উত্থানরহিতে জগত ভর্তি। অথচ দেখলে বোঝার জো নেই। কারও লজ্জা নেই, মাথা হেঁট নেই, দুশ্চিন্তা নেই। উত্থানরহিতদের মস্তক কিন্তু উত্থিত থাকে। আর যে নারীরা উত্থানরহিতদের শিকার, তারাই বরং মাথা নত করে দিন কাটায়। দুঃসহ রাত্তির কাটায়। নারী যৌনতৃপ্তি পাক, এটা আন্তরিকভাবে খুব বেশি উত্থানরহিত কি চায়? চাইলে চেষ্টা থাকতো নিজেকে সংশোধনের। যৌনতার নামে দিনের পর দিন নারীর ওপর অত্যাচার চালাতো না।
পুরুষ যেদিন বিশ্বাস করবে নারীর সমঅধিকারে, পুরুষ যেদিন নারীর স্বাধীনতাকে শর্তহীন সম্মান জানিয়ে ধন্য হবে, পুরুষ যেদিন তাদের কুৎসিত পৌরুষ বিসর্জন দিয়ে, তাবৎ পুরুষিক নৃশংসতা-কদর্যতা ত্যাগ করে মানুষ হবে, মানবিক হবে, নারীকে স্পর্শ করবে প্রেমে, যে প্রেমে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে থাকে শ্রদ্ধা; সেদিনই হবে সত্যিকার নারী পুরুষের যৌনসম্পর্ক। তার আগ অবধি ঘটনা ওই একই, একজন ভোগ করে, আরেকজন ভোগে।
‘নারী স্বাধীনতা’র অর্থ ‘যৌন স্বাধীনতা’- এরকম মন্তব্য অনেকে করে। বিদ্রূপ করে বলা কথা। কথা কিন্তু সত্য। যৌন স্বাধীনতা ছাড়া নারী কখনও সত্যিকার স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না, পারেনি। যে নারীর শরীর তার নিজের অধিকারের বাইরে চলে যায়, সেই নারী কোনও অর্থেই ‘স্বাধীন নারী’ নয়। শিক্ষা পেলেও, স্বনির্ভর হলেও, এই নারীবিদ্বেষী সমাজে নারীরা ‘যৌনদাসিত্ব’ থেকে মুক্তি পেতে পারে না। এই দাসিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে, এই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে নারী যদি যৌন স্বাধীনতা পুরোপুরি ভোগ করতে পারে, তবেই সে নারীকে ‘স্বাধীন’ বলে মানবো আমি। যৌন স্বাধীনতা মানে পুরুষ পেলেই শুয়ে পড়া নয়, পুরুষের সঙ্গে না শোয়ার নামও যৌন স্বাধীনতা। চারদিকে ধর্ষকের ভিড়, এ সময় ধর্ষক-ধ্বজভঙ্গদের আহ্বানে আদেশে সাড়া না দেওয়ার জন্য যে যৌন স্বাধীনতা, তা থাকা প্রতিটি নারীর প্রয়োজন। ঠোঁট কামড়ে, স্তন খামচে যে পুরুষেরা পৌরুষ ফলাতে চায়, তারা যত যা-ই হোক না কেন, তাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার যৌন স্বাধীনতা না পেলে মুক্তি নেই নারীর। যে পুরুষেরা কেবল নিজের যৌনসুখ নিয়ে মগ্ন, নারীর যৌনসুখ নিয়ে ভাবা যাদের কম্ম নয়, সেই পুরুষদের সবলে অস্বীকার করার যৌন-স্বাধীনতা যে করেই হোক অর্জন করুক নারী।
সেইসব ঈদ
গত কুড়ি বছর আমি ঈদের কোনও উৎসব দেখিনি। অনেক সময় ঈদ চলে গেলে শুনেছি ঈদ এসেছিল। আমি নাস্তিক মানুষ। আমার কোনও ঈদ বড়দিন নেই, পুজো হানুকা নেই, বুদ্ধ পূর্ণিমা বা গুরু নানকের জন্মদিন নেই। আমি বিশ্বাস করি পয়লা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারির উৎসবে। আমি উৎসব করি ডারউইনের জন্মবার্ষিকীতে, মানবাধিকার দিবসে। কিন্তু ঈদ এলে বড় মনে পড়ে শৈশবের সেই দিনগুলো। মনে পড়ে বাবার সেই সাত কাক ডাকা ভোরে উঠে স্নান করে নেওয়া। আর ছেলেমেয়েদের সবাইকে ঘুম থেকে উঠিয়ে, সে শীত হোক, গ্রীস্ম হোক, স্নান করতে পাঠানো। আমরা মহা আনন্দে কসকো সাবান দিয়ে স্নান করতাম। কসকো সাবানটা বাবা ঈদের দিনের স্নানের জন্যই কিনতেন। কেন কসকোটা কিনতেন, কেন অন্য সাবান নয়, আজও জানি না। আমি এখনও কোথাও কোনও দোকানে কসকো সাবানের মতো কোনও সাবান দেখলে কিনে ফেলি। আসলে সাবান নয়, শৈশবের সেই দিনগুলো কিনি, হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো।
ঈদের আগে বাবা আমাকে আর আমার বোনকে গৌরহরী বস্ত্রালয়ে নিয়ে গিয়ে জামা পায়জামার কাপড় কিনে দিতেন। সেই কাপড় দরজির দোকানে দিয়ে আসতেন । বাটার দোকান থেকে কিনে দিতেন জুতো। বাবা চুড়ি মালা লিপস্টিক এসব কিনে দেবার আবদার কখনো শুনতেন না। সাজগোজ করা তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। মুখে কখনও রং লাগালে ঘাড় ধরে কলতলায় নিয়ে সব রং ধুয়ে দিতেন। বাবার বক্তব্য, ‘পড়ালেখা করো, বড় হও, ছাত্রানাম অধ্যায়নং তপঃ’।
ঈদের ভোরে স্নান শেষ করে নতুন জামা কাপড় পরা তখনও শেষ হয়নি, মা টেবিলে সাজিয়ে রাখতেন ছ’সাত রকমের শেমাই, জর্দা। আমি আজও বুঝিনা অত ভোরে মা কী করে অতগুলো শেমাই বানিয়ে ফেলতেন। মা বোধহয় জাদু জানতেন। বাবা আমাদের ভাই বোন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে শেমাই খেতেন। মা খেতেন না। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। মা’র তখন পোলাও রান্না শেষ, মুরগির কোরমা আর খাসির রেজালা শেষ হয় হয়। সকাল দশটাতেই আমাদের পোস্ট-নাস্তা আর প্রি-লাঞ্চ খেতে হতো। বিস্তর পোলাও মাংস। বাবার সঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসে আমরা ভাই বোনরা অতি সুস্বাদু সেসব খাবার খেতাম। মা খেতেন না। মা রান্নাঘরের দৌড়োদৌড়িতে। মা কী করে যে অত ভালো রাঁধতেন, মাটির চুলোয় ফুঁকনি ফুঁকে কী করে যে রান্নাই বা করতেন মা, আমি আজও জানি না। মা বোধহয় জাদু জানতেন। মা জাদুই জানতেন।
মা’র সারাদিনে সময় হতো না ঈদের শাড়ি পরার। সব ঈদে মা শাড়ি পেতেন না। যে ঈদে মা শাড়ি পেতেন, সেই শাড়ি পরতে পরতে মা’র সন্ধে হতো। বাড়ির সবাইকে খাইয়ে, অতিথিদের খাইয়ে, তারপর। মা’র ওই শাড়ি কিছুক্ষণ পর আবার খুলে রাখতে হতো, কারণ মা’কে আবার ঘরের শাড়ি পরে যেতে হতো রান্নাঘরে সবার জন্য রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে। রাতের খাবারও বাবার সঙ্গে বসে আমরা খেতাম। মা কখন খেতো, কী খেতো, কোথায় বসে খেতো, জানতাম না। জানতে কি চাইতাম কোনোদিন?
