প্রতিবেশি দেশটির দিকে উদাস তাকিয়ে থাকি, সামনে কাঁটাতার। মেঘ উড়ে যায় পশ্চিম থেকে পূবে। মনে মনে তাকে ক ফোঁটা চোখের জল দিয়ে দিই, যেন কোনও এক গোলপুকুরপাড়ের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টি হয়ে ঝরে। পাখিরা পাখা মেলছে, পূবের দিকে যাচ্ছে। মানুষ হয়েছি বলে যত বাধা, তার চেয়ে পাখি হওয়াই হয়তো ভালো। কোনও সীমানা মানার দায় নেই। কোনও পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলা নেই। নাগরিকত্বের বালাই নেই।
তুমি আর তোমার অন্তরে নেই। তুমি অন্তর থেকে বাহিরে। তোমার এখন বাহিরে বাস। বাহিরে বসবাস। কে যেন এরকম বলে যায় ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে স্পর্শ করলে মিলিয়ে যাওয়া তুলোর মতো সময়টায়। যেখানে আমার জন্ম, আমার বড় হওয়া, যেখানে অন্তর আমার সেখান থেকে আচমকা ছিটকে দূর দূরান্তে ভেসেছি। এখন থিতু হতে বাংলায় ফিরেছি। বাংলা তো একই ছিল। অথচ বাংলা নিজেরই নিজের প্রতিবেশি এখন। যদি বাংলা অখণ্ড থেকে যেত, তাহলে নিশ্চয়ই নির্বাসন দণ্ড হত না আমার। তাহলে নিজেকেই নিজের প্রতিবেশি হতে হত না। দেশটি নিজের, অথচ নিজের নয়। নিজের হলে কি দরজায় কড়া নাড়তে হয় বারো বছর? নিজের দেশটিই এখন প্রতিবেশি, কিন্তু ঠিক প্রতিবেশিও নয়। প্রতিবেশি হলে কেউ না কেউ এসে দরজা খুলে দিত। এ কথা মানি না যে কেউ আমাকে চায় না। যারা চায়, তারা কেন খুলছে না! এই প্রশ্ন আমার অনেক বছরের। অদ্ভুত জীবন আমার! নিজ দেশের প্রতিবেশি, আবার প্রতিবেশিরও প্রতিবেশি। দেশ তবে কোথায় আমার? আমি জানি, দেশ জানে, আমার অন্তরে সে দেশ।
আমি কি কেবল নিজেরই প্রতিবেশি! আমার বাবা মা, ভাইবোন, আত্দীয় বন্ধু সবারই প্রতিবেশি। দীর্ঘকাল তো ছিলাম বিদেশ বিভুঁয়ে, অতলান্তিকের ওইপারে, দেশ থেকে সহস্র মাইল দূরে, ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবু এই ভালো প্রতিবেশি হয়েছি নিজের দেশের। অন্তত এইটুকু স্বস্তি তো পাই, দেশটি আছে, কাছেই আছে, পাশেই আছে। দেশটির নিঃশ্বাস শুনতে পাই। দেশটির ঘ্রাণ পাই। সবাই ঘুমিয়ে গেলে, আমিও কি নৈঃশব্দের মতো জেগে কাটাই না রাতের পর রাত! আমার মাকে আমি স্পর্শ করতে পারছি না, অথচ যেন তার শিয়রে বসে আছি। মার খুব কাছে যেতে এখন না হয় পারছি না, কিন্তু যে কোনও সময় হয়তো সেই সময়টি আসবে যে সময়টি আমাকে নির্বিঘ্নে নিয়ে যাবে তার কাছে, উঠোন পেরিয়ে ঘরে উঠবো, আমার জন্ম জন্ম চেনা ঘরে- এরকম একটি স্বপ্ন আমাকে ভীষণভাবে জীবন্ত রাখে। এটি কম কিছু!
বেঁচে থাকতে সেই সময়টি আমার জীবনে আদৌ আসবে কি? ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাই আমি। স্মৃতির ছুরি এসে রক্তাক্ত করে আমাকে প্রতিদিন। হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায়, প্রায় এমন দূরত্বে আমার ইস্কুলের বন্ধুরা। আমার কলেজ, কলেজ-ক্যান্টিন, করিডোর। আমার ডাক্তার বন্ধুরা। কবি বন্ধুরা। এমন দূরত্বে আমার মামাখালারা, জন্ম থেকে চেনা আমার স্বজন, আমার ভিটেমাটি, আমার বাড়িঘর, আমার কড়ুইতলা, আমার ব্রহ্মপুত্র। আমার লেখার ঘর। একত্রিশ বছর যাপন করা দীর্ঘ একটি জীবন। আমার সুখ আমার দুঃখ। আমার প্রতিবাদ। ধর্মহীন কুসংস্কারহীন বৈষম্যহীন সুস্থ সুন্দর একটি সমাজের জন্য আমার আপোসহীন লড়াই করার সেই জীবন। হাত বাড়িয়ে আছি, কিন্তু ছুঁতে আমি কাউকে পাচ্ছি না। সকলে আমার প্রতিবেশি, গাছগুলো, বাড়িগুলো, মানুষগুলো, ভালোবাসাগুলো। কাউকেই স্পর্শ করার ক্ষমতা নেই আমার। মাঝখানে শক্ত দেওয়াল। দেওয়াল যদি ইট পাথরের হতো, ভাঙা যেত। দেওয়াল তো ধর্মের, রাজনীতির দুর্নীতির, হিংসের, জেহাদের। এই দেওয়ালের গায়ে আমি অাঁচড় কাটতে পারি, কিন্তু ভাঙার সাধ্য তো আমার নেই। আমি সামান্য মানুষ। লেখালেখি করি। বাঁচার জন্য লিখি, অথবা লেখার জন্য বাঁচি।
দেশ না হয় প্রতিবেশি হয়ে উঠলো, প্রতিবেশি কি দেশ হয়ে উঠছে, উঠবে? না সে সম্ভাবনা নেই। সব দেশেই আমি পরবাসী। নিজের দেশেও পরবাসীর মতো বাস করতে হয়েছিল। পরবাসেও পরবাসী। আর এ দেশে, প্রতিমুহূর্তেই আমারই ভাষায় কথা বলা, দেখতে আমারই মতো, আমার সংস্কৃতির মানুষই আচার-আচরণে বুঝিয়ে দেয় আমি তাদের কেউ নই, আমি আলাদা, আমি ভিনদেশি। মানুষ যদি আমাকে আপন করে নিতে না পারে, তবে আমি একা আপন করতে চাইলেই কি আপন করতে পারবো!
দেখা হতেই পরিচিতজনেরা জিজ্ঞেস করে, কলকাতায় কবে এসেছো?
আমি তো থাকি কলকাতায়। আমার উত্তর।
তা, আমাদের কলকাতা কেমন লাগছে তোমার?
হেসে বলি, খুব ভালো।
এবার কদিন আছো?
অপ্রস্তুত হই, বলি, এ শহরে বাস করি আমি। আমার বাড়িঘর আছে, ঠিকানা আছে।
থাকবে তো কিছুদিন?
আমি তো থাকছিই।
যাচ্ছো কবে?
যাচ্ছি না।
ও।
আমার কথা শুনে কেউ খুব একটা খুশি হয় না। হঠাৎ হঠাৎ আমি তাদের কলকাতায়, তাদের দেশে আসবো অতিথির মতো, গুণগান গাইবো সবার, শেকড় গাড়তে চাইবো, কিন্তু গাড়বো না, এরকম হলেই যেন ভালো। থেকে গেলে আর দাম থাকে না, যতক্ষণ অতিথি, ততক্ষণই আদর। দূরে কোথাও থাকবো, খুব দূরে, অচেনা কোনও দেশে, সে যেমনই থাকি। যখন বেড়াতে আসবো, হৈ রৈ করে ঘিরে ধরবে সবাই। আর যখনই বসবাস করার ইচ্ছে প্রকাশ করছি, যারা ঝাঁপিয়ে পড়তো, তারাই মুখ ফিরিয়ে রাখছে, আগ্রহ হারাচ্ছে। কম কম দেখা হলে অকুণ্ঠ প্রশংসা, শহরময় হেঁটে বেড়ালে কানে কানে নিন্দে। থেকে যাওয়া মানুষটি, যতই সে উদার হোক, আন্তরিক হোক, সৎ ও নিষ্ঠ হোক, পছন্দের মানুষ নয় আর। হবে কেন! মনে তো হয় যেন পাশের বাড়ির কেউ!
