দিন দিন মানুষ সভ্য হচ্ছে, ধর্মের গোঁড়ামি থেকে নিজেদের মুক্ত করছে, মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার ছুড়ে ফেলে আধুনিক হচ্ছে। কিন্তু কিছু কট্টর মুসলিম দেশের মতো ভারতবর্ষ ধর্মকে আঁকড়ে ধরছে। সামনের দিকে না হেঁটে পেছনের দিকে হাঁটছে, অতীতের দিকে হাঁটছে। মাঝে মাঝে আমার আশংকা হয়, বিশ্বের মুসলিম আতংকবাদীদের মতোই হয়তো হয়ে উঠছে হিন্দু আতংকবাদীরা। হতে না পারলেও চেষ্টা করছে। কী জানি, চেষ্টা করতে করতেই একদিন হয়তো ওদের স্বপ্ন পূরণ হবে। মুসলিম আতংকবাদীরা সারা বিশ্বে আতংক ছড়াচ্ছে। হিন্দু আতংকবাদীরা ভারতবর্ষে আতংক ছড়াচ্ছে। মুসলিম আতংকবাদীদের উদ্দেশ্য সারা বিশ্বকে ইসলামী বিশ্ব বা দারুল ইসলাম বানানো। হিন্দু আতংকবাদীদের উদ্দেশ্য সারা ভারতবর্ষকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানো। দুটো হয়তো সমান ভয়ংকর নয়, তবে দুটোই ভয়ংকর।
ভারতবর্ষের বাইরে গো-মাংসের মূল্য এবং জনপ্রিয়তা আর সব মাংসের চেয়ে বেশি। আর সব দেশ ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত হলেও ভারতবর্ষ হতে পারছে না। মুসলমান শূকরের মাংস খাবে না, হিন্দু গরুর মাংস খাবে না। না খাওয়ার পেছনে কারণ ভিন্ন, কিন্তু কুসংস্কারটা একই রকম অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক, একই রকম অসার।
তারপরও বলবো, হিন্দুরা আগের চেয়ে উদার হয়েছে। একসময় হিন্দু-বাড়িতে মুরগি ঢুকতো না। মুসলমানরা মুরগি পুষতো, মুরগি খেতো। তাই দেখে হিন্দুরা অনেক ছি ছি করতো। একসময় হিন্দু-বাড়িতে পেঁয়াজ রসুন খেতো না কেউ। এখন মাংসাশি হিন্দুরা পেঁয়াজ রসুন দিয়ে মুরগি রান্না করে খায়। হয়তো আজ গরুর মাংস খেতে ভয়ানক আপত্তি, ভবিষ্যতে এই আপত্তি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। মুসলমানদের জন্য তো মদ হারাম। মুসলমানরা কি মদ খাচ্ছে না? অনেকেই খাচ্ছে। আরাম আয়েশ আর ভোগ বিলাসের জন্য মানুষ ধর্ম খোয়াতে রাজি। অনেক খুইয়েছে এ যাবৎ। হারাম জিনিস বেশিদিন হারাম থাকে না। প্রয়োজনে হারামকে হালাল করে নেওয়ার চল সমাজে চিরকালই ছিল, এখনও আছে। ইসলাম বলে কুকুর নাপাক জিনিস, কিন্তু মুসলমানের বাড়িতে কি কুকুর পোষা হচ্ছে না? ঠিকই হচ্ছে। চোর তাড়ানোর জন্যও হচ্ছে, ভালোবেসেও হচ্ছে।
যে গরুর জন্য জীবন নিতে প্রস্তুত হিন্দু সম্প্রদায়, সেই গরুকে দেখেছি শাহানশাহ-এর মতো রাস্তার মধ্যিখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। গাড়ি থেমে আছে, অথবা চলছে ধীরে। এই স্বাধীনতা আর সম্মান ক’টা গরুর ভাগ্যে জোটে। কিন্তু এই গরুই আবার নিজেদের সামান্য খাদ্য জোটাতে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। কোথাও খাবার নেই। পার্কে কিছু সবুজ ঘাস ছিল, কিন্তু পার্কে কোনও গরুর ঢোকা বারণ।
খাবার না পেয়ে গরুরা ডাস্টবিন ঘেঁটে যা পায়, তাই খায়। তারা পলিথিনের ব্যাগ খায়, হ্যাঁ দিব্যি খেয়ে ফেলে। গরু রক্ষা সমিতিরা এসব অসহায় গরুদের কেন দেখতে পায় না, জানি না।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৪ মার্চ, ২০১৬
নারী দিবস
১.
নারী দিবসের সকালে কিছু ফোন পেলাম। সকলে বললো, ‘হ্যাপি উইমেন’স ডে’। ঠিক যেমন করে তারা বলে ‘হ্যাপি ভ্যালেনটাইন’স ডে’ অথবা ‘হ্যাপি মাদারস ডে’। ভ্যালেনটাইন’স ডে বা মাদারস ডে-তে হ্যাপিনেসের বা সুখের ব্যাপার থাকে। প্রেমিক-প্রেমিকা বা মায়েদের আনন্দ উৎসব করার জন্য মূলত ওই দুটো দিন। কিন্তু নারী দিবসের তো একই উদ্দেশ্য নয়। নারী দিবস শুরুই হয়েছিল নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্যগুলো দূর করার আন্দোলনের জন্য। এখনও একই কারণে নারী দিবস পালন করা হয়। এই দিবস নারীর আনন্দ উৎসবের দিবস নয়। এই দিবসের উপস্থিতি প্রমাণ করে নারী আজও অত্যাচারিত, অসম্মানিত, নারী আজও বঞ্চিত, লাঞ্ছিত। সে কারণেই এই দিবসে আজও নারীরা প্রাপ্য অধিকারের জন্য দাবি জানায়।
‘নারী দিবস’ জিনিসটি আমাকে কখনও আনন্দ দেয় না। আনন্দ দেয় না কারণ দিনটি আমার কাছে অত্যন্ত দুঃখের দিন। দুঃখের দিন কারণ মৌলিক অধিকার পাওয়ার জন্য আজও আমাদের কাঁদতে হচ্ছে, চিৎকার করতে হচ্ছে, সভা-সেমিনার করতে হচ্ছে, রাস্তায় নামতে হচ্ছে, মিছিলে যেতে হচ্ছে।
সেই কতকাল আগে, সম্ভবত ১০৫ বছর আগে, নির্যাতিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত ও অসম্মানিত না হওয়ার অধিকার চেয়েছিল নারী। সেই থেকে আজও বছর বছর এই দিনটিতে একই অধিকার চাওয়া হয়, চাওয়া হয় কারণ আজও নারীরা নারী হয়ে জন্ম নেওয়ার অপরাধে নির্যাতিত, নিপীড়িত অত্যাচারিত, অসম্মানিত। আজও আমরা নারীরা বঞ্চিত, লাঞ্ছিত। যেদিন সমানাধিকার পেয়ে যাবো, সেদিন থেকে এই দিবসটির অস্তিত্ব আর থাকবে না। সর্বান্তকরণে দিবসটির বিলুপ্তি চাই আমি।
২.
আমি তো সবসময় বলি, বছরের ৩৬৪ দিন পুরুষ দিবস, ১ দিন নারী দিবস। নারী আর পুরুষের মধ্যে যে হাজারো বৈষম্য, সেগুলো হটিয়ে দিলেই নারী দিবস করার প্রয়োজন পড়বে না। নারীবিদ্বেষী কিছু পুরুষ যে ‘পুরুষ দিবস’ পালন করার আয়োজন করছে, সেটিও রোধ করতে হবে। নারী পুরুষ উভয়ে যেন ঘটা করে ‘মানব দিবস’ উত্যাপন করতে পারি।
৩.
নারী দিবসে কি ধর্ষণ ঘটেনি? নারীর ওপর অত্যাচার বন্ধ ছিল একদিনের জন্যও? মেয়েশিশু পাচার হয়নি, শিশু কিশোরীদের যৌনদাসী বানাবার জন্য পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়নি? নারী দিবসে নারী-হত্যা বন্ধ ছিল? নারীকে কি পুড়িয়ে মারা হয়নি নারী দিবসে? সত্যি কথাটা খুলেই বলি, বিশ্বজুড়ে নারী-নির্যাতন চলেছে নারী দিবসে।
