন একজন মুক্তমতি, অসাম্প্রদায়িক লেখক। কোনও ধরনের সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেওয়ার প্রবণতা তাঁর মধ্যে থাকতেই পারে না, পাঠকদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা থেকেই নিজেকে তিনি বিরত রেখেছেন সবসময়। কোদালকে কোদাল বলতেই পছন্দ করেন তিনি। যা বলেন, সাফ সাফ বলেন, রেখে ঢেকে কিছু বলেন না। এক যুবক আমাকে কিছুদিন আগে জানিয়েছেন যে ‘লজ্জা’ উপন্যাসটি পড়ে তাঁর মনে হয়েছে যেন তিনি নিজেই উপন্যাসটির নায়ক সুরঞ্জন। এ রকম একটি বই বাজেয়াপ্ত করার যৌক্তিকতা কোথায়?’
যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি ডক্টর আহমদ শরীফও। তিনি বলেছেন, ‘লজ্জা’য় তথ্যের কোনও বিকৃতি নেই। জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকার দেশে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার কথা প্রায়শই বলে। কে না জানে, বাক স্বাধীনতা গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত। অথচ সরকার একজন সৃজনশীল লেখকের বই বাজেয়াপ্ত করে বাকস্বাধীনতা হরণ করেছে। অথচ একটি বই, যা তসলিমা নাসরিনকে হত্যা করার জন্যে সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত করছে, বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে। কাউকে হত্যার প্ররোচনা দেওয়া মস্ত অপরাধ। এই বইয়ের দিকে সরকার নজর দিচ্ছে না কেন? মৌলবাদীদের বই বলে?
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনও বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পক্ষপাতী নই। কারণ, আমি মনে করি না কোনও বইই সমাজের ক্ষতি করতে পারে। যে বই মানুষকে হত্যা করতে প্ররোচনা এবং উত্সাহ জোগায়, ফ্যাসিবাদের গুণ গায়, সে বইয়ের কথা আলাদা।
যে দেশে ওষুধেও ভেজাল দেওয়া হয়, চোরাচালান কায়েম রয়েছে, খাদ্যদ্রব্য বিষাক্ত করা হয় ভেজাল মিশিয়ে, যে দেশে ক্ষতিকর লোকদের অবাধ বিচরণ, সে দেশে একজন সত্যান্বেষী মুক্তমতি লেখকের বই নিষিদ্ধ করা হয় কেন? একজন লেখক নিরীহ বলেই কি? তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ উপন্যাসটিকে মুক্ত ঘোষণা করার জন্য আমরা যারা লেখকের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী তারা সরকারের কাছে দাবি জানাই। আশা করি, সরকার ‘লজ্জা’র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে প্রমাণ করবেন যে প্রকৃতই তারা বাকস্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। ’ ১৯ জুলাই তারিখে আহমদ শরীফের লেখাটি ছাপা হয়েছিল, তার পরদিনই ছাপা হয়েছিল প্রাক্তন বিচারপতি কে এম সোবহানের লেখা। বাজার থেকে লজ্জা তুলে নেওয়ার জন্য সরকার যে বিপুল পুলিশ বাহিনী নামিয়েছে দেশে, তা দেখে তিনি মন্তব্য করেছেন …‘এই পুলিশি তত্পরতা যদি চালানো হত গত ডিসেম্বরের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তাহলে হয়ত বইটি লেখার দরকারই হত না। বইটিতে যেসব বক্তব্য আছে তা বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে উসকানিমূলক বলে কোনও পাঠক মনে করবেন না যদি না সেই পাঠক ঐ সন্ত্রাসীদেরই একজন বা তাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়। ’
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২১ জানুয়ারি, ২০১৬
গ্যালিলিও এবং তার ‘জারজ মেয়ে’
ফ্লোরেন্সের জাদুঘর থেকে গ্যালিলিওর কন্যা ভার্জিনিয়ার শতাধিক চিঠি পাওয়া গেছে, কিন্তু কন্যাকে লেখা গ্যালিলিওর কোনও চিঠিই কিন্তু পাওয়া যায়নি। ও-সব কবেই আগুনে পোড়ানো হয়েছে। ওই কনভেন্টেই পোড়ানো হয়েছে, যেখানের নান ছিলেন ভার্জিনিয়া। জন্ম ওঁর ১৬০০ সালে, যে বছর জিয়োর্দানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, সে বছরই। মেয়ের যখন মাত্র বারো বছর বয়স, দক্ষিণ ফ্লোরেন্সের এক কনভেন্টে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন গ্যালিলিও, সেখানেই ভার্জিনিয়া নাম পাল্টে মারিয়া সেলেস্ত হয়েছিলেন, থেকেছেন সারা জীবন, আর সারা জীবনই গ্যালিলিও চিঠি লিখেছেন ওঁকে, আর মারিয়াও লিখেছেন ডিয়ার লর্ড ফাদারকে। গ্যালিলিও সম্পর্কে সবাই জানে, গ্যালিলিও পিসার হেলে যাওয়া টাওয়ার থেকে কামানের বল ফেলেছিলেন নিচে, জানে গ্যালিলিও পুরো জগতের বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, যখন পৃথিবীকে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র বলে জানত সবাই, জানে যে, এ-কারণে তাঁকে শাস্তি পেতে হয়েছিল, কিন্তু কেউ কি জানত গ্যালিলিওর এক ‘জারজ কন্যা’ ছিল যাকে বিষম ভালবাসতেন তিনি এবং যাঁকে চিঠি লিখে গেছেন পাতার পর পাতা এমনকী যখন তিনি ঘরবন্দি! কীরকম হতে পারে সে-সব চিঠি, একজন ঈশ্বরে বিশ্বাসী, আরেকজন ঈশ্বরের তথ্য উড়িয়ে দেওয়া বিজ্ঞানী! তখন ইটালিতে, সেই সপ্তদশ শতাব্দীতে, গির্জার দাপট ভীষণ রকম, কনভেন্টে থাকা নিজের মেয়ের সঙ্গেও তাঁর দেখা করার সুযোগ হতো না, অথচ মেয়েকে ভালবেসে তিনি যতদিন বেঁচেছিলেন, লিখেছেন। বিজ্ঞান, বিশ্বাস এবং ভালবাসার গল্প সে-সবে।
