বামপন্থীদের চরিত্র অনেক আগেই নষ্ট হয়েছে। কিন্তু ভালো জিনিস নষ্ট হলে এত যে দুর্গন্ধ বেরোয়, তা বামপন্থীদের না দেখলে আমার জানা হতো না। ক্রিশ্চান বা ইহুদি থেকে যারা নয়া মুসলিম বনেছে, তারা যোগ দিয়েছে আইসিসের মতো ঘৃণ্য দলে। তারা এখন অবলীলায় মানুষের গলা কাটছে। বামপন্থীরা আইসিসকে, আলকায়দাকে, আল শাবাবকে, বোকো হারামকে এবং প্রচুর ইসলামী মৌলবাদী সন্ত্রাসবাদী দলকে সমর্থন করছে। এই দলগুলো মানবতার বিরুদ্ধ, মানবাধিকারের এবং নারীর অধিকারের বিরুদ্ধে। এরা মানুষ হত্যা করে অলৌকিক কোনও ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে চায়, যে ঈশ্বর, তারা বিশ্বাস করে, তাদের প্রচুর আরাম আয়েশ ছাড়াও মাথাপিছু বাহাত্তরজন হুর দেবেন। বামপন্থীদের তো অলৌকিকে বিশ্বাস নেই। বামপন্থীরা ভালো জানেন, যে উদ্দেশে ইসলামী মৌলবাদীরা আজ সারা পৃথিবীতে মানুষের সর্বনাশ করছে, তাদের সেই উদ্দেশ্যটি ভয়ংকর একটি ভুল উদ্দেশ্য। তারা যদি গরিবদের দান করে, এই দানের পেছনের উদ্দেশ্যটি এই নয় যে তারা দরিদ্রদের দারিদ্র্য ঘোচাতে চায়। তারা নিজের পরকালের আরাম আয়েসের ব্যবস্থাটি পাকা করতে চায় মাত্র। ডানপন্থীদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ডানপন্থী ইসলামী মৌলবাদীরা। আর এদের সঙ্গে অাঁতাত করে মানবতার বিরুদ্ধে বামপন্থীরা যা করছে, আমি হয়তো একসময় ভুলে যাবো, ইতিহাস ভুলবে না। এই জ্ঞানপাপীদের ইতিহাস কোনওদিন ক্ষমাও করবে না।
সূত্র: দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৪
প্রতিবেশি দেশ
প্রতিবেশিদের ভালোবাসতে হবে, তাদেরকেই সবচেয়ে আপন মানুষ হিসেবে মানতে হবে- প্রায় সব ধর্মই এমন কথা বলেছে। অতি ধার্মিক মানুষও ঈশ্বরের এই আদেশ সবসময় পালন করতে পারেনি। প্রতিবেশির সঙ্গে মনে যদি না মেলে, তবে কি ঈশ্বরের আদেশ বলেই তা মাথা পেতে বরণ করতে হবে? মনের কোনও দাম নেই?
প্রতিবেশি এমন এক জিনিস, যাদের না হলে আমাদের চলে না, আবার হলেও ঝামেলা। বিপদে আপদে তারা সহায় হয়, আবার ব্যক্তিগত বিষয় আশয়ে তাদের নাক গলানোটা সীমা ছাড়িয়ে যায়। যত যাই বলি, মানুষের তবু মানুষ প্রয়োজন। ধুধু কোনও জনমনুষ্যহীন এলাকায় কেউ কি বাস করতে চায়? মনে না মিলুক, রুচি আদর্শে যোজন দূরত্ব থাকুক, তারপরও মানুষ মানুষের আশেপাশেই বাস করে স্বস্তি পায়। প্রতিবেশি অনেক রকম, কারও সঙ্গে তুমুল ঝগড়া, মুখ দেখাদেখি বন্ধ, আবার কারও প্রেমে কেউ দিওয়ানা। আমাদের কালে যে মেয়েটিকে বা ছেলেটিকে দেখা যেত পাশের বাড়ির জানালায় বা ছাদে, তার প্রেমে পড়ারই রেওয়াজ ছিল।
প্রতিবেশি সে যে ধর্মেই বিশ্বাসী হোক, আপাদমস্তক নাস্তিক হোক, ভিন্ন ভাষার হোক, ভিন্ন বর্ণের হোক, সে প্রতিবেশি। বুদ্ধি হলে এই বিভেদগুলো কেউ মানে না। বুদ্ধি হওয়ার আগ অবদি বিভেদ নিয়ে সহিংস হয়ে ওঠে। মনের মিল হওয়ার জন্য ভিন্ন ভাষা ভিন্ন ধর্ম ভিন্ন বর্ণ কোনও বাধা কখনই নয়। নিজের গোত্রের মানুষ যদি ভিন্ন মন মানসিকতার হয়, তবে তার সঙ্গে গোত্র বলেই মিলতে হবে, এ কথা আজ কজন মানবে! মন জিনিসটা সবার প্রথম। একে বাদ দিয়ে সম্পর্ক করতে গেলে সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না। কেউ অবশ্য আপোস করে করে সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে। মাথা নাড়ে সবার বেলায়। এরা চরিত্র ব্যক্তিত্ব সব বিসর্জন দিয়ে সহাবস্থান করবে বলেই সহাবস্থান করে। আমার আবার মনের মিল না হলে হয় না।
আমার প্রতিবেশিদের কারও সঙ্গে আমার খুব বেশি আলাপ নেই। অনেকের নাম জানি না, মুখ চিনি না। বেশির ভাগের সঙ্গেই সম্ভাষণের ঈষৎ হাসি, অথবা কী কেমন আছেন, ভালো তো? সম্পর্ক। আগ বাড়িয়ে ভাব করতে গেলে কী না কী বিপদ ঘটে কে জানে। আমাকে তো কেউ এখানে আর এখানকার মানুষ বলে ভাবে না, ভাবে বিদেশি। ভাবে মুসলমান। এই যে আপাদমস্তক ধর্মহীন মানুষ আমি, তারপরও যেহেতু আমার নামটি হিন্দু নাম নয়, তাই আমাকে মুসলমান বলেই অধিকাংশ বোধবুদ্ধিহীন মানুষ মনে করে।
এই শহরকে এত ভালোবেসেও এই শহর আমার শহর হয়ে ওঠে না। যাদের সঙ্গে এর মধ্যে বেশ বন্ধুত্বও হয়ে গেছে, তারাও বিশ্বাস করে আমি এই শহরে বা এই ভারতবর্ষে ক্ষণিকের অতিথি। অনেকে আমার সাময়িক বাসের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞেস করে। ছ মাস বাড়ানো হয়েছে অনুমতি। আগস্টের সতেরো তারিখে মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আমার আবেদন যদি মঞ্জুর না হয়? মঞ্জুর না হলে এ দেশ ছাড়তে হবে। ছাড়তে হবে শোনার পরও কারও মুখে কোনও উদ্বেগ আমি দেখি না। প্রতিবাদের ভাষা তো কারও মুখে ফোটেই না। আমার চলে যাওয়ার আগের দিন জুৎসুই একটা ফেয়ারওয়েল দেবার পরিকল্পনাও হয়তো মনে মনে করে। আমাকে যে তারা ভালোবাসে না, তা নয়। তবে আমার স্থায়ী বাসের অনুমতি বা নাগরিকত্ব না পাওয়া সম্পূর্ণ রাজনীতির ব্যাপার এবং সরকারি ব্যাপার এবং আমার কপাল বা ভাগ্যের ব্যাপার বলেই তারা অনুমান করে এবং অনুত্তেজিত থাকে।
ভারতে থাকার অনুমতি না পেলে আমি কোথায় যাবো, আমি জানি না। দূরে কোথাও কোনও বরফের দেশে আবারও আমাকে আশ্রয় খুঁজতে হবে- এরকম ভাবা আর মৃত্যুর কথা ভাবা আমার কাছে অনেকটা একইরকম। আমি তো আরও একটি দেশে ফিরতে পারতাম, যে দেশটি এখন আমার প্রতিবেশি দেশ! কিন্তু ফিরবো কী করে, সে দেশে আর যে কারওরই অধিকার থাকুক পা দেবার, আমার নেই। আমি যেন দেশটির ভীষণ শত্রু, তাই আমার জন্য এর দরজা চিরকালের মতো বন্ধ। মানবতার কথা বলা বা সমানাধিকারের দাবি করাকে তো অন্যায় হিসেবে জানি নি কোনওদিন। শাসকের চোখে, কট্টরপন্থী, সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধদের চোখে তা ভীষণ অন্যায়। আমাকে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয়েছে সেই কবে, যুগ পেরিয়ে গেল। যাবজ্জীবনেরও তো একটা শেষ থাকে। আমার এই দণ্ডের কোনও শেষ নেই। সম্ভবত মৃত্যু ছাড়া এই নির্বাসন থেকে মুক্তি নেই আমার।
