হ্যাপি নামের এক মেয়েকে দেখতাম ক্রিকেটার রুবেলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বেশ সাহসী কথাবার্তা বলছে ফেসবুকে। সমাজ ছি ছি করে বলে যে কথাগুলো মেয়েরা সাধারণত লুকোয়, কিছুর তোয়াক্কা না করে হ্যাপি সে কথাগুলোই জোরেশোরে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলেছে। তারপর কী হলো কে জানে, হঠাৎ সে উধাও। ক’দিন পর দেখি আপাদমস্তক বোরখায় ঢেকে মুখে ধর্মীয়তত্ত্ব আওড়াচ্ছে। লোকে তাকে খারাপ মেয়ে ভেবেছিলো, তাই লোকের চোখে ভালো হওয়ার জন্য ধর্মের আশ্রয় নিয়েছে সে। বড় মায়াই হয়, নিজের সকল প্রতিভা, সকল সম্ভাবনা সব বিসর্জন দিতে হলো তাকে। হ্যাপি যে এদিকে রুবেলের গোপন সব কথা ফাঁস করে দিল, তার পরও কিন্তু কেউ রুবেলকে খারাপ ছেলে মনে করেনি, আর নিজেকে লোকের চোখে ভালো প্রমাণ করার জন্য রুবেলকে আপাদমস্তক আবৃত করতেও হয়নি। সে দিব্যি তার জীবনযাপন করছে, যেমন করছিল। শুধু হেরে যেতে হলো হ্যাপিকেই।
মেয়েদেরই হেরে যেতে হয়। সেদিন পাকিস্তানের সেই মডেল-মেয়ে কান্দিল বালোচকে হারিয়ে দিল পাকিস্তানের সমাজ। তার আপন ভাই তাকে বিষ খাইয়ে, শ্বাসরোধ করে হত্যা করলো। কান্দিল নাকি সমাজের রীতিনীতি মেনে চলছিল না। যে সমাজ মেয়েদের স্বাধীনতার পথে বাধা, সেই সমাজকে মেনে চলার কোনো যুক্তি নেই। যে মেয়েরা শত ধিক দেবে সেই পুঁতিগন্ধময় সমাজকে, সেই সমাজের রীতিনীতিকে পায়ে মাড়িয়ে যাবে, সে মেয়েরাই সামনে এগোবে, সেই মেয়েরাই আমাদের গর্ব, সেই মেয়েরাই ভবিষ্যৎ।
সব মেয়ে হেরে যায় না। দিপিকা, প্রিয়াঙ্কা, সানিয়ারা কিন্তু হেরে যাচ্ছে না। এদের দেখেই আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে শিখুক মনোবলহীন তারকা-মেয়েরা।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২১ জুলাই, ২০১৬
জাকির নায়েকের বাকস্বাধীনতা
আমি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমার চরম শত্রুর মত প্রকাশের অধিকারের জন্যও আমি লড়ি। জাকির নায়েকের মত প্রকাশের অধিকারেও আমি বিশ্বাস করি, কিন্তু আমি যেটাতে বিশ্বাস করি না, সেটা হলো ভায়োলেন্স। হিংস্রতা, বর্বরতা, সন্ত্রাস, নির্যাতনে আমি বিশ্বাস করি না। খুনোখুনিতে আমার বিশ্বাস নেই। জাকির নায়েক কি মুসলমানদের সরাসরি সন্ত্রাসী হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন? উপদেশ হয়তো দেননি, কিন্তু তিনি ওসামা বিন লাদেনকে সন্ত্রাসী বলতে রাজি নন, তিনি নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসীদেরও মনে করেন না সন্ত্রাসী। সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে সন্ত্রাস করার পক্ষপাতী তিনি, সুতরাং মুসলমানদের সবারই সন্ত্রাসী হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। যে মুসলমানরা মুসলমানদের দেশে আমেরিকার বোমা ফেলা, ইসরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার বন্ধুত্ব করা— ইত্যাদির ঘোরবিরোধী তারা খুব পছন্দ করে সন্ত্রাস বিষয়ে জাকির নায়েকের এই মন্তব্যগুলো। এদের মধ্যে ক’জন সত্যি সত্যি অস্ত্র হাতে নেয় আমি জানি না। রোহান, ইমতিয়াজ আর নিবরাস ইসলাম জাকির নায়েকের ভাষণ শুনতো কিন্তু তারা কি সন্ত্রাসী হয়েছে ওই ভাষণের কারণেই? ভাষণ যদি কিছুটা ভূমিকা রেখে থাকে তবে কতটা ভূমিকা রেখেছে? ঠিক জানি না, দুনিয়ার ক’জন তরুণ জাকির নায়েকের ভাষণ শুনে জঙ্গি হওয়ার আর গণহত্যা করার পরিকল্পনা করছে। যদি সন্ত্রাস তৈরিতে নায়েকের কোনো ভূমিকা না থাকে, তবে জাকির নায়েকের বাকস্বাধীনতায় আমি বিশ্বাস করি। আমি তো নয়া নািসদের বাকস্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করি। তারা কী বলতে চায় বলুক, ভায়োলেন্সের আহ্বান না দিয়ে বলে যাক। তাদের নীতি-আদর্শ যদি কারও পছন্দ হয়, গ্রহণ করবে।
তসলিমা-বিরোধীদের বাকস্বাধীনতায় আমি বিশ্বাস করি, কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করি যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে হত্যা করার, বা আমার শরীরে আঘাত হানার জন্য ওরা আহ্বান না জানায়। মানসিক আঘাতের পরোয়া করি না আমি। অন্যের নিন্দে সমালোচনা শোনার মনের জোর সবার আছে, থাকে। ওটি নেই বলে যারা চিৎকার চেঁচামেচি করে, তারা অসৎ উদ্দেশে চিৎকার চেঁচামেচি করে। জাকির নায়েকের ভাষণ আমি শুনেছি। তিনি মূলত কোরআন থেকেই উদ্ধৃতি দেন। কোরআনকেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের, উদারতা-মানবতার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করেন। ইসলামে পুরুষের জন্য বহুবিবাহ, বহুগামিতা, বধূ নির্যাতন, ক্রীতদাসী-সঙ্গমের অনুমতি আছে, এসবকেও নানা যুক্তি দাঁড় করিয়ে তিনি মেনে নেন। জাকির নায়েকের চেয়েও হাজার গুণে ভয়ঙ্কর মোল্লা-মৌলানা আছেন, ভাষণ দিচ্ছেন বিভিন্ন পাড়ায় মহল্লায়, মসজিদে মাদ্রাসায়, ওয়াজ মাহফিলে, ইসলামী জলসায়। ওসব শুনে নির্ঘাত মাথা নষ্ট হচ্ছে প্রচুর মানুষের। ওইসব মোল্লা-মৌলানা অধিকাংশই নারীবিরোধী, মানবাধিকারবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী। জাকির নায়েক যত না মুসলমানদের নষ্ট বানান, তারও চেয়ে বেশি বানান ওইসব মোল্লা-মৌলানা। জাকির নায়েকের পিস টিভি বন্ধ হলে মৌলানাদের মুখ তো বন্ধ হচ্ছে না। ওইসব মুখ তো চলবেই একুশ শতকের সমাজকে সপ্তম শতকে ঠেলে দেওয়ার জন্য, পেছনে, অন্ধকারে, টেনে নেওয়ার জন্য, বদ্ধ ঘরে বন্ধ করার জন্য। সরকারের কাজ ওদের ভাষণের দিকে লক্ষ রাখা, ওরা মানুষকে বর্বর হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে কিনা দেখা। জাকির নায়েকের বাকস্বাধীনতা যে কারণে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, সে কারণে এদের বাকস্বাধীনতাও কেন কেড়ে নেওয়া হবে না, তার উত্তরও চাই। নায়েক ইংরেজিতে বলেন, অন্যরা অন্য ভাষায় বলেন বলে শ্রোতা কিন্তু নেহাত কম নয়। আসলে শ্রোতা যত বেশি, বিপদ তত বেশি। বোস্টন ম্যারাথনে বোমা হামলাকারীরাও নিরীহ শ্রোতা হয়ে ঢুকেছিল বোস্টনের মসজিদে, বের হয়েছিল জঙ্গি হয়ে। মসজিদে কী শিক্ষা দিচ্ছে ইমামরা, খুতবায় কী বলা হচ্ছে, সন্ত্রাসের পক্ষে মগজধোলাই হচ্ছে কি না— কেউ কি আছে দেখার? আজকাল তো মাদ্রাসা মসজিদকে এককভাবে দায়ী করাও ঠিক নয়, যখন বড়লোকের প্রাইভেট ইস্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি থেকেই বেরোচ্ছে জঙ্গি!
