মুসলিম দেশগুলোয় এখনও মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা বড় একটা নেই। জেদ্দা শহরে গৃহবন্দি অবস্থায় যে সৌদি রাজকন্যারা আছেন, তাঁদের একজন সাহার আল সাউদ সেদিন সৌদি জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন সৌদি রাজত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে। তিনি নিশ্চয়ই সবার গণতান্ত্রিক অধিকারের বা মানবাধিকারের কথা বলছেন, মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা চাইছেন। সৌদি আরবের মতো নারী-বিরোধী সমাজেও কিছু নারী নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন। সৌদি রাজকন্যারা তাঁদের বাবাকেও ছেড়ে কথা কইছে না। সাহসী মেয়েরা আজ নজরবন্দি, নির্বাসিতা। মৌলবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আন্দোলন করতে হবে মেয়েদের, কারণ মৌলবাদ দ্বারা মেয়েরাই বেশি ভোগে। আমি খুব অসহায় বোধকরি যখন শুনি মেয়েরা নিজেরাই মৌলবাদী হচ্ছে। শুনলাম তিরিশ থেকে চলি্লশ হাজার মহিলা জামাতে ইসলামীর মহিলা স্কোয়াড থেকে মহিলাবিরোধী জামাতে ইসলামীকে সহায়তা করছে। নিজের পায়ে কুড়ুল মারতে মেয়েরা যত ভালো পারে, তত ভালো বোধহয় আর কেউ পারে না। বাংলাদেশ কী দ্রুত বদলে গেছে। দেখলে সত্যিই দুঃখ হয়। আশির দশকে মেডিক্যাল কলেজে যখন পড়তাম, আমার মুসলমান বন্ধুরা কেউই ইসলাম ইসলাম করে মুখে ফেনা তুলতো না, কেউ নামাজ রোজা করতো না, দাড়ি রাখতো না, হিজাব পরতো না।
আজ তিরিশ বছর পর নামী দামী সহপাঠী ডাক্তারদের বেশির ভাগই হয়ে উঠেছে কট্টর মৌলবাদী। এত অল্প সময়ে দেশটা এমন ভয়ংকর পাল্টে গেল। সমাজ ক্রমশ ভালো হয়। আর আমাদের সমাজই ক্রমে ক্রমে মন্দ হচ্ছে, কট্টরপন্থী হচ্ছে, অসহিষ্ণু হচ্ছে, নারী বিদ্বেষী হচ্ছে, মূর্খ হচ্ছে। ভাবতে বিস্ময় জাগে যে দেশের মানুষ একদিন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য ভাষা আন্দোলন করেছিল, গণআন্দোলন করেছিল, মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, আজ সেই দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বাঙালি লেখিকার স্থান নেই, মানবাধিকারের পক্ষে আর নারীর সমানাধিকারের পক্ষে কথা বলার মানুষটি আজ নিষিদ্ধ। সেদিন দেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান একটি দল ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার পর সন্ধেয় আমার সঙ্গেও দেখা করেছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, একটা সেকুলার পার্টি ক্ষমতায় আছে, আপনাদের তো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। দলের নেতা জিজ্ঞেস করলেন, সেকুলার কে? আমি বললাম, ‘হাসিনা’। নেতা তুমুল হেসে বললেন, ‘এইটা কী কইলেন? হাসিনা সেকুলার? হাসিনা সেকুলার হইলে তো আপনারে দেশে নিত’।
০১ মে, ২০১৪
অনুমতি না নিয়ে আমার শরীর স্পর্শ করেছিলেন সুনীল
রাজেন্দ্র যাদব নেই। ভাবতে কেমন অবাক লাগছে তিনি নেই। মানুষটা এই কদিন আগেও ছিলেন। কদিন আগেও আমার বাড়িতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দিলেন। একটা মেরুন রংএর পাঞ্জাবি আর ফিনফিনে সাদা ধুতি পরে এসেছিলেন। লোকে বয়স বাড়লে রং চঙে পোশাক পরা বন্ধ করা দেয়, রাজেন্দ্রজি কিন্তু এই সংস্কার মানেননি। তিনি হামেশাই কড়া সবুজ, লাল, নীল, বেগুনি রঙের কাপড় পরতেন। আমার বাড়িতে মদ্যপান করলেন, খেলেন, সবার সঙ্গে গল্প করলেন। অনেকে বলে ভীষণ অসুখে ভুগছিলেন। আমি কিন্তু কোনও অসুখ দেখিনি। ডায়বেটিস ছিল, হাজার লোকের থাকে। কিন্তু তার ডায়বেটিস লাগামছাড়া ছিল না। ভালো মদ আর ভালো খাবার পেলেই হাভাতেদের মতো গোগ্রাসে গিলতেন না, অসাধারণ পরিমিতি বোধ ছিল। যেখানেই থাকুন, নিজের বাড়িতে বা অন্যের বাড়িতে, কতটুকু মদ খাবেন, কতটুকু খাবার, কখন ইনসুলিন নেবেন, সিগারেটে ক’টা টান দেবেন, কখন ঘুমোতে যাবেন— সবই একেবারে ঘড়ির কাঁটায় মেনে চলতেন। একটু এদিক ওদিক হওয়ার জো ছিল না। দেখে খুব অবাক হতাম, খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল এত নিয়ম মানা। ছোট একটা কাঁচি সঙ্গে রাখতেন। একটা সিগারেট দু’ভাগ করে তবেই অর্ধেকটা খেতেন। অনেকবার বলেছি, পুরোটা খেতে, বলেছি এতে এমন কোনও ক্ষতি হবে না, কিন্তু ওই অর্ধেকের বেশি তিনি কখনও খাননি। তাঁর ফুসফুস নিয়ে সবাই খুব দুশ্চিন্তা করতো, কিন্তু তাঁর ফুসফুস কি অতটাই খারাপ ছিল, যতটা খারাপ বলে ভাবা হতো? যখনই জিজ্ঞেস করতাম, শরীর কেমন আছে, বলতেন, চমৎকার। শরীর খারাপ বা অসুখে ভুগছেন, এমন কথা কখনও মুখে আনতেন না। একবার তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম তাঁর ময়ুরবিহারের বাড়িতে। দেখি হার্নিয়া হয়েছে, শুয়ে আছেন। শুয়ে থেকেই গল্প করলেন। সবই প্রচণ্ড জীবনের গল্প। অসুখ বিসুখ নিয়ে হাহাকার করা, বিষন্নতায় বুঁদ হয়ে থাকা –এসব রাজেন্দ্রজির মধ্যে ছিল না। ছিলেন সদা উচ্ছল, প্রাণবন্ত। বেঁচে থাকায় তিনি কোনও কার্পণ্য করেননি। চুরাশি বছর বয়স, মরে যাওয়ার মতো বয়স নয়। কিন্তু ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেলে কী আর করার থাকে! ওতে যে কেউ চলে যায়, আজকাল হার্ট অ্যাটাক তিরিশ-বত্রিশ বছর বয়সের ছেলেদেরও হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো যে, রাজেন্দ্রজিকে ভুগতে হয়নি, বিছানায় অচল অবস্থায় শুয়ে থেকে মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর কাতরাতে হয়নি। ওই দুঃসহ জীবন রাজেন্দ্রজির প্রাপ্য ছিল না।
যে রাতে মারা গেছেন, সে রাতে রাত সাড়ে তিনটেয় যখন তাঁর বাড়িতে গেলাম, দেখলাম তিনি শুয়ে আছেন একটা অদ্ভুত ইস্পাতের টেবিলে। বসার ঘরে যেখানে সোফা ছিল, সেখানটায়। তাঁর মেয়ে রচনা কাঁদছিল পাশের চেয়ারে বসে। আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ দাড়িয়ে দেখছিলাম রাজেন্দ্রজির নিস্পন্দ শরীরখানা। রাজেন্দ্রজিকে কখনও ঘুমিয়ে থাকতে দেখিনি। মনে হচ্ছিল ঘুমোচ্ছিলেন। হঠাৎ মনে হল যেন শ্বাসও নিচ্ছেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম শ্বাস নেওয়ার যদি কোনও আভাস দেখা যায়! এত বাস্তববাদী মানুষ হয়েও আজও মৃত্যুটাকে আমি মেনে নিতে পারি না। আমার মা মারা গেছেন আমার সামনে। আমার বাবার মৃত্যুর সময় আমি ছিলাম না। দেশের সরকার আমাকে যেতে দেয়নি বাবাকে একবার শেষবারের মতো দেখতে। রাজেন্দ্রজি যেভাবে শুয়ে ছিলেন, সেভাবে হয়তো আমার বাবাও শুয়ে ছিলেন। দেখলে আমিও হয়তো ভাবতাম বাবা ঘুমিয়ে আছেন, যেরকম রাজেন্দ্রজিকে দেখে মনে হল তিনি ঘুমিয়ে আছেন। হঠাৎ হয়তো জেগে উঠবেন হট্টগোলে।
আমার বাবা জাগেননি। রাজেন্দ্রজিও জাগেননি। আমরা যাঁরা বেঁচে আছি, যাঁরা এখন রাজেন্দ্রজির জন্য দুঃখ করছি, একদিন এভাবে তারাও মারা যাবো। কিন্তু ক’জন আমরা যাপন করতে পারবো রাজেন্দ্রজির মতো বর্ণময় জীবন?
