আমার আশঙ্কা, শ্যামলকান্তিকে এক দিন কুপিয়ে মেরে ফেলা হবে। এ কিন্তু এই কারণে নয় যে ইসলাম নিয়ে শ্যামলকান্তি কটূক্তি করেছেন। শ্যামলকান্তি ইসলাম নিয়ে কোনও কটূক্তি করেননি। রিফাত নামের যে ছাত্রটির সামনে কটূক্তি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছিল, সেই ছাত্রই বলেছে শিক্ষক কটূক্তি করেননি। অবশ্য রিফাত তার মত বদল করেছে হেফাজতিদের অনুষ্ঠানে। মত বদল না বলে বরং মিথ্যে বলতে বাধ্য হয়েছে বলা চলে। শ্যামলকান্তিকে মেরে ফেলা হবে কারণ শ্যামলকান্তিকে হিন্দুবিরোধী সন্ত্রাসীরা খুনের জন্য টার্গেট করেছে। বাংলাদেশের মৌলবাদীদের শক্তি এবং সাহস বাংলাদেশের সরকারের চেয়েও অনেক বেশি। সরকারও সন্ত্রাসীদের সমীহ করে চলতে বাধ্য হয়।
এই বাংলাদেশটি আমার অচেনা, যে বাংলাদেশে কোরবানির গরু ছাগল জবাই করার মতো বুদ্ধিজীবী জবাই করা হয়, যে বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের ছাড়া আর কারও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। আমার এক পরিচিত ব্লগার জুলিয়াস সিজারের কিছু কথা আমাকে বেশ ভাবাচ্ছে। উনি লিখেছেন, ‘সালাহউদ্দিনের ঘোড়া’ নামক একটি ফেসবুক পেইজ থেকে শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্তকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কীভাবে হত্যা করা যাবে তার পদ্ধতিও উল্লেখ করা হয়েছে। এখন সরকারের তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কি ভূমিকা নিয়েছে এই ব্যাপারে? আইসিটি অ্যাক্ট ৫৭ ধারা নীরব কেন?— এই ব্যাপারে সরকার নীরবই থাকবে। কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। এই প্রসঙ্গে কিছু পুরনো বিষয় আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।
নয়ন চ্যাটার্জি, অনিমেষ রায়, বখতিয়ারের ঘোড়া, সালাহউদ্দিনের ঘোড়া, দস্তার রাজদরবার, বাঁশেরকেল্লা এরকম ডজনখানেক পেইজ ফেসবুকে আছে যেগুলো থেকে ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক এবং মৌলবাদী উসকানি দেওয়া হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য এসব পেইজ থেকে যাঁদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছিল তাঁদের সবাই-ই খুন হয়েছেন। বাঁশেরকেল্লা পেইজ থেকে অভিজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছিল তিনি ইসলাম বিদ্বেষী বলে। প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছিল চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষিকা অঞ্জলি দেবীকে নিয়েও। এই দুইজনকেই নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে ইসলামী মৌলবাদীরা। এই কাজটি ফারাবিও তার আইডি থেকে করেছিল। ফারাবি যে কাজগুলো করতো যেমন- কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া; ঠিক একই কাজ বর্তমানে করছে ‘নয়ন চ্যাটার্জি’ এবং ‘অনিমেষ রায়’ নামের পেইজ দুইটি।
সম্প্রতি অনিমেষ রায় পেইজটি থেকে আদিবাসীদের নিয়ে বেশ কয়েকটি উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়। তার পরপরই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে বৌদ্ধ ভিক্ষু খুন হন।
কি জানি এইসব পেইজের সাথে এই হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পর্কিত কি না। সব সম্ভবের বাংলাদেশে সবই সম্ভব।
এরকম নিরবচ্ছিন্নভাবে একের পর এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টার পরেও, কোনো ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া কিংবা হত্যার জন্য প্ররোচিত করার পরেও এই পেইজগুলোর বিরুদ্ধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উপরন্তু মৌলবাদীদের রক্ষার জন্য বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের উপর হামলাকারীদের ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ আখ্যা দিয়েছে সরকার এবং প্রশাসন।
বিপরীতে আল্লাহ কিংবা নবী-রসুল নিয়ে দেশের কোন গলিতে বসে কে পেইজ চালাচ্ছে তাঁদের ঠিকই গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনকি ফেসবুকে মন্তব্য করার জন্যও গ্রেফতার হয়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। স্রেফ পাশের বাড়ির শয়তানকে ঢিল মারার কথা লিখে ৫৭-ধারায় গ্রেফতার হয়েছেন মোহন কুমার মণ্ডল। ‘শয়তান’ এবং ‘ঢিল’ লিখলেও অপরাধী! অথচ প্রকাশ্যে মানুষকে হত্যার হুমকি দেওয়া, সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়া, নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানোর পেইজগুলোর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
জুলিয়াস সিজার প্রশ্ন করেছেন, বাংলাদেশ তুমি কার? এই প্রশ্নটি আমারও। অবশ্য প্রশ্ন করার কোনও হয়তো প্রয়োজন নেই। উত্তরটি, আমরা আশঙ্কা করছি, আমরা হয়তো জানিই। বাংলাদেশ যদি ওই সন্ত্রাসীদের, ধর্মের নামে যারা সন্ত্রাস করছে, তাদেরই হয় শেষ অবধি, সেই বাংলাদেশকে আমি চিনি না। চিনতে চাইও না।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ মে, ২০১৬
কিছু প্রশ্ন, কিছু আশা
১.
বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘যারা সন্ত্রাস করে, খুন করে, জঙ্গিবাদ করে, দুর্নীতি করে, চাঁদাবাজি করে তারা প্রতিবন্ধী। ’
সাধারণত ভ্রূণের বেড়ে ওঠায় কোনও ব্যাঘাত ঘটলে প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধীরা অনেক ক্ষেত্রেই অসহায়। মানসিক প্রতিবন্ধীদের বুদ্ধিশুদ্ধি সাধারণ মানুষের চেয়ে কম। প্রতিবন্ধীদের প্রতিবন্ধী হওয়ার পেছনে নিজেদের কোনও হাত নেই। এ তাদের দোষ নয় যে তারা প্রতিবন্ধী। নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী নয় ওরা। আমরা প্রতিবন্ধীদের করুণা করি, দয়ামায়া করি, দেখভাল করি। ওরা নিরীহ। মানুষের জটিলতা, ঘৃণা, ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন খারাবি শিখতে মানসিক প্রতিবন্ধীরা অপারগ। সন্ত্রাসী, খুনি, জঙ্গিদের প্রতিবন্ধী আখ্যা দেওয়া মানে প্রতিবন্ধীদের অপমান করা। প্রতিবন্ধীরা সন্ত্রাস করে না, খুন করে না, দুর্নীতি করে না, চাঁদাবাজি করে না। সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাসী; প্রতিবন্ধী নয়। তারা সন্ত্রাসী হয়েছে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে নয়। তারা রাজনৈতিক সন্ত্রাসী হলে তাদের সন্ত্রাসী হওয়ার পেছনে রাজনীতি একটা কারণ। সন্ত্রাসীরা জেনে বুঝেই সন্ত্রাসী হচ্ছে। সন্ত্রাসীরা দোষী। সন্ত্রাসীদের মানসিক প্রতিবন্ধী বলার মানে তাদের নির্দোষ বলা।
