১টি দিনের জন্যও নারীকে রেহাই দেওয়া হয় না। জানি না বছরের ৩৬৫ দিন কী করে রেহাই পাবে নারী। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আমাদের, এ সমাজে পুরুষের গায়ে ফুলের টোকা পড়ে না তা নয়। পুরুষও এই সমাজে অত্যাচারিত, তবে পুরুষরা পুরুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার কারণে অত্যাচারিত নয়। যেসব কারণে পুরুষ ভোগে, সেসব কারণে নারীও ভোগে। দারিদ্র্য নারী পুরুষ উভয়কেই ভোগায়। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে নারীকে বাড়তি ভুগতে হয়। পুরুষ হওয়ার কারণে পুরুষকে ভুগতে হয় না। বরং যেসব আরাম আয়েশ, আর বাড়তি সুবিধে পুরুষ পায়, সে পুরুষ হওয়ার কারণেই পায়।
৪.
আমার নারী দিবসটা কেটেছে অন্য সাধারণ দিনের মতোই। এই দিন আমি কোনও আনন্দ উৎসবে যোগ দিই নি। কোনও বক্তৃতা বিতর্কও করি নি। মনে অর্ধেক দিন কষ্ট দিচ্ছিল বড় একটি পত্রিকায় ছাপা হওয়া খবর। খবরের শিরোনাম : ‘মহিলাদের গোপনাঙ্গের দুর্গন্ধের ৮টি কারণ’। নারী দিবসে নারীদের জন্য পুরুষের প্রতিষ্ঠান থেকে চমৎকার এক উপহার বটে!
নারীকেই চিহ্নিত করা হয় ডাইনি বলে, অপয়া বলে, অমঙ্গল বলে, নরকের দ্বার বলে, নোংরা আর দুর্গন্ধের আধার বলে। যেন নারীরা লজ্জায় সংকুচিত হয়, ভয়ে সিটিয়ে থাকে, যেন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, যেন নিজেকে ঘৃণা করতে শেখে।
এ তো গেল অর্ধেক দিনের কথা। আমার মন খারাপের কথা। বাকি অর্ধেক দিন নিজেকে লজ্জা আর ভয় থেকে মুক্ত করেছি, আত্মবিশ্বাস যতটুকু হারিয়েছিল, ততটুকু ফেরত এনেছি, নিজেকে ঘৃণা করার বদলে নিজেকে ভালোবেসেছি। বাকি অর্ধেক দিন আমি ভালো ছিলাম। যে মেয়েরা নিজেকে ঘৃণা করছে, যেহেতু সমাজ শিখিয়েছে মেয়েদের ঘৃণা করতে, তাদের বলছি ঘৃণা বন্ধ করতে। ঘৃণা করলে সামনে যেতে নিজেরাই নিজেদের বাধা দেয়। ঘৃণা করলে পিছু হঠতে থাকে মানুষ। ষড়যন্ত্র করে মেয়েদের পেছনে রাখা হয়েছে, তারপরও মেয়েদের আরও পেছনে যাওয়ার ঝোঁক। অনেক আগেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে তাদের। দেয়ালে পিঠ ঠেকলে মানুষ সামনে যায়। সামনে যা কিছু থাক, ভেঙেচুরে আরও সামনে যায়। নিরাপদ দূরত্বে যায়। মেয়েরা কবে মানুষ হবে?
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১০ মার্চ, ২০১৬
খুব কাছে ওত পেতে আছে আততায়ী
১৯৯৩। দেশজুড়ে চলছেই আমার মুণ্ডুপাত। ময়মনসিংহে আমাদের বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালে পোস্টার পড়েছে, বাবার আরোগ্য বিতানের দেওয়ালেও। অকথ্য ভাষায় গালাগালি দেওয়া পোস্টার। আসলে, তসলিমাকে নিয়ে যেমন ইচ্ছে রঙ্গ করা যায়, এতে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। বাধা কে দেবে, আমি তো কোনও দল করি না যে আমার দলের লোক গিয়ে ওদের মাথাটা ফাটিয়ে আসবে। এমন সময় একটি খবর বেরোয়, প্রকাশ্য জনসভায় সিলেটের সাহাবা সৈনিক পরিষদের সভাপতি মাওলানা হাবীবুর রহমান আমার মাথার মূল্য ঘোষণা করেছেন। মূল্য পঞ্চাশ হাজার টাকা। আমার মাথাটি কেটে নিয়ে হাবীবুর রহমানের হাতে যে দেবে, সে পাবে এই টাকা। পঞ্চাশ হাজার টাকা নেহাত কম টাকা নয় বাংলাদেশে। শুরুতে মোটেও আমি গা করিনি। প্রতিদিন তো কতই খবর বেরোচ্ছে আমার বিরুদ্ধে। খবরটি বাংলাবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি চারকোণা বাক্সের মধ্যে ছাপা হয়েছে। না, এ কোনও উড়ো খবর নয়, প্রথম পাতায় ছাপা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ খবর। হঠাত্ আমার বুকের মধ্যিখানটায় অনুভব করি হিম হিম কিছু। আন্দোলন হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে, মসজিদে প্রতি শুক্রবার আমাকে গালিগালাজ করা হয়, লিফলেট বিতরণ হয়, পোস্টার ছাপা হয়, দেয়ালে সাঁটা হয়, মিছিল-মিটিংএ আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে, ওয়াজ মাহফিলে, ইসলামি জলসায় আমায় চিবিয়ে খাওয়া হচ্ছে, হচ্ছে হোক, সবারই গণতান্ত্রিক অধিকার যাকে খুশি গালি দেওয়া, কিন্তু মাথার মূল্য ধার্য হবে কেন! এ অধিকার কে কাকে দিয়েছে!
আমার ফাঁসির দাবিতে মাওলানা হাবীবুর রহমান সিলেট শহরে অর্ধ দিবস হরতাল ডেকেছেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম, কোথাকার কোন সাহাবা সৈনিক পরিষদের ডাকে হরতাল হবে না। কোনও বড় রাজনৈতিক দল ছাড়া হরতালের ডাক দিলেই তো আর হরতাল হয় না! কিন্তু আমাকে অতি বিস্মিত হতে হয়, যখন খবর বেরোয় যে অতি শান্তিপূর্ণভাবে সিলেট শহরে অর্ধ দিবস হরতাল পালন হয়েছে। শহরে কোনও দোকানপাট খোলেনি, গাড়ির চাকা ঘোরেনি। কী কারণ হরতাল পালনের! কারণ সিলেটের মানুষ আমার ফাঁসি চায়। ফাঁসি যদি সরকার না কার্যকর করে, তাতে ওদের অসুবিধে নেই। মাথার মূল্য ঘোষণা করা আছে। যে কেউ মাথাটি কাটার ব্যবস্থা করতে পারে। ঘরের গা- কাঁপা আঁধারে আমি রুদ্ধশ্বাস বসে থাকি। জানালা দরজার পর্দা টেনে দেওয়া, যেন বাইরে থেকে কেউ আমাকে লক্ষ্য করে গুলি না ছোড়ে। এই ব্যবস্থায় যে কাজ হবে না, তা আহমদ শরীফ বলেন। তিনি আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী করছেন?’
‘কিছু না, বসে আছি। ’
আহমদ শরীফ ধমক লাগালেন, ‘বসে থাকলে হবে? কী কাণ্ড হচ্ছে, টের পাচ্ছেন না! এক্ষুনি পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করেন। ’
‘পুলিশ পাহারা? কী করে করব?’
‘মতিঝিল থানায় একটি চিঠি লিখে দেন। লেখেন যে আপনার মাথার দাম পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং আপনার জন্য যেন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। আমি লোক পাঠাচ্ছি, আমার লোক আপনার চিঠি নিয়ে থানায় দিয়ে আসবে। ’
