লোরেনা ববিটকে মনে আছে? যে মেয়ে স্বামীর অত্যাচারে প্রতিদিন অতিষ্ঠ হতে হতে এক সময় প্রতিবাদ করেছিলো! তার প্রতিবাদের ধরনটা একটু ভিন্ন রকম। একরাতে ঘুমন্ত স্বামীর পুরুষাঙ্গ ধারালো ছুরিতে ঘচাং করে কেটে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল লোরেনা। এক হাতে তার ছুরি, আরেক হাতে কাটা পুরুষাঙ্গ, গাড়ি চালাতে অসুবিধে হচ্ছিলো বলে ওটাকে জানালার কাচ নামিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। কোনও এক গমক্ষেতে বা আলুক্ষেতে গিয়ে পড়লো সেই অঙ্গ। খানিক পরে লোরেনা পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছিলো কী কাণ্ড সে করেছে। ঘটনা জানার পর তাড়াতাড়ি করে ক্ষেতে ছুঁড়ে ফেলা ওই অঙ্গ খুঁজে এনে বরফে ডুবিয়ে রেখে উরুসন্ধিতে জোড়া লাগিয়ে জন ববিটের পুরুষত্ব কায়ক্লেশে রক্ষা করেছিলো তার বন্ধুরা। লোরেনা ববিটের কোনও জেল ফাঁসি হয়নি। লোরেনকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে আদালতে বলা হয়েছিলো, ‘লোরেনার মনে হতো, স্ত্রীকে গালি দেওয়ার, মারার, কাটার, যখন ইচ্ছে স্ত্রীর ওপর চড়াও হওয়ার সমস্ত শক্তি ওই ছোট্ট অঙ্গটি থেকে আসে। ওটি কেটে ফেলে দিলেই স্বামী মানুষ হবে।’ এই মনে হওয়া যে অস্বাভাবিক নয়, তা লোরেনের জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করেছিলো। স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে লোরেন দিব্যি সুখে আছে এখন। নারীনির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মার খাওয়া মেয়েদের উদ্ধার করছে। পুরুষাঙ্গ কর্তন করার উপদেশ জনসমক্ষে না দিলেও মেয়েদের কানে কানে দিচ্ছে কি না কে জানে।
পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে পশ্চিমের নারীবাদীরা সেই সত্তর দশক থেকেই আন্দোলন করছেন। পর্নোগ্রাফি নারীপাচার আর পতিতাবৃত্তি ইত্যাদি অপরাধের পৃষ্ঠপোষক, এতে কারও দ্বিমত নেই। নারীবাদীরা মনে করেন, পর্নো ছবিতে যে যৌনতা সাধারণত দেখানো হয়, তা হল পুরুষেরা দাপট দেখাবে, মেয়েরা মেনে নেবে। অথবা পুরুষেরা মারবে, মেয়েরা মার খাবে। নারীবাদীদের ভাষায়, ‘পর্নোগ্রাফির মানেই হচ্ছে, মেয়েরা মানুষ নয়, নিতান্তই যৌনবস্তু। এটি সবরকম শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণায় আনন্দ পাবে। ধর্ষণে আনন্দ পাবে। বেঁধে, মেরে, চাবকে, চড়িয়ে, উল্টিয়ে পাল্টিয়ে যা খুশি করা হবে, আনন্দ পাবে। যত তাদের মান, সম্মান, অধিকার আর স্বাধীনতাকে পায়ে মাড়ানো হবে, তত তারা আনন্দ পাবে। যত তারা নির্যাতিত হবে, আনন্দ পাবে।’ পর্নোবিরোধী নারীবাদীরা কিন্তু যৌনতা বা ইরোটিসিজমের বিরুদ্ধে নন। এঁরা ভায়োলেন্সকে ইরোটিসাইজ করার বিরুদ্ধে। হিউমিলিয়েশনকে, অসম্মানকে, অপমানকে, যন্ত্রণাকে ইরোটিসাইজ করার বিরুদ্ধে। পর্নোগ্রাফির পক্ষে নারীবিরোধী পুরুষ আর পর্নোব্যবসায়ীরা। যোগ দিয়েছে সেক্স পজিটিভ নারীবাদীরা, নিন্দুকেরা তাদের নাম দিয়েছে ‘ফিমেল শোভেনিস্ট পিগ।’ এঁরা নারীর যৌন-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যৌন-স্বাধীনতার নামে মেয়েদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট যৌন-পরাধীনতা পতিতাবৃত্তির পক্ষেও এঁরা দাঁড়িয়েছেন। ক্যাথরিন ম্যাককিনন, আন্দ্রিয়া ডোরকিন, রবিন মরগান, ডরচেন লেইডহোল্টদের পর্নোবিরোধী আন্দোলনকে এঁরা যাচ্ছেতাই ভাষায় নিন্দা করেছেন। আশির দশকে পর্নোগ্রাফির পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছিল দু দলে। বিতর্কের নাম লোকে শখ করে দিয়েছে, ‘নারীবাদীদের যৌন যুদ্ধ।’ যুদ্ধে কারা জিতে যাচ্ছে, তা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারি। চারদিকে যৌনবিকৃতিরই জয়জয়কার।
ইতালির ছেলে রকো সিফ্রেদি খুব নামকরা পর্নো অভিনেতা। এ পর্যন্ত তেরোশরও বেশি পর্নোয় অভিনয় করেছে। নিজেই সে বলে, ওসব তো সেক্স নয়, স্রেফ ভায়োলেন্স। সেক্সের নামে মেয়েদের যত ভোগানো হয়, যত যন্ত্রণা দেওয়া হয়, তত জনপ্রিয় হয় পর্নো। তত জনপ্রিয় হয় অভিনেতা। যে মেয়ে মুখ বুজে যত ভায়োলেন্স মেনে নেবে, সে মেয়ের তত আদর। পর্নোছবির দর্শক মূলত পুরুষ। যা দেখতে পুরুষের আনন্দ হয়। তাই দেখানো হয়। পর্নোয় কখনও কোনও মেয়ের স্বাভাবিক যৌনাকাঙ্ক্ষার মূল্য দেওয়া হয় না। বিশেষ করে নারীপরুষের যে পর্নো। মেয়েদের যৌন সুখের জন্য বানানো হয় না পর্নো। মেয়েদের দাসীবৃত্তি, পতিতাবৃত্তি, পর্নোবৃত্তি সবই পুরুষের ভোগের জন্য। মেয়েদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে এসব বৃত্তি তাদের নিরাপত্তার জন্য বা মঙ্গলের জন্য বা অর্থোপার্জনের জন্য। কিন্তু নিজের সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে, নিজেকে নির্যাতিত হতে দিয়ে নিজের গ্লানির বিনিময়ে যাই উপার্জিত হোক না কেন, কোনও অর্থেই তার নাম নিরাপত্তা নয়।
কী করে রোধ করা যাবে পর্নোগ্রাফি? সমাজের সঠিক চিত্রটাই তো রাখঢাক না করে দেখানো হয় ওসবে। সমাজে যদি পুরুষেরা ওপরে থাকে আর নারীরা তলায় থাকে, পুরুষেরা মাতব্বরি করে আর নারীরা মাতব্বরি সয়, পুরুষেরা কামড় দেয় আর নারীরা মুখ বুজে থাকে_ তবে পর্নো কেন ভিন্ন হবে। বিকৃতি যদি লোকের মনে এবং মাথায় গোপনে লুকিয়ে থাকে, ভদ্রতার মুখোশ আজ না হোক কাল খসে পড়েই। তবে বিকৃতি চিরস্থায়ী বলে আমি বিশ্বাস করি না। সুস্থ-সুন্দর-সমাজ গড়ার মিছিলে নারী ও পুরুষ উভয়কে যোগ দিয়ে বিকৃতি বিলুপ্তির চেষ্টা বিরতিহীনভাবে করে যেতেই হবে। মন্দ আছে বলে ভালোকে তো হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না! মন্দে ছেয়ে যাবে তবে জগত। আইন প্রণয়ন করে, মানবাধিকার বা সমানাধিকার সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করে এ পর্যন্ত অনেক বৈষম্য আর বিকৃতি বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। মনে রাখতে হবে, যতদিন না জাতবর্ণধর্মশ্রেণী নির্বিশেষে সকল নারীই মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সম্পূর্ণ অধিকার না পাচ্ছে, যতদিন না নারী শিক্ষিত এবং স্বনির্ভর হচ্ছে এবং যতদিন না নারীবিরোধী কুসংস্কারের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি হচ্ছে, ততদিন নারীর শরীর নিয়ে পুরুষের বিকৃত উৎসব চলতেই থাকবে। বাংলার মুখচোরা হীরেন বা তপনও রকো সিফ্রেদি হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।
ফিলিস্তিন এক টুকরো মাটির নাম
আমি যদি ইহুদি হতাম, হাজার বছর ধরে যারা বাস করছে একটা জমিতে, তাদের উচ্ছেদ করে, উদ্বাস্তু করে, আমি আমার ঘর বাড়ি, বা আমার শহর বা আমার দেশ সে জমিতে নির্মাণ করতাম না। যদি ইজরাইলি হতাম, আমি বিক্ষোভ করতাম ইজরাইল রাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নীল নকশার বিরুদ্ধে। আমি যদি ফিলিস্তিনি হতাম, পেট্রোল বোমা, রকেট, ইট পাটকেল, বোতল, পটকা ছুড়তাম না একটি রাষ্ট্রের দিকে যে রাষ্ট্রের দখলে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির বোমা, অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ এসব তো আছেই, দক্ষ সেনাবাহিনী. নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী সবকিছুই মজুত, এমনকী পারমানবিক অস্ত্রও হাতের নাগালে, যে রাষ্ট্র যে কোনও প্রতিবেশির বস্তিতে সন্ত্রাস চালাতে, তাদের ঘর বাড়ি ইস্কুল হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিতে দ্বিধা করে না, বোমা ছুড়ে শত শত শিশুকে হত্যা করতে দু’বার ভাবে না। আমি যদি ফিলিস্তিনি মুসলিম হতাম, আমি আত্মঘাতী বোমা হতাম না, হওয়ার ইন্ধন কাউকে জোগাতাম না। আমি হয়তো ফিলিস্তিনেই বাস করতাম না। যখনই ইজরাইলের বিমান হামলা দেখি, কামান দাগানো দেখি, শত শত নিরপরাধ মানুষের মরে যাওয়া দেখি, আমি ঠিক বুঝে পাই না, কী করে মানুষগুলো জীবনের এত ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে ওই এক টুকরো মাটি কামড়ে পড়ে আছে। জীবনের চেয়ে তো মাটি বড় নয়। জন্মের ভূমি ছেড়ে, পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া নয়। বাঁচার জন্য চিরকাল মানুষ ভিটে মাটি ছেড়েছে। আমার যদি নিরাপদ কোনও দেশে চলে যাওয়ার উপায় না থাকতো, আমার চোখের সামনে যদি দেখতাম আমার নিরপরাধ মা বাবা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে , যদি দেখতাম যতবারই আমি ঘর বাড়ি তৈরি করছি ততবারই সব ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, জানিনা কী হতো, আমি না হলেও আমার মতো অবস্থা যাদের হয়েছে, তাদের অনেকেই হয়তো হামাসের মতো সন্ত্রাসী হতো। দেওয়ালে পিঠ ঠেকলে মানুষ বোধহয় তাই হয়। যখন টিভিতে ভয়ংকর সন্ত্রাসের দৃশ্য দেখি, মৃত্যু আর ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে বসে থাকা সব হারানো মানুষদের দেখি, আমি নিজেকে কল্পনা করি ওদেরই একজন হিসেবে। হামাসের আচরণ তখন আমি বুঝি কতটা রাগ থেকে উঠে আসা। বুঝি যে পিএলও, হামাস, হিজবুল্লাহ এই দলগুলো এমনি এমনি গড়ে ওঠেনি। কিন্তু যুদ্ধ তো এক বিন্দু অ্যান্ট আর বিকট অ্যান্টইটারে হতে পারে না। রাষ্ট্রের বুলডোজার বিদ্রোহী দলের অহংকার গুঁড়ো করে দেয়। হামাস জানে সব। জেনেও তবে নিরপরাধ নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু ঠেকাতে আপোস করছে না কেন, কেন ওই রকেট ছোড়া বন্ধ করছে না? আর কত মৃত্যু দেখতে হবে আমাদের, আর কত শিশু হত্যা, আর কত রক্ত, আর কত বীভৎসতা?
