ইতু বলেছে, ইস্কুল থেকে ফিরে খেয়ে দেয়ে বিশ্রামের তার সময় হতো না, হোমওয়ার্ক করতে হতো, একের পর এক প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে হতো। আরও বলেছে, ‘বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার শিকার প্রতিটি স্টুডেন্টের ডেইলি রুটিন। রেজাল্ট যাই হোক, সেটার পিছনে ছুটতে গিয়ে বর্তমানে স্টুডেন্টরা তাদের শৈশব-কৈশোরকে হারিয়ে ফেলছে। এক ধরনের বিশ্রী প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখে প্রকৃত শিক্ষা থেকে অনেক দূরে রয়েছি আমরা। এরজন্য মোটেই স্টুডেন্টরা দায়ী নয়, দায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা। দায়ী আমাদের শিক্ষকেরা, আমাদের বড়রা। তাই স্টুডেন্টদের ভুল নিয়ে হাসাহাসি না করে বরং এ থেকে পরিত্রাণের কার্যকরী কোন উপায় বের করাই আমাদের গুরুজনদের দায়িত্ব’।
ইতুর বক্তব্যের সঙ্গে দেশের বেশিরভাগ মানুষ একমত হবেন। আমিও মনে করি শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার, শিক্ষকদেরও পরিবর্তন আনতে হবে পড়ানোর পদ্ধতিতে। কিন্তু ছাত্রদের কোনও উপদেশই দেবো না, এ কেমন কথা! ছাত্ররা হুটহাট আত্মহত্যা করে ফেলে বলে ভুলটাকে ভুল বলা যাবে না? সত্যটাকে প্রকাশ করা যাবে না?
টিভিতে প্রশ্নোত্তর প্রচার হওয়ার পর ছাত্রছাত্রীদের কেউ আত্মহত্যা করুক, বা আত্মহত্যার কথা সামান্যও চিন্তা করুক, তা আমি চাই না। কিন্তু ওরা সব জানে, সব বোঝে, ওরা জ্ঞানের ভাণ্ডার— এমন মিথ্যেও আমি চাই না শুনতে। নিজের ভুল দেখার পর মানুষ শুধরে নেয় ভুলগুলো। কিন্তু নিজের ভুল নিজে না দেখলে, বা কেউ চোখে আঙুল দিয়ে না দেখিয়ে দিলে নিজেরা শুধরোবে কী করে! আমার তো মনে হয়, সাক্ষাৎকারটি প্রচার হওয়ার পর অনেক ছাত্রছাত্রীই শুধু পরীক্ষা-পাসের জন্য পড়া মুখস্থ করবে না, যা পড়বে বুঝে পড়বে, পড়ার বাইরেও চোখ কান খোলা রাখবে, নানা বিষয়ে কৌতূহলী হবে, জানবে, শিখবে। অন্তত উৎসাহ তো পাবে। খানিকটা কুণ্ঠিত আর লজ্জিত হওয়ার কারণে যদি বড় সুফল পাওয়া যায়, তবে নয় কেন?
তরুণদের মনোবল বাড়া উচিত। ইস্কুলের দিদিমণি ধমকেছে, গলায় দড়ি দাও, রেজাল্ট ভালো হয়নি, গলায় দড়ি দাও, পড়া পারিনি, গলায় দড়ি দাও। এভাবে ক’দিন! যত যা কিছুই ঘটুক, পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো না হলে বা দিদিমণি বকলে, গলায় দড়ি দেওয়ার কথা আমার তো মনে হয় না আমরা সেকালে ভেবেছি। আত্মহত্যার হার আজকাল ভয়ঙ্কর রকম বাড়ছে। মাছরাঙার সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দেওয়া ছাত্রছাত্রীরা, আশা করি আত্মহত্যা না করে, হতাশায় না ভুগে, প্রমাণ করবে তাদের মনোবল প্রচণ্ড। আমার বিশ্বাস করতে ভালো লাগছে, দ্বিতীয়বার কোনও সাংবাদিক ওদের কোনও প্রশ্ন করলে ওরা সব প্রশ্নের, অথবা অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর সঠিক দেবে।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ০২ জুন, ২০১৬
এই বাংলাদেশ আমার অচেনা
আজ বাইশ বছর নেই দেশে। দেশের অবস্থার কথা যা শুনছি, যা পড়ছি তা ভয়ঙ্কর। দিন যত যাচ্ছে, ততই যুক্তিবাদী আর প্রগতিশীল মানুষ খুন হচ্ছে। একসময় ধর্মান্ধতা আর ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বললে মৌলবাদীরা পথে নামতো, যুক্তিবাদীদের ফাঁসি দাবি করতো। এখন ধারালো ছুরি দিয়ে কোরবানির গরু ছাগল যেভাবে জবাই করে, সেভাবে যুক্তিবাদীদের জবাই করে। গরু ছাগল যেমন সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে জবাই করে, মানুষগুলোকেও তাই করে। খুনির সংখ্যা অবিশ্বাস্যরকম বেড়ে গেছে দেশে। মানুষ কী করে বাংলাদেশে নিজেদের নিরাপদ মনে করে, আমি জানি না। আপস করে চললে অথবা মুখ বুজে চললে অথবা সন্ত্রাসে সমর্থন জানালেই সম্ভবত নিরাপত্তা মেলে। দেশে যখন ছাত্র, শিক্ষক, লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, ব্লগার একের পর এক খুন হচ্ছে, তখন মানুষ কিন্তু খুনের প্রতিবাদ করছে না, রুখে দাঁড়াচ্ছে না, বরং যে যার জীবনযাপন করে যাচ্ছে, যেমন করছিল। না, এই বাংলাদেশকে আমি চিনি না।
আমার বরং চেনা মনে হয়েছে অন্য একটি বাংলাদেশকে যে বাংলাদেশে শত শত মানুষ শ্যামলকান্তি ভক্ত নামের এক ইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের হেনস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। এই প্রতিবাদ দেখে দেশ নিয়ে আমার মরে যাওয়া আশাগুলো ফের জীবন ফিরে পেয়েছে। শাহবাগের আন্দোলন যেমন আমার দীর্ঘ বছরের হতাশাকে বাঁচিয়েছিল একবার। কিন্তু এই যে প্রতিবাদ, তা কি নির্যাতিত প্রধান শিক্ষকটিকে বাঁচাতে পারবে? ভয়ঙ্কর আরও যেসব খবর পাচ্ছি, আমার তো মনে হয় না বাঁচাতে আদৌ পারবে। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা হচ্ছে শ্যামলকান্তির। মেডিকেলে ঢুকে শ্যামলকান্তিকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছে কিছু জঙ্গি দল। এবং করছে প্রকাশ্যেই। ফেসবুকে। সবাইকে জানিয়েই। এখন হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাতে সন্ত্রাসীরা আর রাতের আঁধারের জন্য অপেক্ষা করে না। ঝাড় জঙ্গলও খোঁজে না। ছুরি ধারিয়ে নিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়েই কারও বাড়িতে ঢুকে কাউকে কুপিয়ে বুক ফুলিয়েই হেঁটে হেঁটে সবার সামনে দিয়ে চলে যায়। তাদের রোধ করে কার সাধ্য বাংলাদেশে?
খবরে পড়লাম, “নারায়ণগঞ্জ ইস্কুলের লাঞ্ছিত শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্তর বিরুদ্ধে ‘ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলামকে গালিগালাজ’ করার অভিযোগ এনে তাকে হত্যার টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে তার প্রাথমিক পরিকল্পনা করে ফেসবুকে একাধিক পেজ থেকে দেওয়া হয়েছে উস্কানিমূলক পোস্ট। শুধু তাই নয়, ‘সালাহউদ্দিনের ঘোড়া’ ও ‘নবী-সা. এর কটূক্তির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ নামের পেজ ইভেন্ট খুলে শ্যামলকান্তিকে হত্যার টার্গেট লক করে দেওয়া হয়েছে এবং ঘোষণা দেওয়া হয়েছে— শ্যামলকান্তি ভক্ত এখন ঢাকা মেডিকেলে আছে। কে আছো শ্যামলকে ঢাকা মেডিকেলের ভিতরই বিজ্ঞানী বানাবে? ঢাকা মেডিকেলের ভিতর বিজ্ঞানী বানালে লাশ পরিবহনের জন্য সরকার ও পুলিশের সময় ও খরচ অনেক কমে যাবে। ‘সালাহউদ্দিনের ঘোড়া’ নামের পেজ থেকে শ্যামলকান্তিকে হত্যা করার ১১টি পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়। ‘নবী-সা. এর কটূক্তির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ থেকে শ্যামলকান্তির নাম পরিচয় দিয়ে অপরাধ হিসেবে ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলামকে গালিগালাজকারী উল্লেখ করা হয় এবং তাকে বিজ্ঞানী বানানো হোক। তারা হত্যা করার সংকেত-শব্দ হিসেবে ‘বিজ্ঞানী বানানো’ ব্যবহার করে থাকেন। ”
