কিন্তু সত্য কথা হলো, নারীর অধিকারে বিশ্বাস করলে ধর্মপরিচয় থেকে প্রথমেই নিজেকে মুক্ত করতে হয়। কৈশোরের শুরুতেই ও থেকে আমি মুক্ত। যখন শিশু ছিলাম, শিশুদের গায়ে যেমন অন্যায়ভাবে ধর্ম-পরিচয় এঁটে দেওয়া হয়, তেমনই আমার গায়েও এঁটে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, একটি শিশুকে তার বাবা-মার ধর্মবিশ্বাস দিয়ে চিহ্নিত করা নিশ্চিতই শিশু-নিগ্রহ। একটি শিশুকে তো আমরা তার বাবা-মার রাজনৈতিক বিশ্বাস দিয়ে চিহ্নিত করি না। আমরা কোনও কমিউনিস্টের বাচ্চাকে কমিউনিস্ট বলি না। কিন্তু দু বছরের একটি বাচ্চাকে দিব্যি হিন্দু, বা মুসলিম বা খ্রিস্টান বলে রায় দিয়ে দিতে আমরা দ্বিতীয়বার চিন্তা করি না। শিশু বড় হওয়ার পর বাবা-মার ধর্ম, বা অন্য কোনও ধর্ম, বা কোনও ধর্ম-নয়, পছন্দমতো কিছু একটা গ্রহণ করবে। তাই তো হওয়া উচিত। আমার জীবনে আমি তা ঘটিয়েছি। আমি মানববাদ বা মানবতন্ত্র বেছে নিয়েছি বিশ্বাসের জন্য। আমাকে ‘মুসলিম রিফর্মার’ ভেবে ভুল করা উচিত নয়। আমি রিফর্মার নই, কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীরও কেউ নই। আমার গোষ্ঠী ধর্মমুক্ত মানববাদীর।
সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ-প্রতিদিন, ৫ জুলাই, ২০১৪
রঘু রাই এবং শরণার্থী
রঘু রাইকে মনে আছে? ফটোগ্রাফার। একাত্তরের সেই অসাধারণ সাদা কালো ছবিগুলো যাঁর তোলা। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামগঞ্জ থেকে জোয়ান বুড়ো বোঁচকা বুঁচকি ঘটিবাটি নিয়ে গ্রাম ছাড়ছে। দুস্থ শরণার্থী কংক্রিটের পাইপে বসত গড়েছে। রাস্তার ধারে ভাত ফুটছে। ভাতের পাতিলের সামনে কাত হয়ে শুয়ে আছে গর্ভবতী মলিন কিশোরী। এক বুড়িকে ডুলিতে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুটো লোক। রঘু রাইয়ের সেইসব ফটোগ্রাফ আমাকে রাতের পর রাত জাগিয়ে রাখতো। কাল সেই রঘু রাইয়ের ফটোগ্রাফ প্রদর্শনী দেখতে গেলাম দিল্লির আইআইসিতে। প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয়েছে, লঙ্গিং টু বিলং। বিভিন্ন দেশের যে শরণার্থীরা ভারতে রয়েছে, তাদের ছবি। প্রদর্শনীর উদ্বোধন হলো জুনের কুড়ি তারিখে, আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসে।
রঘু রাইয়ের এবারের ছবিগুলো সাদা কালো নয়। সব রঙিন। একাত্তরের মানুষগুলোর মতো বিমর্ষ, বিধ্বস্ত নয়। এবারের মানুষগুলোর চোখে হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসও তত নেই।
ভারতে একসময় বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জাতের ধর্মের মানুষ আশ্রয় নিত। ভারতের উদার বক্ষ সবাইকেই আলিঙ্গন করতো। ইহুদিরা তাড়া খেয়ে ভারতে এসেছে, সে কী আজ! পারস্য দেশ থেকে জোরোয়াস্ট্রিয়ান এসেছে। দশম শতাব্দীতে যখন জোরোয়াস্ট্রিয়ান গুজরাটের নদীর তীরে নেমে রাজার কাছে আশ্রয় চেয়েছিল, লোকে বলে, রাজা কানায় কানায় পূর্ণ করে এক পাত্র দুধ পাঠিয়ে দিয়েছিল, ওটাই নাকি কায়দা করে বলা যে আমার রাজ্যে তোমাকে জায়গা দেওয়ার কোনও জায়গা নেই। তারপর এক জোরোয়াস্ট্রিয়ান পুরোহিত ওই দুধে এক চিমটি চিনি ঢেলে দিয়ে বলেছিল যে জোরোয়াস্ট্রিয়ানরা তোমাদেরই একজন হয়ে উঠবে, তোমাদের জীবনে আরও মিষ্টতা দেবে। সেই জোরোয়াস্ট্রিয়ানরা আজ পার্সি। ভারতের সমাজে সম্পূর্ণ মিশে যাওয়া শরণার্থী। ভারতের জন্য তাদের অবদান অসামান্য। ভারতবর্ষ আজ তাদের পার্সি সম্প্রদায় নিয়ে গৌরব বোধ করে।
ভারতে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী এসেছে ভারত ভাগের পর, উনিশশ সাতচল্লিশে। পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্বপরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে এক কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষ ভারতে চলে এসেছিল। এর পঁচিশ বছর পর একাত্তরের যুদ্ধের সময় ভারত আশ্রয় দিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের এক কোটি শরণার্থীকে। আজকাল শরণার্থীর সংখ্যা ভারতবর্ষে আগের মতো অত নেই। তারপরও যা আছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শরণার্থীর দলটি তিব্বত থেকে এসেছে। তিব্বত থেকে দালাই লামার সঙ্গে এক লক্ষ তিব্বতী এসেছিল, ১৯৫৯ সালে। সবাইকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল ভারত। হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালা থেকে চালানো হচ্ছে নির্বাসিত তিব্বত সরকার। ভারতে এখন তিব্বতী শরণার্থীর সংখ্যা এক লক্ষ দশ হাজার। নির্বাসিত তিব্বতীদের আশি ভাগই বাস করছে ভারতে।
রঘু রাইয়ের প্রদর্শনীতে ভারতবর্ষের শরণার্থী তিব্বতীদের জীবনযাপনের ছবি আছে। ছবি আছে শ্রীলংকার তামিলদের। তামিলরা ১৯৮৩ সালে শ্রীলংকা থেকে চলে এসেছিল ভারতে। এখন মোট ষাট হাজার শ্রীলংকার তামিল বাস করছে ভারতের তামিলনাড়ুতে। শরণার্থী ক্যাম্পগুলোয় সবরকম সুবিধে পাচ্ছে ওরা। ২০০৯ সালে এলটিটিইর পতনের পর কিছু তামিল অবশ্য ফিরে গেছে শ্রীলংকায়। বাকি তামিলরা ফিরে যাবে, যদি না যেতে চায়, না হয় থেকেই যাবে। মায়ানমারের শরণার্থীও আছে ভারতে। জম্মু, দিল্লি, হায়দারাবাদে বাস করছে নয় হাজার রোহিঙ্গা। অন্য অনেক দেশের মতোই ভারত সই করেছিল জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশন ১৯৫১ এ। ওতে শর্তই আছে, যে কেউই রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে হবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলে দিয়েছে যে, ২১ আর ১৪ ধারা মতে ভারতে যারাই বাস করছে, তাদের সবারই সাংবিধানিক অধিকার এক। ভারতের ক’জন মানে এ কথা! জাতিসংঘ রোহিঙ্গা মুসলিমদের সকলকেই শরণার্থী বলে স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু ভারত কতটা স্বীকার করছে, সেটাই দেখার বিষয়। ভারতে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করছে কিছু মুসলিম সংস্থা। সাধারণ মানুষের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য সহানুভূতি খুবই কম। রোহিঙ্গাদের অনেক সময় রুমানিয়ার জিপসিদের মতো মনে হয় আমার। যেখানেই যায়, সেখানেই লোকে তাদের ঘৃণা করে। সব জায়গা থেকেই তাদের দূর দূর করে তাড়ানো হয়।
