সাধারণ মানুষ হয়তো তলিয়ে দেখে না, ধরা যদি কেউ পড়েও থাকে, ক্ষতি যদি কারো হয়েই থাকে এই টাকা বাতিল করার সিদ্ধান্তের কারণে, সে রাঘব-বোয়ালদের নয়, চুনোপুঁটিদের, যারা সামান্য কালো টাকা জমিয়ে ঘরে লুকিয়ে রেখেছিল বিপদে আপদে বাঁচার জন্য, ছেলে মেয়ের প্রাইভেট ইস্কুলে পড়াশোনা, বা তাদের বিয়েটিয়ের জন্য। যারা রাঘব-বোয়াল, যাদের ধন দৌলতের কোনো কূল কিনার নেই, তারা নোট রাখে না কোথাও, তারা রিয়েল এস্টেটে ঢেলে দেয়, সোনা কিনে রাখে, অথবা সুইস ব্যাঙ্কে রেখে দেয়। তাদের সঙ্গে সব রাজনীতিকদের, বিশেষ করে যারা ক্ষমতায়, সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর। তারা নির্বাচনের সময় দু’হাতে কালো টাকা ঢেলে পছন্দের দলকে জেতানোর ব্যবস্থা করে, শত শত কোটি টাকা দলের দানবাক্সে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর তারা যখন সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে বাণিজ্য উদ্দেশ্যে লক্ষ কোটি টাকা লোন নেয়, বছরের পর বছর পার হলেও সেই লোনের টাকা পরিশোধ করার কোনো তাগিদ তাদের মধ্যে লক্ষ করা যায় না। এই রাঘব-বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে।
হাজার বা লক্ষ কোটি কালো টাকা বিদেশের ব্যাঙ্কে যারা লুকিয়ে রেখেছে, তাদের লিস্ট আগের সরকারের কাছেও আছে, এই সরকারের কাছেও আছে। কিন্তু কেউ সেই কাজটি করছেন না, যে কাজটির জন্য জনগণ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে আছে। কোনো সরকারই কথা দিয়েও সেই টাকা ফেরত আনছেন না। অপ্রিয় সত্য কথাটি হলো, সেই লিস্টে অনেক রাজনীতিক আছেন। সব দলেরই রাজনীতিক। এক দল ফেঁসে গেলে আরেক দলও ফেঁসে যাবে। তাই দুর্মুখরা বলে, ‘এ অনেকটা দলে দলে ‘পলিটিক্যাল ডীল’, তুমিও যাবে না, আমিও যাবো না, বুঝলে নটবর?’
এ দেশের পাবলিককে বোকা বানানো খুব সহজ। তারা হিসেব চাইছে না টাকা বাতিল করে দেশজুড়ে যে টাকার অভাব তৈরি করা হলো, জনগণকে যে ভোগানো হলো, এখনো হচ্ছে, আখেরে কতটা লাভবান হলো দেশ! বাণিজ্যে যে মন্দা দেখা দিচ্ছে, কতদিনে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারবে, তা জানতেও চাইছে না সরকারের কাছে। পাবলিক যে কোনো উপায়ে দুর্নীতি রোধের পক্ষে। তোমার পদ্ধতিটি কার্যকরী নাও হতে পারে, কিন্তু কিছু করার জন্য তুমি যে চেষ্টা করেছ, এতেই তারা খুশি।
এত খুশি যে দুর্নীতি দমনের সরকারি এই সিদ্ধান্তে ভুল ধরাটাও কারো সহ্য হচ্ছে না। যদি ভরা মাঠে কেউ টাকা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বলে, তবে সে মার খেয়ে মরবে। দেশদ্রোহী বলে তো গালি দেওয়াই হবে। আজকাল কেউ যদি ভারতের সিনেমায় পাকিস্তানি অভিনেতাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলে, বা পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব চায়, বা কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাদের খুন খারাবির কোনোরকম সমালোচনা করে, তাহলেই দেশদ্রোহী আখ্যা পেয়ে যায়। অনেক ভিন্ন মতের মানুষ দেশদ্রোহী আখ্যা পাওয়া নিয়ে এতই ভীতসন্ত্রস্ত যে মনের কথা কোথাও তারা প্রকাশ করছে না। দেয়ালেরও কান আছে, তারাও জানে।
দুর্নীতি রোধের কোনো পদক্ষেপের সমালোচনা তো দূরের কথা, এ নিয়ে প্রশ্ন করাও চলবে না। মানুষ সত্যিই অন্তর থেকে চাইছে দেশ থেকে দুর্নীতি সরাতে। এ সময় সৎ রাজনীতিকদের চেষ্টা করা উচিত দুর্নীতি রোধের টোপটা পাবলিকের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে না রেখে সত্যিকার কিছু একটা করা, জনগণের দুর্ভোগ পোহাতে না হয়, কিন্তু দুর্নীতি রোধ হয়, এমন কিছু। এমন কিছু পদ্ধতির অস্তিত্ব যে নেই, তা তো নয়।
কে সৎ আর কে সৎ নয়, এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে সেদিন কথোপকথন শুনলাম। তারা বলছে, প্রেসিডেন্ট আব্দুল কালাম আজাদ সৎ লোক ছিলেন, কারণ তাঁর পরিবার ছিল না, সন্তানাদি ছিল না, তিনি একা মানুষ ছিলেন, কারো জন্য তাঁর চুরি ডাকাতি করার দরকার পড়েনি। মোদি সৎ, কারণ তিনিও একা মানুষ। সৎ আর অসতের এই ব্যাখ্যা যারা দেয়, তাদের বোকা বানানো সহজ বলেই চতুর রাজনীতিকরা বোকা বানায়। আমি একবার ভেবেছিলাম বলবো, পরিবার আর বাচ্চাকাচ্চা না থাকলেই কেউ সৎ হয়, আর না থাকলেই অসৎ হয়, তা ঠিক নয়। শেষ পর্যন্ত বলিনি, বললে হয়তো মার খেতে হবে, অথবা ভারতের ভাল চাই না আমি, আমাকে এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া উচিত— এমন কথা শুনতে হতে পারে।
বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করা মানুষকেও সময় সময় মুখ বুজে থাকতে হয়।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৪ নভেম্বর, ২০১৬
সাঁওতালদের কথা
সাঁওতালদের ওরকম আলাদা করে রাখা হয় কেন? ওরা কি চিড়িয়াখানার জন্তু? জন্তু না হলেও পর্যটন বাণিজ্যের পণ্য অথবা দর্শনীয় বস্তু নিশ্চয়ই। কেউ কেউ বলে, ‘মেইনস্ট্রিম সমাজে ওদের না থাকাই ভালো, থাকলে ওদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোকাচার, ভাষা সব হারিয়ে যাবে’। কিন্তু দল বেঁধে বাস করলেই ঐতিহ্য রক্ষা করা হয় না। দারিদ্র্য ওদের জীবন থেকে সংস্কৃতি ভুলিয়ে দিয়েছে। বারো মাসে ওদের তেরো পার্বণ। পার্বণ পালনের জন্য যে কড়ির দরকার হয়, সে কি আছে ওদের ঝোলায়? ওরা তো এর মধ্যে নিজেদের পোশাক ছেড়ে আর সবার মতো পোশাক পরছে। ওরা তো বাংলা ভাষাটাকেও বলতে শিখেছে। মূলস্রোতে মিশে যাওয়ার জন্য বাকি আর কী আছে?
ভারতের আন্দামানের একটা জায়গায় জারোয়াদের বন্দি করে রাখা হয়। পর্যটকরা ওদের দূর থেকে দেখে। চিড়িয়াখানার জন্তুদের যেমন দেখে, তেমন দেখে ন্যাংটো ন্যাংটো মানুষগুলোকে। ওদেরও মূলস্রোত থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে, দর্শনীয় বস্তু হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে। মনে পড়ছে ইংরেজরা যখন আফ্রিকার জঙ্গল থেকে পিগমিদের—ছোট ছোট মানুষদের—ধরে এনেছিল, ওরা মানুষ কিন্তু ওদের মানুষ নয়, বরং ‘মানুষের মতো দেখতে এক ধরনের জন্তু’ বলে রায় দিয়েছিলেন তখনকার বিজ্ঞানীরা, ওদের রাখা হয়েছিল খাঁচায় বন্দি করে, ঠিক যেমন জঙ্গলের হিংস্র জন্তুকে খাঁচায় বন্দি করা হয়। আন্দামানের জারোয়াদের জন্যও তো তেমন অদৃশ্য খাঁচা নির্মাণ হয়েছে! সাঁওতালদেরও জন্যও হয়তো অদৃশ্য কোনো খাঁচা আছে। সাঁওতালদের জন্য একটা নির্দিষ্ট এলাকা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, আমেরিকার নেটিভ আমেরিকানদের জন্য যেমন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ এলাকাগুলোই দেওয়া হয়েছে ওদের, যারা দেশটার আদিবাসী, মানে আদি থেকে বাস করছে যারা। বহিরাগতরা আদিবাসীদের দেশ দখল করে আদিবাসীদেরই একরকম ‘একঘরে’ করে। আদিবাসীদের এভাবেই ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে পৃথিবী থেকে।
