জাকির নায়েক যদি বলেন তিনি সন্ত্রাসের পক্ষে আর মদদ দেবেন না, তিনি সৌদি আরব থেকে সালাফি ইসলামের আমদানি করবেন না, তিনি সুফি ইসলামের মাটিতে কট্টরবাদের চাষ করবেন না, যদি নিজের ভুল শুধরে নেন তিনি, তবে তার অধিকার থাকা উচিত আবার পিস টিভি ফিরে পাওয়ার। মুসলিম বিশ্বে যে হারে সন্ত্রাস চলছে, সতর্ক তো হতেই হবে। পিস টিভি বন্ধ করা যত না বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘন করা, তারও চেয়ে বেশি সন্ত্রাসের লাগাম ধরা। মানবতার স্বার্থে এই কাজটি ভারত বাংলাদেশ দু’দেশের সরকার করেছে। এর আগে যুক্তরাজ্য আর কানাডাও নায়েককে নিষিদ্ধ করেছে। বাকস্বাধীনতার পক্ষের অত বড় দুটো দেশ যখন কাউকে নিষিদ্ধ করলো, তার পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো কারণ আছে।
সব সন্ত্রাসীকে হাতে নাতে ধরা সম্ভব নয়। গোপনে কে কোথায় কার মাথায় কী ঢুকিয়ে কাকে সন্ত্রাসী বানাচ্ছে, তাও জানা সম্ভব নয়। যেটা সম্ভব এবং জঙ্গি দমনে যেটা করা উচিত সেটা হলো জঙ্গি কার্যকলাপ কোথায় চলছে না চলছে তার খবরাখবর রাখা, জঙ্গিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। অবশ্য আমি মনে করি জঙ্গিদের শাস্তি দিয়ে সত্যিকারের জঙ্গি দমন হয় না, জঙ্গিরা কেন জঙ্গি হচ্ছে— কী কথা, কী ভাবনা, কোন বই, কোন আদর্শ, কার মতবাদ, কার উৎসাহ তরুণদের জঙ্গি বানাচ্ছে তা জানতে হবে এবং সেই উৎসগুলোকে নির্মূল করতে হবে, সেগুলো টিকে থাকলে জঙ্গির জন্ম হতেই থাকবে। উৎস একেবারে নির্মূল করা সম্ভব না হলে অন্তত বদল বা বিবর্তন ঘটাতে হবে। সমাজ পরিবর্তনের ভার সব সময় সময়ের হাতে ছেড়ে দিলে কাজ হয় না। নিজেরা উদ্যোগী হয়ে পরিবর্তনগুলো ঘটিয়ে ফেলতে হয়।
কোরআন হাদিস বোঝার জন্য কেন জাকির নায়েকের কাছে যেতে হয়। আরবি যাদের মাতৃভাষা নয়, তারা তো অনুবাদ পড়লেই পারেন। নিজেরা যেভাবে ধর্ম বুঝবেন, সেভাবে বোঝাই তো ভালো। নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করলে অন্যের ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয় না। যার ধর্ম তার কাছে। আমার মা মনে করতেন ধর্ম মানেই ভালো কথা, ভালো কাজ, দরিদ্রকে দান, আর্তের সেবা, ধর্ম মানেই সাম্য, সমতা, সমানাধিকার, ধর্ম মানেই সুস্থতা, সততা, সৌন্দর্য। আমার মায়ের মতো করে সবাই যদি ধর্মের ব্যাখ্যা করে, তবে সমাজে ধর্ম দ্বারা কোনো অশান্তি সৃষ্টি হবে না। এ কথা জোর দিয়েই বলতে পারি।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ জুলাই, ২০১৬
আমার চোখের জলের ঈদ
আমার ধর্মের নাম সোজা ভাষায় মানবতা। আমি বলি মানববাদ। বুদ্ধিজীবীরা বলেন মানবতন্ত্র। অনেকে ভাবেন আমি বুঝি ধর্মগ্রন্থ পড়ি না। সত্য কথা হলো, অনেক ধার্মিকের চেয়ে আমি ধর্মগ্রন্থ বেশি পড়ি। অনেক মুসলমানের চেয়ে কোরআন হাদিস এবং ইসলামের ইতিহাস বেশি পড়ি। অনেক মুসলমানই জানেন না কোরআন হাদিসে কী লেখা আছে। আমি কিন্তু জানি কী লেখা আছে। আমার ধর্ম তারপরও ইসলাম নয়, আমার ধর্ম মানবতা। আমি নামাজ পড়ি না, রোজা রাখি না, কিন্তু মানুষের সেবা করি। ছোটবেলা থেকেই করি। কোনো ভিক্ষুককে কোনো দিন ফিরিয়ে দিইনি। কোনো গরিব লোক যখনই সাহায্য চেয়েছে, দিয়েছি। বিনে পয়সায় চিকিৎসা দিয়েছি। ওষুধ কেনার পয়সা নেই, কিনে দিয়েছি। জামা নেই কারো, নিজের জামা দিয়ে দিয়েছি।
বই নেই, বই দিয়েছি। এভাবেই বড় হয়েছি আমি। বড় হয়েও একই কাজ করেছি। এখনো অন্যের কষ্ট দেখে কষ্ট পাই, অন্যকে খাইয়ে আনন্দ পাই, অন্যের সুখে সুখী হই। নিজের কথা ভাবার সময়, নিজের স্বার্থ দেখার সুযোগ আমার হয় না বললেই চলে। তাই বা বলি কী করে, সময় আর সুযোগ হলেই কি আমি নিজেকে নিয়ে পড়ে থাকতাম! আমার তো মনে হয় না।
নামাজ রোজা না করলেও ঈদের সময় ঈদ করেছি। ছোটবেলার মতো ঈদের আনন্দ বড়বেলায় আর জোটেনি। রোজার ঈদকে আমরা বলতাম ছোট ঈদ, আর কোরবানির ঈদকে বড় ঈদ। ছোট ঈদের সময় বাড়ির কাজের মেয়েরা জামা জুতো পেতো, এই ব্যাপারটা আমাকে আনন্দ দিতো খুব। সারা বছর কী ভীষণ পরিশ্রম করতো, মলিন কাপড় পরতো, এক ঈদের দিনটায় দেখতাম ওদের হাসিমুখ। ছোটবেলায় আমারও যে খুব কাপড় চোপড় ছিল তা নয়, কিন্তু কাজের মেয়েদের নতুন কাপড় দেখে আমার যে আনন্দ হতো, তা নিজের নতুন কাপড় পাওয়ার আনন্দের চেয়ে বেশি ছিল। শাড়ি লুঙ্গি বিলোতাম গরিবদের, এও বড় আনন্দের— বড় ঈদে বড্ড কষ্ট হতো গরুগুলোকে জবাই করা হতো বলে, কিন্তু গরিবদের মাংস বিলোনোটা আমাকে আবার প্রচণ্ড আনন্দ দিতো।
যতদিন বাবা-মা ছিলেন, যতদিন ‘অবকাশে’ আমাদের বাড়িতে ছিলাম, ততদিনই ঈদের সময় আনন্দ হতো। মা যে কত কিছু রান্না করতেন, কত পদের যে রান্না, কী যে সুস্বাদু! কিছুই খেয়ে শেষ করতে পারতাম না। কত মানুষ যে খেত আমাদের বাড়িতে!
আমাদের ময়মনসিংহের ওই বাড়ি থেকে আমি বেরিয়ে যাওয়ার পর আমার জীবনে ঈদের সেই উৎসব আর নেই। ঈদ আসে, ঈদ যায়, কিন্তু আগের মতো আনন্দ নেই। আগের মতো বাবা-মা কাছে নেই, আগের মতো মাংস বিলোনো নেই। গরিবদের শাড়ি লুঙ্গি বিলোনো নেই। ঈদ আমার কাছে অবকাশ, বাবা মা ভাই বোনের সম্মেলন, নতুন কাপড় চোপড়, দানের উৎসব।
দিন দিন অনেক কিছু পাল্টে গেছে। রোজা বলতে আমরা ছোটবেলায় সংযম বুঝতাম। এখন চারদিকে যা দেখি, তা নিতান্তই ইফতার পার্টির রাজনীতি। দুর্নীতিবাজ লোকেরা ইফতার পার্টির আয়োজন করে নানা ব্যবসা-বাণিজ্য নাকি গুছিয়ে নেন। শুনেছি এইসব হয়। আমি রাজনীতি বুঝি কম। যদিও চিরকালই রাজনীতির শিকার। আসলে মানুষকে অসৎ আমি ভাবতে পারি না, সবাইকেই ভাল মানুষ ভাবি। মন্দ কাজ করলেও ভাবি ভুল করে ফেলেছে, নিশ্চয়ই অনুতপ্ত হয়েছে পরে।
