ভারতে আফগান শরণার্থী আসা শুরু করেছে ১৯৭৯ সাল থেকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করার সময় থেকে। মোট বারো হাজার আফগান শরণার্থী এখন ভারতে বাস করছে। পাকিস্তানের হিন্দু শরণার্থী আছে এক লক্ষ। ২০১২ সালে পাকিস্তানের কিছু হিন্দু নালিশ করেছিল যে, পাকিস্তানের মুসলিমরা তাদের জমিজমা কেড়ে নিয়েছে। তাদের ওপর শারীরিক আক্রমণ করেছে, তাদের অপহরণ করেছে, জোর করে ধর্মান্তরিত করেছে। এখন পাকিস্তানের হিন্দুরা ভারত সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইছে। হয়তো আশ্রয় তারা পাবে, যেমন বাংলাদেশের হিন্দুরা পেয়েছে। রঘু রাইয়ের এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের কারোর কোনও ছবি নেই। না হিন্দুর ছবি, না মুসলমানের। বাংলাদেশের মুসলমানদের বলা হয় ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। ওরা কি শরণার্থী নয়? ওদের বেশির ভাগই হয়তো রাজনৈতিক শরণার্থী নয়, কিন্তু তারা তো অর্থনৈতিক শরণার্থী। অর্থনৈতিক দুরবস্থা কি রাজনৈতিক নয়? নিশ্চয়ই রাজনৈতিক। তবে অর্থনৈতিক শরণার্থীদের রাজনৈতিক শরণার্থী না বলে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলা হয় কেন?
শুধু উপমহাদেশ থেকেই নয়, আফ্রিকার দেশ থেকেও লোক ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চায়। সাতশ পঞ্চাশ জন সোমালি শরণার্থী বাস করছে ভারতে। সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালীন চলে এসেছিল। সোমালিরা ভারতের সমাজে বরণীয় আদরণীয় কোনওটাই নয়। প্রধান কারণ তারা কালো। কালো লোকদের ভারতীয়রা পছন্দ করে না। কালো আফ্রিকানদের ভারতের পথে ঘাটে হেনস্থা করা হয়। নিজেদের বোঁচা-নাক নাগরিককেই লোকে পছন্দ করে না। মনে করে ওরা ভারতীয় নয়। নিডো তানিয়া নামের এক ছেলেকে তো সেদিন দিল্লিতে মেরেই ফেললো কিছু লোক, একটিই কারণ, ছেলেটা দেখতে ভিন্ন। নিডো তানিয়া ছিল ভারতের অরুণাচল প্রদেশের ছেলে। ভারতবর্ষে একটি বাক্যের বেশ চল ছিল কোনও এক কালে : অতিথি দেব ভবো। এখন সেই বাক্যটি কেবলই একটি বাক্য। ওতে আজকাল খুব বেশি লোকের বিশ্বাস নেই। সেই আগের ভারত আর এখনকার ভারতে এখন অনেক পার্থক্য বটে। সাদা ইওরোপীয় আর আমেরিকার লোকদের প্রতি আনুগত্য এখনও ঢের। কালো, বাদামী, মুসলিম, প্রতিবেশী, দরিদ্র, উপজাতি–এসবের প্রতি অনীহা সাধারণ ভারতীয়দের মধ্যে প্রচুর।
জাতীয়তাবাদ আর বর্ণবাদ এই দুটো দ্বারা মারাত্দক রকম আক্রান্ত এরা। রাজনৈতিক নেতারাও চান এসব নিয়ে জনতা পড়ে থাকুক। সবার জন্য অন্ন আর বাসস্থান, স্বাস্থ্য আর শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত না হোক, দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে না ভাবুক।
রঘু রাইয়ের সম্ভবত অনেক বয়স এখন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় জন্ম, হবেই তো বয়স। কাল দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে। আমি যখন ঢুকেছি প্রদর্শনী হলে, কেউ ছিল না। একটা লোক একটা ল্যাপটপ নিয়ে দরজার পাশে একটা টেবিলে বসে ছিল। কেউ এলে তাঁকে একটা খাতায় মন্তব্য লিখতে বলাটাই তাঁর কাজ। বেরোনোর আগে আমিও মন্তব্য লিখে এসেছি। আমার মন্তব্যটা এরকম : ‘রঘু রাইকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করেছি একাত্তরের তাঁর তোলা বাংলাদেশ যুদ্ধের ছবি দেখতে দেখতে। এখনও তাঁর সেই ছবিগুলো দেখলে চোখে জল আসে। রঘু রাই এখনও শরণার্থীর ছবি তুলে যাচ্ছেন। এখনও তিনি মানবতার জন্য কাজ করছেন। তবে যাদের ছবি তিনি তুলেছেন, তাদের আমি শরণার্থী বা রিফুজি বলি না, তাদের আমি মানুষ বলি। কোনও মানুষকেই আসলে শরণার্থী বলা উচিত নয়। সবাই এই পৃথিবীর সন্তান। এই পৃথিবীর যেখানে খুশি সেখানে যাওয়ার স্বাধীনতা সবারই থাকা উচিত। পৃথিবীর যে জায়গায় বাস করতে ইচ্ছে হয়, সেই জায়গায় বাস করার অধিকার সবার থাকা উচিত। এই মানুষই আমরা পৃথিবীকে ভাগ করেছি, কাঁটাতার লাগিয়েছি। এই মানুষই আমরা ধর্ম, জাত তৈরি করেছি। এই মানুষই আমরা তৈরি করেছি দারিদ্র্য আর প্রাচুর্য, তৈরি করেছি মানুষে মানুষে বৈষম্য আর বিভেদ। এই মানুষগুলোর জীবনযাপনের মান উন্নত হোক। এ দেশের নাগরিক যে সুযোগ সুবিধে পায়, যে সম্মান পায়, একই সুযোগ সুবিধে, একই সম্মান এই রিফুজি ক্যাম্পে পড়ে থাকা মানুষদের দেওয়া হোক। মানবতার অপমান আর কতকাল সওয়া যায়।’ আমি নিজে একজন রাজনৈতিক শরণার্থী। আমার দেশের সরকার আমাকে আজ কুড়ি বছর হল আমার দেশ থেকে তাড়িয়েছে, যেহেতু আমি যা লিখি আমার বইয়ে, আমার গল্প উপন্যাসে, প্রবন্ধে, কবিতায়, তা বাংলাদেশ সরকারের পছন্দ নয়। আজও বেআইনিভাবে এবং অন্যায়ভাবে আমাকে দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না কোনও সরকারই। আমার বাংলাদেশ পাসপোর্ট বাংলাদেশের কোনও সরকারই কখনও মেয়াদউত্তীর্ণ করছে না। আমার বিদেশি পাসপোর্টেও কখনও ভিসা দিচ্ছে না। আমার বেলায় হাসিনা সরকার, খালেদা সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার_ সকলেরই এক চরিত্র। আমাকে কি কম ভুগতে হচ্ছে নির্বাসন জীবনে? লেখক হয়ে বিদেশ বিভুঁয়ে জীবন যাপন করা সহজ জিনিস নয়, তার ওপর আবার বাঙালি লেখক হয়ে। ভারতবর্ষে বাস করি, ভারতবর্ষের সঙ্গে নিজের দেশের কিছু মিল পাই বলে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাকে তাড়িয়েছে। দিল্লিতে আমি একটি সরু সুতোয় ঝুলে আছি। যে কোনওদিন সরকার বলে দিতে পারে, অনেক হয়েছে এবার পাততাড়ি গুটোও। তারপর কোথায় যাবো, কোনদিকে, জানি না। গরিব শরণার্থীরা জীর্ণ তাঁবুতে বাস করে, আমি কোনও তাঁবুতে বাস করি না, কিন্তু অনিশ্চয়তা আমাদের একই। আমাদের দেশ বলে কোথাও কিছু নেই। আমাদের ঘর বলে সত্যিকার কিছু নেই, মাথার ওপর ছাদ বলে কিছু নেই। আমাদের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। মানবতার অপমান যারা করছে, তারা আজ দেশে দেশে দেশ নিয়ে বড়াই করছে। ছি:!
বিহারি সমস্যা
ময়মনসিংহ শহরে আমাদের বাড়ি ছিল হিন্দু পাড়ায়। একাত্তরে পাড়ার হিন্দুরা ঘরবাড়ি জিনিসপত্র যেভাবে ছিল, সেভাবে ফেলে চলে গিয়েছিল ভারতে। আমাদেরও শহর ছেড়ে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল গহীন গ্রামে। একবার দেশ স্বাধীন হয়েছে এরকম একটি খবর পেয়ে গ্রাম থেকে শহরে চলে এসেছিলাম। এসে দেখি পাড়া বদলে গেছে। হিন্দুদের বাড়িতে পরিবার পরিজন নিয়ে থাকছে অচেনা উর্দুভাষী লোক। শুনলাম ওরা বিহারি। ওই বিহারিদের কেউ নিশ্চয়ই পাক আর্মিকে খবর দিয়েছিল। আমাদের বাড়িকে বড়লোকের বাড়ি হিসেবেই বিচার করা হতো। তারপর এক রাতে আমাদের বাড়িতে ঢুকে যা কিছু ছিল লুট করে নিয়েছে পাক আর্মি, টাকা পয়সা, সোনা রূপা। আমার নানির, মা’র খালাদের, মামীদের সবার গয়না ছিল একটা ঝুড়িতে, যে ঝুড়িটা নানি আগলে আগলে রাখতো যেখানেই যেতো। পাক আর্মি সেই ঝুড়িটা নিয়ে গেছে। ওরা বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নানি আর মা ধর্ষণ বা খুন থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি কোথাও লুকিয়েছিল। ঝুড়িটা নানির পাতা জায়নামাজের পাশেই ছিল। মা’র অনন্ত বালা ছিল রেহেলে রাখা খোলা কোরানের ওপর। সব নিয়ে গেছে পাক আর্মি। আলমারি খুলে যা টাকা পয়সা ছিল নিয়েছে। বয়স আমার খুব অল্প ছিল বলে আমাকে তুলে নিয়ে যায়নি ক্যাম্পে।
