শিশু-সঙ্গমে আর শিশু-ধর্ষণে মূলত কোনও পার্থক্য নেই। শরীরে যৌনতার বোধ শুরু না হতেই, নিতান্তই কৌতূহলে বা বাধ্য হয়ে শিশুরা সঙ্গমে রাজি হতেই পারে, কিন্তু সে রাজি হওয়া সত্যিকার রাজি হওয়া নয়।
সমাজের বেশির ভাগ মেয়েরা সুখী নয়, অথচ সুখী হওয়ার ভান করে। অথবা দুঃখকেই, না পাওয়াকেই, পরাধীনতাকেই সুখ বলে, পাওয়া বলে, স্বাধীনতা বলে ভাবে। ভাবতে শিখেছে ছোটবেলা থেকেই। নতুন করে এর বিপরীত কিছু শেখা সম্ভবত অধিকাংশ মেয়ের পক্ষেই আর সম্ভব নয়। পুরুষ যা শিখেছে ছোটবেলা থেকে তা হলো, তারা প্রভু, তারা জানে বেশি, বোঝে বেশি, তাদের জন্য সমাজ, তাদের জন্য জগৎ, তারা শাসন করবে, তারা ভোগ করবে। এই শিক্ষাটা না শিখতে এবং এর বিপরীত কিছু শিখতে অধিকাংশ পুরুষই রাজি নয়।
জাতি হিসেবে সভ্য হতে চাইলে শিশুর প্রতি পুরুষের লোভের জিভকে সংযত করার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের দায়িত্ব এই জিভকে সংযত করার জন্য উৎসাহ দেওয়া। কিছুতেই ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ জিভ অসংযত করা যেতে পারে বলে অসংযত করায় উৎসাহ দেওয়া নয়।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ০১ ডিসেম্বর, ২০১৬
হাতে টাকা নেই
ব্যাঙ্কে টাকা আছে, কিন্তু হাতে টাকা নেই। কারণ লম্বা লাইন পেরিয়ে এটিএমে যখন পৌঁছই তখন মেশিনের টাকা ফুরিয়ে যায়। ব্যাঙ্কের দীর্ঘ লাইনে সকালে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যেবেলায় সপ্তাহের বরাদ্দ টাকা তুলতে শুধু মনের জোর থাকলে চলে না, পায়েও জোর থাকা চাই। চারদিকে সব আছে, শুধু টাকা নেই। কার্ডে জিনিসপত্রের দাম দিচ্ছি, চেকে দিচ্ছি। কিন্তু খুচরোর তো দরকার আছে। মাছওয়ালার কাছ থেকে বাকিতে বেশ ক’দিন মাছ কিনেছি। মাছওয়ালা ক্যাশ ছাড়া কিছু নেয় না। কিন্তু সেদিন তার হাতে অনেকটা জোর করেই ব্যাঙ্কের চেক ধরিয়ে দিলাম। এ ছাড়া আমার উপায় কী!
প্রতিদিন সকাল থেকে মানুষ ব্যাঙ্কের সামনে দাঁড়াচ্ছে। লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিদিন। অনেকে হতাশায়-আশঙ্কায় আত্মহত্যা করছে, কারো কারো হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তারপরও মানুষ কিন্তু অখুশি নয়। খুব বেশি কেউ বলছে না হঠাৎ করে পাঁচশ আর এক হাজার টাকার নোট বাতিল করার কাজটা মোদিজি ভালো করেননি, বা এভাবে দুর্নীতি দমন করা যায় না। ভারতের মানুষ দুর্নীতি দমন করার জন্য কোনো সরকারকে এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে, যে পদক্ষেপ দেশকে আমূল নাড়িয়ে দেয়, দেখেনি আগে। তাই সকলেই ভেবে নিচ্ছে চমৎকার দমন হচ্ছে দুর্নীতি। মাঝে মাঝেই খবর পাচ্ছে কোথাও রাস্তার ধারে বস্তা ভরা বাতিল টাকা পাওয়া যাচ্ছে, কোনও খালে বা নদীতে বাতিল হয়ে যাওয়া বিস্তর টাকা ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে, টাকা পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সকলেই ধরে নিচ্ছে ধরা পড়ে গেছে দুর্নীতিবাজরা। সাধারণ মানুষ এই ভেবে খুশি হচ্ছে যে কালো টাকা যাদের কাছে ছিল, তাদের ভীষণ বিপদে ফেলে দিয়েছেন মোদি, তারা এখন কালো টাকা ফেলে দিচ্ছে, পুড়িয়ে দিচ্ছে, ডুবিয়ে দিচ্ছে। মানুষ ভেবে নিচ্ছে ভারতবর্ষ থেকে জন্মের মতো বিদেয় নিতে যাচ্ছে দুর্নীতি। নিজেদের দুর্ভোগ নিয়ে তাই তারা মোটেও দুঃখিত নয়। সপ্তাহে ২৪ হাজারের বেশি টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তোলা যাবে না। এটিএম থেকে আড়াই হাজারের বেশি নয়। পুরনো নোট চার হাজারের বেশি বদলানো যাবে না। একশ’ পঁচিশ কোটি লোকের দেশ। বিয়ের মরশুম এখন। মানুষের হাতে টাকা নেই। অন্য কোনো দেশ হলে এমন সরকারকে বিদেয় নিতে হতো বা প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হতেন। ভারতবর্ষই বোধহয় একমাত্র দেশ যেখানে মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়েও একই রকম জনপ্রিয় থাকা যায়।
ভারতবর্ষের ভাববাদী আদর্শে আত্মত্যাগ থাকতেই হয়। মানুষ শুনতে শুনতে বড় হয়েছে, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। দীর্ঘ দুর্গম পথ হেঁটে তারা তীর্থস্থানে যায়। দুর্ভোগ যত হবে, তত নাকি পুণ্য হবে। ধর্মে আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষ দেশ থেকে দুর্নীতি বিদেয় করতে নিজেদের অশান্তি হাসিমুখেই মেনে নিচ্ছে। তবে দুর্মুখ যে নেই তা নয়, বলছে, ‘যে জনগোষ্ঠী টাকাকে আক্ষরিক অর্থে পুজো করে তারা টাকা ওভাবে পোড়াবে না, ডোবাবে না, রাস্তায় ফেলবেও না। কালো টাকাকে সাদা করার যেসব পদ্ধতি আছে, সবগুলোই চেষ্টা করবে। বাতিল টাকা রাস্তায় ফেলেছে সরকারি দলের লোকেরা। নিউজ এজেন্সির লোকদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে নিয়ে তারাই দেখাচ্ছে এই দেখ কালো টাকা রাতের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছে ওরা, পুড়িয়ে দিচ্ছে ওরা। ওরা কারা? ওরা কালোবাজারি, কালো ধনের মালিক। ’
মানুষ কালো ধনের মালিকদের শাস্তি দিতে এক পায়ে খাড়া। ভারতের রাজনীতিতে এর চেয়ে জনপ্রিয় আর কোনো বিষয় নেই যে, ভারতীয়দের কালো টাকা তুমি তাদের সুইস ব্যাঙ্ক থেকে উঠিয়ে দেশে ফেরত নিয়ে আসবে। ওই টাকায় দেশের অর্থনীতির উন্নতি ঘটবে, সব মানুষের সচ্ছলতা আসবে। এই কাজটি করার প্রতিশ্রুতি দিলে এ দেশে ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হওয়া যায়।
অরভিন্দ কেজরিওয়াল ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন রাজনীতির লোক না হয়েও লোককে কী কথা শোনালে তিনি রাতারাতি জনপ্রিয় রাজনীতিক হয়ে যেতে পারেন। হয়েছেনও তাই। কংগ্রেসের নেতারা দুর্নীতি করে কালো টাকা জমিয়েছেন, লক্ষ কোটি টাকার স্ক্যাম হয়েছে কংগ্রেসের আমলে। এই প্রচারই যথেষ্ট ছিল কংগ্রেসকে গত নির্বাচনে ধুলোর মতো উড়িয়ে দিতে। বিজেপি এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেল যে তারা দেশকে দুর্নীতির হাত থেকে মুক্ত করবে। সুইস ব্যাঙ্কে জমানো ভারতীয়দের সব কালো টাকা সরকার গঠন করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে আসবে। কয়েক বছর হয়ে গেল, বিদেশে জমানো কালো টাকা এখনও দেশে ফেরত আনার কোনো লক্ষণই নেই। মানুষ কিন্তু অপেক্ষা করছে। এমন সময় আচমকা এলো টাকা বাতিলের ঘোষণা। মানুষ ভেবে নিচ্ছে, প্রথম পদক্ষেপে কালোবাজারিরা অর্ধেক মৃত, এর পর এদের বিদেশের টাকা ঘরে নিয়ে এলে, অর্থাৎ দ্বিতীয় পদক্ষেপে এরা হবে পুরোটাই মৃত।
